বিপন্ন সম্ভাবনা ও আশার ক্ষীণ রেখা

আরেফিন আল ইমরান
১) প্রথমত, এই ভূখন্ডের মানুষের মাইন্ডসেট খুবই ছাপোষা টাইপের। স্বপ্ন কিংবা উচ্চাশার পরিধি যখন একটা চাকরি জোটানোর চেয়ে বেশি কিছু নয়, তখন মাৎসান্যায় টাইপের ঘটনা অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। বিলো এভারেজ ক্যালিবারের এই জনশক্তির না আছে কোনো সুসংগঠিত প্রস্তুতি, আর না আছে কোনো চিন্তার অনুশীলন। আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতার জন্য নিজে বেঁচে থাকতে পারাটাই—তাদের কাছে বড় কিছু। সুতরাং, টিস্যুর মত করে যতো ইস্যুই গজাক এদের টনক তাতে নড়বে না। দিন শেষে চায়ের দোকানে নিজস্ব পরিমন্ডলে কিছুটা হাঁক-ডাক করা ছাড়া তার বিশেষ কোনো তৎপরতা নেই।

২) দ্বিতীয়ত, যাদের মাঝে দিনবদলের স্বপ্ন আছে কিংবা ছিল—তাদের একটা বড় অংশ বর্তমানে হতাশ। মেধাবীদের অনেকেই বিদেশে সেটেল করেছে। বাদবাকি যারা আছে, এরা পরিবার নিয়ে নির্বিরোধ জীবন-যাপনে অভ্যস্ত। রাজনীতি কিংবা আর্থ-সামাজিক কিছু বিষয়ে এদের সচেতনতা আছে। কোনো দ্রব্যের দাম বাড়লে, টিভিতে খবর দেখতে দেখতে খানিকটা পারিবারিক ক্ষোভ ঝেড়ে তারা ঘুমোতে যায়। ব্যাস এ পর্যন্তই। বাকি সময়টা স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে চুপচাপ থাকা। এভাবেই সপ্তাহের সাতদিন চলছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরা এভাবে একটা আপোষ করে নিয়েছে। আর নিম্নবিত্তদের তো কোনো স্ট্যান্ড নেবার প্রশ্নই ওঠেনা।

৩) অল্পবয়সী ও কিশোর-তরুণরা আপাতত পাবজি কিংবা ক্ল্যাশ রয়্যাল উদ্ধারের মহান কার্যে লিপ্ত। জ্ঞানগত ও নৈতিক ম্যাচিউরিটির আগেই এ জাতির কাছে চলে এসেছে ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইউটিউব এন্ড্রয়েড, আইফোন, পিসি, ল্যাপটপ প্রভৃতি। ফলে সাংস্কৃতিক শূণ্যতার গভীর সংকটের বিরুদ্ধে তার তেমন কিছুই করার নেই। গেমাররা গেমের লেভেল পার করছে। ফিল্টার হওয়ার আগেই হলিউড-বলিউডের টানেল পেরিয়ে যে কালচার আমাদের শেকড়কে উপড়ে ফেলতে চাইছে, আমরা বরং তাকে স্বাগতই জানিয়েছি। এদিকে লেখাপড়া করে গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ার দিনও আর নেই। যেহেতু পৈতৃক বলে এখন যে কেউই প্রাইভেট ভার্সিটি থেকে ডিগ্রি হাসিল করতে পারে, সুতরাং ডি.সি-মার্ভেল-জোকার নিয়ে ব্যাস্ত থাকলেই চলছে। প্রেমের জন্য স্কুল-কলেজের সামনে দীর্ঘ সময় লাইন দেবার প্রয়োজন পড়ছে না। ফেসবুক একাই তিরিশ-চল্লিশজনের সাথে অ্যাট এ টাইম চ্যাটের সুযোগ করে দিচ্ছে। সুতরাং, ইথুন বাবুর সুরে ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’ এমন গানের বাস্তবিক ভিত্তি আর থাকছে না। আর রবীন্দ্রনাথের কবেকার সেই লেখা—‘দিবস-রজনী আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি’ ওসব গান এই জেনারেশনের কাছে এক্সপায়ার হওয়া অ্যানটিক পিস ছাড়া আর কিছুই না।

