মানুষ আসলে হিপোক্রেট !!!

ডঃ আকতার বানু আলপনা

মানুষ যখন সচেতনভাবে কোনকিছু করে, তখন সে সতর্ক হয়ে করে। তার চারপাশের লোকজন বিষয়টাকে কীভাবে নেবে, কাজটি করলে তার নিজের লাভ বা ক্ষতির সম্ভাবনা কতটুকু, তা বিবেচনা করে কোন কাজ বা আচরণ করে বা কোন কথা বলে। যেমন –

যে ছেলেটা ফেসবুকে লেখার সময় নিজেকে সবচেয়ে বেশী নারী-পুরুষের সমঅধিকারে বিশ্বাসী বলে প্রচার করে, সেইই তার ছোটবোনকে প্রেম করতে দেখলে সবচেয়ে বেশী ক্ষেপে যায়।

যে ভাই নিজেকে সবচেয়ে বেশী নীতিবান বা ধার্মিক বলে প্রচার করে, সেইই বোনদেরকে নিজের বাবার সম্পত্তির ভাগ দেয়না।

যে স্বামী স্ত্রীদের অধিকার নিয়ে সবচেয়ে বেশী সোচ্চার, সেইই নিজের স্ত্রীকে মোহরানা দেয়না।

যে লোক যৌতুকের বিরুদ্ধে কথা বলে সবচেয়ে বেশী, সেইই যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে সবচেয়ে বেশী নির্যাতন করে ।

যে মেয়ে প্রেম করার সময় প্রেমিককে বলে, “তোমার পরিবারের সব মানুষকে মাথায় তুলে রাখব” বিয়ের পর সেই প্রেমিকা কাম স্ত্রীই শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে দুচোখে দেখতে পারেনা।

যে প্রেমিক বিয়ের আগে নিজেকে সবচেয়ে বেশী কেয়ারিং, উদার, নিরীহ এবং চরিত্রবান বলে প্রকাশ করে, বিয়ের পর সেই স্বামী কাম প্রেমিকই বৌকে সবচেয়ে বেশী অনাদর, সন্দেহ, নির্যাতন করে এবং তার লাম্পট্য প্রকাশ পেয়ে যায়।

যে স্বৈরশাসক বা স্বৈররাজা তার প্রজাদেরকে নির্যাতন, লুটপাট, দুঃশাসন, বাকস্বাধীনতা হরণ ইত্যাদি করে সবচেয়ে বেশী, সেই স্বৈরশাসক বা স্বৈররাজাই গলা ফাটিয়ে দেশের উন্নয়নের, জনগণের প্রতি ভালোবাসার, গণতন্ত্রের কথা বলে সবচেয়ে বেশী। (যেকোন সরকার যদি জনগণের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেয়, তাহলে বুঝতে হবে, সরকার এমন কিছু করছে, যারজন্য তার সমালোচনা হওয়াটা খুবই ন্যায্য, যেটা সরকার হজম করতে পারেনা বলেই মানুষের গলা চেপে ধরে।)

এভাবে যে ঘুষ খায়, অন্যায় করে, মিথ্যে বলে, চুরি করে, পরকীয়া করে, জুলুম করে,…. সেইই……!

মানুষ আসলে এক একটা বিরাট ভণ্ড। হিপোক্রেট। সে নিজেকে মানুষের কাছে যেভাবে তুলে ধরে, আসলে সে তা নয়। মানুষ তার সুবিধা, লাভ বা স্বার্থের জন্য নিজের প্রকৃত চেহারা অন্যের কাছে গোপন করে রাখে। রেখে ভালো সাজতে চায়। কিন্তু সময়, পরিবেশ, পরিস্থিতির কারণে মানুষের সুবিধা, লাভ বা স্বার্থ বদলে গেলে তার আচরণও বদলে যায়। তখন তার আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ে। এজন্যই বারো বছর প্রেম করে বিয়ে করার পরও সে বিয়ে বারো মাসও টেকে না।

কিন্তু মানুষ অচেতনভাবে যখন কোনকিছু করে, বলে বা ভাবে, তখনই আসলে মানুষের প্রকৃত সত্ত্বা প্রকাশ পায়। কোনকিছুর লোভ, ভয় বা প্রয়োজন ছাড়াই মানুষ যখন কোনকিছু করে, সেটাই আসলে প্রকৃত মনুষত্বের প্রকাশ। যেমন – যখন কোন স্বার্থ ছাড়াই মন থেকে আমরা কারো জন্য কিছু করি বা সম্পূর্ণ অপরিচিত কোন মানুষকে বিপদ থেকে বাঁচাতে এগিয়ে যাই, তখনই আমাদের আসল রূপ ফুটে ওঠে।

দয়া, স্নেহ, মায়া, মমতা, প্রেম-ভালবাসা, শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা ইত্যাদি – মানুষের এসব কোমল মানবিক প্রবৃত্তিগুলো মানুষের মধ্যে অবচেতনভাবে কাজ করে। এজন্যই মানুষ ভালবাসে অচেতনভাবে। সে বুঝতেই পারেনা, কখন সে কারো প্রেমে পড়ে গেছে। এজন্যই বলা হয় ভালোবাসা অন্ধ

গুলতেকিনও হয়তো আর সবার মতই অচেতনভাবে ভালবেসে ফেলেছে। তাই বিয়েও করেছে। সেটা আমরা মেনে নিতে পারছিনা বলেই এত সমালোচনা হচ্ছে। এতে প্রমাণ হয়, আমাদের মানসিকতা কতটা সংকীর্ণ, গোঁড়ামিপূর্ণ, সেকেলে এবং পুরুষতান্ত্রিক, যদিও আমরা নিজেদেরকে শিক্ষিত এবং আধুনিক বলে দাবী করি।

