ছাত্ররাজনীতির ইতি কথা

রাউফুল আলম

কানাডার প্রেসিডেন্ট জাস্টিন ট্রুডোকে বলা হয় বর্তমান বিশ্বের সবেচেয়ে মানবিক, স্মার্ট ও মেধাবী রাষ্ট্রনেতা। তিনি কোন ইউনিভার্সিটিতে ছাত্ররাজনীতি করে এতো বড়ো নেতা হয়েছেন, জানাবেন। বারাক ওবামা আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্টা। হার্ভাড লস্কুল থেকে পড়েছেন। তিনি কী প্রাচ‍্যের হার্ভাড থেকে ছাত্ররাজনীতির উপর ইভেনিং কোর্স করেছিলেন? জার্মানির চ‍্যান্সেলর মার্কেল, একত্রিশ বছর বয়সে কোয়ান্টাম কেমেস্ট্রিতে পিএইচডি করেছেন। রাজনীতি শেখার জন‍্য তিনি কোথায় ছাত্ররাজনীতি করেছেন? দুনিয়ার বাঘা বাঘা নেতা যারা পৃথিবী দাপটিয়ে বেড়াচ্ছেনতাদেরকে রাজনীতি শিখতে ছাত্ররাজনীতি করতে হয় না। শুধুমাত্র রাজনীতি শেখার জন‍্য বাংলাদেশের নেতাদেরই ছাত্ররাজনীতি করতে হয়!

রাজনীতি করতে হলে দরকার হয় তিনটি জিনিসসততা, কমিটমেন্ট ও সত‍্যউচ্চারণের সাহস। আর সাথে মেধা যুক্ত হলে সোনায় সোহাগা। ছাত্ররা তাদের বয়সে পড়বে। জ্ঞানার্জন করবে। কারণ এটার একটা সময় থাকে। চল্লিশ বছরে নেতা হওয়া যায়, চল্লিশ বছরে কী ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে ব‍্যাচেলর করা যায়? ছাত্রনং অধ‍্যয়ন তপএর বাহিরে তো কোন কথা নেই। সমাজের উন্নয়নে, মানুষের কল‍্যানে, বিদ‍্যাপীঠের উত্তরোত্তর মানবৃদ্ধিতে সংগঠণ করা, সহপাঠীদের সাথে তর্ক, বির্তক এগুলোর চর্চা করা অবশ‍্যই দরকার। এগুলোই হলো সত‍্যিকারের রাজনৈতিক চর্চা।

নেতার মাথায় ছাতা ধরার জন‍্য ধাক্কা-ধাক্কির নাম রাজনীতি না। নেতার সাথে ছবি তুলে পূজা করার নাম রাজনীতি না। নেতার কথায় সকাল-সন্ধ‍্যা উঠ-বসা করা, নেতার সাথে হুজুর হুজুর করার নাম রাজনীতি না। এটার নাম হলো পুচ্ছলেহন। নেতার ছায়া হয়ে থাকার জন‍্য যখন তখন কাউকে মারা, ধরে আনা ইত‍্যাদির অপকর্মের নাম রাজনীতি নয়। নেতার অপকর্মকে সমর্থন করার নাম রাজনীতি নয়। বাসে, ট্রেনে গায়ের জোরে সিট দখল করে রাখা, টাকা না দিয়ে খাওয়া, বড়ো ভাইয়ের চার্জে নিজের গায়ে গরম বোধ করার নাম রাজনীতি নয়। একটা পদের লোভে দিন-রাত নেতার ছায়া হয়ে থাকার নাম রাজনীতি না। এই রাজনীতির চর্চা করে রাজনীতিক হয় না, হয় পাষণ্ড। হয় বর্বর। নেতা হওয়ার জন‍্য ছাত্র রাজনীতি করতে হয়এরচেয়ে খোঁড়া যুক্তি সম্ভবত বাংলাদেশ ছাড়া কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। আরো দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের ছাত্র রাজনীতিতে এই চর্চাগুলোই হয়! এই চর্চা করে ছাত্রত্ব পার করা ছাত্ররা শিক্ষক হচ্ছে। অফিসার হচ্ছে। সরকারী ক‍্যাডার হচ্ছে। মানুষ পেটানোর যুব দক্ষ বাহিনী হচ্ছে।

একজন অযোগ‍্য উপাচার্যকে নামিয়ে সবচেয়ে মেধাবী, সৎ ও যোগ‍্য শিক্ষকটিকে উপাচার্য করার জন‍্য যুথবদ্ধ হওয়ার নাম ছাত্ররাজনীতি। শিক্ষকদের সামনে নৈতিক ও অধিকার আদায়ের প্রশ্ন করার নাম ছাত্র রাজনীতি। শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নেন না কেন, পরীক্ষা দেরি করে হচ্ছে কেন, রেজাল্ট দেরি করে দিবে কেনএগুলোর জন‍্য প্রতিবাদ করার নাম ছাত্র রাজনীতি। জাতীয় নেতাদেরকে ক‍্যাম্পাসে ডেকে এনে তাদের কর্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করার নাম ছাত্র রাজনীতি। বিশ্ববিদ‍্যালয়ের জ্ঞান-গবেষণার জন‍্য বাজেট বৃদ্ধির দাবিতে কণ্ঠ তোলার নাম ছাত্র রাজনীতি। শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করার জন‍্য আন্দোলন করার নাম ছাত্র রাজনীতি। একজন শিক্ষক নিয়োগেও যদি অনিয়ম হয়, সেটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার নাম ছাত্র রাজনীতি। বছর বছর গবেষণায় মান বৃদ্ধি না পেলে সেগুলো নিয়ে উর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্তাদের চাপ দেয়ার নাম ছাত্র রাজনীতি। দেশের সরকারের যে কোন অপকর্মের বিরুদ্ধে সমালোচনার নাম ছাত্র রাজনীতি।

আমাদের চলমান ছাত্র রাজনীতি থেকে সুফল আসবেএমন বিশ্বাসে যারা এটিকে টিকিয়ে রাখার সমর্থন করে তারা হয় অজ্ঞ, নয় অসভ‍্য, নয় সুবিধাভোগী।
আমাদের যে দুই নেত্রী গতো বিশ-ত্রিশ বছর ক্ষমতায় আছেতাদের যে দুই পুত্র রাজনীতি করছে, তারা কোন কালে কোথায় ছাত্ররাজনীতি করেছিলো, বলেন তো?

লেখকঃ গবেষক, কলামিস্ট ও প্রবাসী বাংলাদেশী নিউ জার্সি, যুক্তরাষ্ট্র।

 

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.