আরডিংটনের রহস্যে ঘেরা হত্যাকান্ডঃ দুই তরুণীর কাহিনী

সাদিয়া রুম্মান

ইংল্যান্ডের বারমিংহ্যাম শহরের  উপকন্ঠে আরডিংটন নামের একটি এলাকা, সেখানেই অবস্থিত পাইপ হেজ পার্ক, ছবির মতই সুন্দর একটি স্থান।

সেখানে দুটি খুনের ঘটনা ঘটে, দুটি খুনেরই ভিক্টিম দু’জন ২০ বছরের মেয়ে, তারা একই ভাবে খুন হয়, তাদের হত্যাকারীর নাম ও এক,  থর্ণটন।  ১ম মেয়েটি ছিল একজন হাউসকিপার, আর ২য় মেয়েটি একজন নার্স। ২টি খুনই হয় ২৭শে মে,  অর্থাৎ গ্রীষ্মের রাতে! দুজন মেয়েই তাদের জীবনের শেষ সন্ধ্যাটি নাচের আসরে কাটিয়েছিল।
কি মনে হচ্ছে?  এটা কোন সিরিয়াল কিলার এর কাজ? সেই খুনির নাম থর্ণটন? তার মোডাস অপারেন্ডি এমনই?

না, দুটা খুনের মাঝে সময়ের ব্যবধান ১৫৭ বছর। প্রথম খুনটা হয় ১৮১৭ সালে। মেরি এশফোর্ড তার এক  চাচার খামারবাড়িতে কাজ করত,  বাবা ছিলেন একজন মালি। ২৬মে রাতে সে একটি বড় Dance festival  এ যায় এবং সেখানেই পরিচয় হয় খুনীর সাথে। সে হল  আব্রাহাম থর্ণটন নামের  ২৪ বছরের যুবক, তার বাবা পেশায় একজন রাজমিস্ত্রী। রাত বারোটার পরে তারা ওই নাচ ছেড়ে বেড়িয়ে আসে, অর্থাৎ তখন ২৭শে মে। তারপর ভোররাত ৪টায় মেরি তার বান্ধবী হান্নার বাসায় যায় নাচের পোশাকটা ফেরত দিতে, মেরিকে এমন ভোররাতে দেখে হান্না অবাক হয়, মেরি জানায় সে এতক্ষণ আব্রাহাম থর্ণটন এর সাথেই ছিল, তারা নিছক আড্ডা দিচ্ছিল খোলা আকাশের নিচে।

মেরি তার নিজের বাসায় আর কখনোই ফিরে আসে নাই।  পুলিশ কয়েক ঘন্টা পরে তার লাশ একটা জলাভূমির পাশে থেকে  উদ্ধার করে।আব্রাহাম গ্রেফতার হয়, কিন্তু তার alibi থাকায় ছাড়া পায়।

তবে পরবর্তীতে মেরির ভাই উইলিয়াম এশফোর্ড এর আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে আবার নতুন করে বিচার শুরু হবার কথা থাকলেও তার বদলে বিচারক লর্ড এলেনবার্গ “ট্রায়াল বাই ব্যাটেল” এর অনুমতি দেন উইলিয়াম কে। এটা অনেকটা ডুয়েল এর মত, আব্রাহাম আর উইলিয়াম লড়াই করবে সবার সামনে,যে জিতবে সেই সত্যি বলছে, কারণ সেসময় মানুষের  বিশ্বাস ছিল যে ঠিক,  ঈশ্বর তাকে জিতিয়ে দেবেন  । তবে উইলিয়াম এতে রাজি হয় নাই।  খুব সম্ভবত আব্রাহাম এর বিশাল শারিরীক গড়ন দেখেই উইলিয়াম বুঝতে পারে যৌক্তিক কারণেই আব্রাহাম জিতে যাবে, এতে ঐশ্বরিক কোন বিষয় নাই। ফলে আব্রাহাম ছাড়া পেয়ে যায়,  কিন্তু আশেপাশের মানুষের মনে আব্রাহামের বিরুদ্ধে প্রচন্ড ক্ষোভ ছিল। তাই আব্রাহাম থর্ণটন ব্রিটেন ত্যাগ করে আমেরিকা যুক্তরাস্ট্রে চলে যায়, আর কোনদিনও জন্মভূমিতে ফিরে আসে নাই।

