বিবর্তন

সুমাইয়া আফরোজ

মোসলেমের বাগানের পাশ দিয়ে ধানখেতের মাঝের সরু আইল বেয়ে জরিনা হনহন করে ছুটছে জয়গুনের বাড়ির দিকে। এই সংকীর্ণ পথটা গ্রামের আর দশজনের চেয়ে জরিনাকেই বেশি আপন করে নিয়েছে। কারণ আর সবার চেয়ে জরিনার পদধূলিই বেশি পড়ে এই পথে।
জমির কৃষকেরা আসে হয়তো সপ্তাহে দুবার আর জরিনা আসা যাওয়া করে প্রায় দিনে দুবার।
আশি ছুঁইছুঁই জরিনার ক্ষীণ শরীরটা বাতাসের সাথেই চলে। শুধু জমির ওপরে জঙ্গলের কাছে এসে থমকে দাঁড়ায় কখনো কখনো, অবশ্য যখন আশেপাশে কেউ থাকে না।
আবার মাঝে মাঝে কাজের নেশা এত বেশি চেপে ধরে যে ওদিকটাতে একবার তাকানোর কথাও মনে থাকে না।
এই ঘন ঝোপঝাড় এ দাঁড়িয়ে সে কথা মনে পড়েই কেমন খোঁচা অনুভব করে জরিনা।
অথচ ঐ তো সেদিনের কথা,
শৈশবের পুতুলখেলার মাঝে কারা যেন এসে ওকে ঘিরে খিলখিল করে হেসে উঠল।
… জরি! আজ যে তোর বিয়ে, উঠ উঠ খেলা বন্ধ কর দিকি।
হাতের ধুলো ঝেড়ে বিয়ের আসরে বসা।
এইটুকু মাত্র সময়ে জরিনা নিজের পরিচয় নতুন রূপে দেখতে পেলো,
সে এখন থেকে শুধুই ফয়েজের বৌ, যার অর্থ সে কিছুই বুঝত না।
আর এজন্যই মা- চাচী আর পাড়ার মহিলারা তাকে বুঝাতে লেগে গেলো।
… শোন, জরি। এখন তো বে হইছে। আর যখন তখন টোঁ টোঁ করে পাড়া বেড়াতে পারবি না কিন্তু।
… জরি, মনে রাখবি পতিই নারীর পরম গতি!
স্বামীর কথামত চলবি।
… জরি, আর পুতুল খেললে হবে না, নিজের হাতে সংসারের সব কাজ শিখতে হবে।

কথাগুলো যে সে শুধু শোনার জন্য শোনে তা নয়,
বরং মনের কোণে যত্ন করে রেখে দেয়।
তার কোমল মন অধীর হয়ে ওঠে সংসারী হয়ে উঠতে।
যখন কেউ রান্না করে তখন চুপটি করে বসে সে মনে মনে মেপে দেখে কতটুকু চালে কতখানি পানি দিলে ভাত ঝরঝরে হয়, আর কতটুকু মাছে কতখানি মরিচের গুঁড়া দিলে ঝাল ঠিকঠাক হয়।
খুব অল্প সময়েই সব রপ্ত করে ফেলে সে।
সারাদিন লাঠি খেলে আর গান গেয়ে যখন তরুণ ফয়েজ ঘরে ফেরে তখন ওজু করার বদনা এগিয়ে দিয়ে গামছা নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সে। কখনো বা ফয়েজ এই সেবাটুকুতে সন্তুষ্ট হয়ে হাসিমুখে তাকায় তার দিকে, তখন এক দৌড়ে ছুটে পালিয়ে যায় সে, আবার কখনা বা কোন ত্রুটি পেলে শাসনের চোখে তাকায় ফয়েজ তখনো দৌড়ে পালায় জরিনা। সেদিন আর সে কিছুতেই সামনে আসার সাহস পায় না, কেবলি দূর থেকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে ফয়েজের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করে যায়।
বেচারির বেহাল দশায় মায়া হলে হয়তো ফয়েজ নিজেই ডেকে নেয় অথবা কখনো লাঠিখেলার লাঠিটা উঁচিয়ে ডাকতে থাকে।
এভাবেই কেটে যায় শৈশবের বিয়ে বিয়ে খেলা। কৈশোরের জরিনা পাকা গৃহিণী। সাত আট বছরের ব্যবধানে পাঁচ সন্তানের জননী হয় জরিনা। এতগুলো মুখের অভাবের সংসারে সেই খেয়ালি ফয়েজই একমাত্র ভরসা। দিন শেষে ছেলেপুলেকে দু মুঠো খাইয়ে বিছানায় পাঠানোর চেয়ে বড় স্বপ্ন আর তাদের নেই।
এরকম এক কঠিন মুহূর্তে স্বার্থপরের মত জরিনার হাতে সমস্ত দায়ভার চেপে দুনিয়ার রঙ্গমঞ্চ থেকে প্রস্থান করে ফয়েজ।
অল্প বয়সে স্বামী হারানোর শোক হালকা হয়ে যায় পাঁচ সন্তানের অন্ন চিন্তায়। জীবনের বাঁকে বাঁকে এত কঠিন পরীক্ষা ওঁৎ পেতে থাকে তা জানা ছিল না জরিনার। এরপর শুরু হয় কঠিন সংগ্রাম। বরাবরের নতমুখ অনুগত জরিনা সময়ের দাবিতে হয়ে ওঠে কঠোর সংগ্রামী।
আজ তার দায়িত্ব শেষ হয়েছে যদিও। ছেলেরা সংসারী হয়েছে। মেয়েদের নিজ নিজ সংসার। ছেলে মেয়েরাই আজ প্রৌঢ়ত্বে আর সে তো একবারে বার্ধক্যে। তবুও বয়স তাকে হারাতে পারে না। অসুস্থ বড় মেয়ের সংসারে নিজ দায়িত্বেই সে সর্বময় কর্তৃ। সেই যে সময়ের দাবিতে সংসার রক্ষার সংগ্রামে সে নেমেছিল আজ সময় উত্তীর্ণ হলেও সে তার সেই অভ্যস্ততা থেকে সরে আসে নি।
তাই এককালের বালিকাবধূ জরিনা আজ ফয়েজের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে। ফয়েজ হয়তো টেরও পায় না, সেই সদাভীত হরিণীর ন্যায় জরি আজ জীবনের আহব্বানে কতটা বদলে গেছে।
তবুও ক্ষণিকের এই থমকে দাঁড়ানোর সময়টা যেন জরিনাকে এক টানে সুদূর অতীতে নিয়ে যায়। হয়তো সে ভাবে,
‘এই জীবনটা অন্যরকম হতে পারত, যদি আজ সে থাকতো।’

লেখকঃ সাহিত্যিক

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.