আবরারের প্রতি একজন শিক্ষকের খোলা চিঠি

প্রিয় আবরার ফাহাদ,

আমি একজন শিক্ষক।আজ আমি তোমার কাছে,তোমার বন্ধুদের কাছে ও পরিবারের কাছে করোজোরে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি তোমাকে বাঁচাতে পারি নি বলে, আমি লজ্জিত তোমাকে মুক্তচিন্তার পাঠ দিয়েছিলাম বলে।তাইতো তোমার কাছে যখন কালোকে কালো আর সাদাকে সাদা লেগেছিল একটুকুও চিন্তা না করে তাই অকপটে প্রকাশ করতে গেলে। দোষ আমার,আমি বলেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় হল নিজের সুচিন্তিত মতামত প্রকাশের প্লাটফর্ম।তুমি যদি যুক্তি দিয়ে তোমার মতামত প্রতিষ্ঠা করতে পারো তাহলে তা প্রকাশ করার অধিকার ও ক্ষমতা তোমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা দিতে বাধ্য।কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাথে আমি তোমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে একদল হায়েনা রয়েছে তার খবর জানাইনি।এখানে যে সত্য প্রকাশের মুখ চিরতরে বন্ধ করে দিতে একদল মানুষরূপী বর্বর আস্তানা গেড়েছে তা বলে দেইনি। এজন্য আমি ভীষনভাবে লজ্জিত।আর কাউকে আমি বলবো না অন্যায়ের সাথে আপোষ করা শিখতে গেলে যে নিজের মেরুদন্ড ঘুনে জরজরে হয়ে যায়।আজ থেকে বলবো যেভাবে পারিস আপোষ কর! মেরুদন্ড ভেঙে নাই হয়ে যাক তবুও তো বেঁচে থাকবি।ওই তেলাপোকার মত অন্ধগহ্বরে বেঁচে থাক যুগ যুগ ধরে।

প্রিয় আবরার, শিক্ষার্থী আমার,

১০১১ নম্বর কক্ষের শেষ কর্ণারে ঐ লাগোয়া জানালাটা ধরে যে বিছানা ছিল,ওখানেই তো রাতের পর রাত কেটেছে।খুব ভোরে জানালা দিয়ে যখন উষার আলো আসি আসি করেছে,অথবা কাঠফাঁটা দুপুরের তীব্র রোদে, তোমার হয়তো সাহিত্যের সেই ক্লাসে আমার দেয়া ক্লাস লেকচারের ভালোবাসার কবিতার লাইনগুলো মনে এসেছিল সেদিন– হায় চিল! সোনালী ডানার চীল! তুমি জানালার ফাঁকে কৃষ্ণচূড়ার ডালে ঝুলে থাকা রক্তরাঙা ফুলের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভেবেছিলে তোমার হৃদয়ের মায়াবতীর কথা।তারপর পাশের ডেস্কের উপরেই চোখ গেলে দেখেছিলে কম্পিউটার স্ক্রীনে সেই মায়াবতীর ছবি।মনের অজান্তেই হয়তো একটু হাসি খেলে গিয়েছিল ঠোটে।কিন্তু পরীক্ষার কথা মনে হওয়াতে সেই আবেশ ভুলে উঠেছিলে অংকের খাতা নিয়েছিলে। কারন আমিই বলেছিলাম হয়তো এত মেধাবী ছেলে অংকে কোনদিন কাটতে পারিনি একটা নাম্বারও।সেই থেকে তুমিও হয়তো নিজেকে ঝালিয়ে নিতে বারবার।আমি শিক্ষক যেন ভুল না ধরতে পারি একদিনও।আমি সত্যিই খুব দুঃখিত আজ।কেন তোমাকে বলিনি অত অংক করে কি হবে।মহাকাশে যাবে না চন্দ্রাভিযানে! ওসব কি আমাদের সাজে।আমরা তো শুধু হাততালি দেব আর গায়ের শক্তি দেখিয়ে একজন আরেকজনকে পিষে মেরে ফেলবো।তোমার আর অংক শিখে লাভ নেই যাও কুস্তিটা শিখে এসো–দু ঘা খেতেও পারবে আবার প্রয়োজনে দিতেও পারবে।।

পারিনি যখন,মাথাপেতে দায় নিচ্ছি তার।তোমাকে যেভাবে পিষে মেরেছে এ সমাজের প্রত্যেকটা স্বাধীন মুখ, প্রত্যেকটা অংকের জাহাজ আর সাহিত্যের হরকরারা পিষে মরে যাক।এ পৃথিবীটা অন্ধকারদের দখলে চলে যাক।সমস্ত অন্ধকার ওদের গ্রাস করুক।

আর তোমাদের জীবন হয়ে উঠুক এক একটা আলোকবর্তিকা।মৃত্যুর পরও যার দ্যুতি কমে না এতোটুকু….

রিতু কুন্ডু

সহকারী অধ্যাপক,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও রিভার্টেড মুসলিম

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.