আমরা পুরুষের একাধিক বিয়েকে অত্যন্ত স্বাভাবিক বলেই মেনে নেই। কোন পুরুষের বৌ মারা গেলে বা তালাক হলে তাকে বিয়ে দেয়ার জন্য আমরা উঠেপড়ে লাগি! কিন্তু কোন স্বামী পরিত্যাক্তা বয়স্ক নারী ভালবেসে আবার বিয়ে করে সুখে থাকবে, এটা আমরা হজম করতে পারি না। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক ইগোতে লাগে। এটা সেই নারীর স্পর্ধাবলে মনে হয়। গুলতেকিন সারাজীবন দুঃখে-কষ্টে নিঃসঙ্গ একা জীবন কাটিয়ে দিলে আমরা খুশী হতাম। মানুষ আসলেই বিরাট ভণ্ড।

হুমায়ূন আহমেদ মারা যাবার পর এয়ারপোর্টে গুলতেকিনকে দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম। আগের চেয়ে অনেক সুন্দরী, ইয়াং, স্মার্ট এবং দৃঢ় মনে হয়েছিল তাকে। মেয়েদের আসলে এমনটাই হওয়া দরকার।

আরেকটা বিষয়। বয়স হয়ে গেলে বিয়ে করাটাকে আমাদের সমাজ অনুচিত মনে করে। কিন্তু বিয়ে মানেই যে শুধু শারীরিক সম্পর্ক নয়, এটি মানুষের মানসিক নির্ভরতার জন্যও যে ভীষণ জরুরী, সেটি আমরা কখনও ভাবতেই চাইনাএজন্যই এত সমালোচনা। আমাদের সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গীর কারণেই আমাদের বাচ্চারাও বাবা বা মায়ের দ্বিতীয় বিয়েকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনা। ফলে বাবা-মারা ইচ্ছে থাকলেও দ্বিতীয় বিয়ে করতে দ্বিধা করেন বা করেননা।

সঙ্গীর অবর্তমানে কেউ একা থাকবে, উন্নত বিশ্বে এটা কেউই পছন্দ করেনা। এমনকি, সন্তানরাও চায়না। তাই ওদের দেশে দ্বিতীয়, তৃতীয় বিয়ে ডালভাতের মত। একটা বাংলা মুভি দেখেছিলাম। নাম মায়ের বিয়েকলেজপড়ুয়া এক মেয়ে তার নিঃসঙ্গ মায়ের জন্য হন্যে হয়ে পাত্র খুঁজছে।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গীও এরকম হওয়া দরকার। তবে অনেক সময় লাগবে। গুলতেকিন ও তাঁর সন্তানরা এমন একটা উদ্যোগ নেবার জন্য সাধুবাদ পেতেই পারে।

আরেকটি বিষয়। কোন ডিভোর্সী নারী বিয়ে করতে চাইলেই তো হবেনা, তাকে ভালবাসবে, সম্মান করবে, তাকে বুঝবে, তেমন মানুষও তো পাওয়া চাই। তেমন মানুষ পায়না বলেই অনেক নারী বাধ্য হয়ে সারাজীবন একা থাকে। আবার অনেক নারী বা পুরুষ দ্বিতীয়বারও ভুল মানুষকে বিয়ে করে ফেলে (আসল চেহারা বিয়ের পরে প্রকাশ পায় বলে)। তখন তাকে দ্বিতীয়বার তালাক দেয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। তবে আশা করছি, গুলতেকিনের মানুষটি হিপোক্রেট নন। তিনি আসলেই ভালো মানুষ এবং বিয়ের পরেও তিনি গুলতেকিনকে একই রকম ভাবে ভালোবাসবেন। অবচেতন মন নিয়ে একটা কৌতুক দিয়ে শেষ করি।

এক বন্ধু : বল্ তো, ঘুমের মধ্যে মানুষ কথা বলেনা কেন?
অপর বন্ধু : কারণ ঘুমের মধ্যে মিথ্যে কথা বলা যায়না বলে।

জেগে থাকা অবস্থায় সচেতনভাবে অনেককিছু ভেবে-চিন্তে মানুষ মিথ্যে কথা বলে। ঘুমন্ত অবস্থায় অতকিছু ভাবনা-চিন্তা করা সম্ভব হয়না। তাই মিথ্যে কথা বলাও সম্ভব হয়না। এই মতবাদের উপর ভিত্তি করে মানুষকে দিয়ে সত্যি কথা বলানোর জন্য হিপনোটিজম, লাই ডিটেক্টর মেশিন, জি এস আর বা গ্যালভানিক স্কিন রেসপন্স রিডিং ইত্যাদির উদ্ভব হয়েছে। বিয়ের আগে লোকজনকে হিপনোটাইজড করে তার আসল চরিত্র জেনে নিয়ে বিয়ে করতে পারলে ডিভোর্সের হার অনেক কম হতো বলে আমার মনে হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, আমার পরিচিত এক ডিভোর্সী মেয়ে তার সব সমস্যা জানিয়ে তারচেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন তার পরিচিত একটি ছেলেকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছে, যাতে সে তার আগের পক্ষের মেয়েটিকে নিজের কাছে রাখতে পারে। বিয়ের কিছুদিন পর তার নতুন স্বামী তার সেই বাচ্চা মেয়েটিকে রেপ করার চেষ্টা করল। বিয়ের আগে যদি সে জানতো যে লোকটা একজন রেপিস্ট, তাহলে নিশ্চয়ই সে ঐ লোকটিকে বিয়ে করতো না।

মানুষ যে কতবড় ভণ্ড, তা বলে শেষ করা যাবে না !!!

 

লেখকঃ অধ্যাপক, আইইআর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.