ঠিক ১৫৭ বছর পরে, ওই একই এলাকায় আরেকটি ২০ বছরের মেয়ে, পেশায় নার্স,  নাম বারবারা ফরেস্ট এর লাশ পাওয়া যায়। সেটা ছিল ২৭ মে, ১৯৭৪ সাল।
বারবারাকে পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী  সম্ভ্রমহাণির পরে গলা টিপে হত্যা করা হয়, ঠিক যেভাবে মারা হয়েছিল মেরি কে। বারবারাও তার প্রেমিক সাইমন বেলচারের সাথে একটা ড্যান্স পার্টিতে যায়, উপস্থিত সবাই তাদের রাত একটার দিকে পার্টি থেকে বের হয়ে যেতে দেখেন। বাসস্ট্যান্ডে অনেক যাত্রীই সাক্ষ্য দেন সাইমন বারবারাকে একটা বাসে চাপিয়ে নিজে আরেকটা রুটের বাসে উঠে বসে।দুই বাসের চালকই জানান একই কথা।   কিন্তু ঠিক মেরির মতই, বারবারাও আর কোনদিন বাসায় ফিরতে পারে নি।

মাইকেল আয়ান থর্ণটন নামের এক কলিগ ছিল যে বারবারার প্রতি খুবই আগ্রহী ছিল। বারবারা অনেক বার তাকে বলে যে সে সাইমনেকে ভালবাসে এবং তারা বিয়েও করবে, তবুও মাইকেল থর্ণটন তাকে বিরক্ত করত প্রায়ই।
মাইকেল গ্রেফতার হয় যখন কিছু সহকর্মী পরেরদিন মাইকেলের প্যান্টে অনেক রক্তের ছিটা দেখে এবং পুলিশকে জানায়। পুলিশ মাইকেল কে গ্রেফতার করে। কিন্তু উপযুক্ত প্রমানের অভাবে ছাড়া পেয়ে যায় মাইকেল, তখন ডিএনএ টেস্ট করা হয় নি, অতএব সেই রক্তের দাগ বারবারার নয়, সেটা চ্যালেঞ্জ করে মাইকেলের আইনজীবী।  মাইকেলের মায়ের দেয়া এলিবাই মিথ্যা প্রমাণ হয়েছিল, তবুও মাইকেল ছাড়া পেয়ে যায়।

মেরির ভাই উইলিয়াম এর মতই বারবারার বোন এরিকা আদালতে আপিল করেছিল, চার দশক পরে। ২০১৫ সালে এরিকা ফরেস্ট তার বোন বারবারা ফরেস্টের খুনের পুনঃ তদন্ত করার জন্য ডিএনএ টেস্ট করার আবেদন জানায়। কিন্তু এতদিন পরে আর ফরেনসিক তদন্ত সম্ভব না, এটাই জানায় পুলিশ।

মেরি আর বারবারার জন্মদিনও একই তারিখে!আর বারবারাও তার ইভনিং ড্রেসটা তার বান্ধবীর কাছ থেকে ধার নেয়, ঠিক যেমনটি নিয়েছিল মেরি এশফোর্, বান্ধবী হান্নার কাছ থেকে।  মেরি  খুন হবার কয়েকদিন আগে হান্নার মাকে বলেছিল যে তার নাকি মনে হচ্ছে আগামী দুই এক সপ্তাহের মাঝেই তার জীবনে খুব খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে। আবার কি অদ্ভুত ব্যাপার, বারবারা তার এক মহিলা সহকর্মীকে জানায় খুন হবার কদিন আগে ” আমার একটা অনূভুতি হচ্ছে যে এই মাসটাই আমার জীবনের সবচে অশুভ মাস , আমি টের পাচ্ছি, কিন্তু কেমন করে টের পাচ্ছি তা জানতে চেয়ো না প্লিজ! “

ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস,বাস্তবেও দুই তরুণির সেই অজানা আশংকা সত্যি হল।   মাত্র ২০ বছর বয়সে দুই ভিন্ন শতকের দুই নারীকে নৃশংস বলি হতে হল দুই নরপশুর বিকৃত কামনার।

তথ্যসূত্রঃ ইউ এস এ টুডে,  হাফপোস্ট এবং আরও কয়েকটি পত্রিকা।

লেখকঃ সাহিত্যিক  নিউ ইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশি

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.