৪) এখন ইতিহাস কী বলে ? মুঘলদের শৌর্য-বীর্য তখন অস্তমিত প্রায়। ব্রিটিশদের উত্থান ক্রমেই অনিবার্য হয়ে উঠছে। নিখিল ভারতের সেই সামগ্রিক অবক্ষয় ও বিপর্যয়ের মাঝে শাহওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (১৭০৩–১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দ) একটা দৃষ্টান্ত পেশ করে গিয়েছেন। তাঁর নিরন্তর জ্ঞান সাধনা ও চিন্তার মৌলিকত্ব উপমহাদেশকে একটা আশার আলো উপহার দিয়েছিল। তাঁর একাডেমিক তৎপরতা অনেক মণিষী তৈরী করেছিল।আসন্ন ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে তিনি দুটো অস্ত্র তৈরী করেছিলেন। একটা ছিল—গোলামীর দিকে ধাবমান জনগোষ্টীকে সম্ভাব্য সব রকম অনিষ্ট থেকে বাঁচানোর জন্য জ্ঞানগত স্ট্র্যাকচার নির্মাণ করে যাওয়া। সেটাতে তিনি নজিরবিহীন সাফল্যও পেয়েছিলেন। আর দ্বিতীয়টা ছিল—দীর্ঘমেয়াদে ভারত ভূখন্ডের সব আবর্জনা পরিষ্কারের জন্য যোগ্য উত্তরাধিকার তৈরী করে যাওয়া। এ কাজটাতেও তিনি সার্থক ছিলেন। সেই পাইপলাইন ধরেই শাহ ইসমাইল, তিতুমীর কিংবা আহমেদ ব্রেলভিদের মত লিজেন্ডরা এগিয়ে এসেছেন। শরীয়তউল্লা-দুদু মিয়া কিংবা ফকির মজনু শাহরা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। হ্যাঁ, অনৈক্য, অজ্ঞতা আর অভ্যন্তরীন গাদ্দারীর জন্য ইউরোপের রেঁনেসা ও শিল্প বিপ্লব সমৃদ্ধ চতুর ব্রিটিশরা তারপরও প্রায় ২০০ বছর আধিপত্য ধরে রেখেছিল। কিন্তু স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধির জন্য যে লড়াইটা শাহওয়ালিউল্লাহ শুরু করেছিলেন তা মোটেও বৃথা যায়নি। বরং, পদে পদে একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনাকে প্রভাবিত করতে করতে তা শেষ অবধি ব্রিটিশদের ভারত অধ্যায় ঠিকই সমাপ্ত করেছিল।ইতিহাসের এই সুদীর্ঘ বাঁকে অনেকেই ভূমিকা রেখেছেন। কেউ ধর্মীয়ভাবে, কেউ শিক্ষা বিস্তারে, আবার কেউ সামরিকভাবে। বিদ্যাসাগর থেকে সূর্যসেন, ভবানী পাঠক থেকে সুভাষচন্দ্র— এমন অনেকেই সেখানে আপন ভূমিকায় সমুজ্জ্বল। নজরুলকে নিয়ে আমার আতিশয্য এ পর্যায়ে পরিমিতই রাখলাম। গান্ধী কিংবা জিন্নাহর মত আরো অনেকেই আছেন, যারা ইতিহাসের প্রেক্ষিতে নিজস্ব জায়গা থেকে অনবদ্য ভূমিকা রেখে গেছেন।

৫) ঐ সময়ের প্রেক্ষিতে বহু কিংবদন্তীর নাম বলা যেত। ইতিহাসের অনেক নায়কের আলোচনা হতে পারত। কিন্তু আলোচনা সংক্ষিপ্তই রাখছি। মূলকথা হল—এখন কোনো সেক্টরেই আর সেই মাপের মানুষ আপনি পাচ্ছেননা। বাংলাদেশ যে, নিদারুণ চরিত্র সংকটে ভুগছে—তা বলাই যায়। কারণ, দিনশেষে একজন মানুষই পার্থক্য করে দিতে পারে। একজন কিংবদন্তী আরো অনেক কিংবদন্তীর জন্ম দিতে পারে, পথ দেখাতে পারে। একজন মার্কস, একজন লেনিন কী করতে পারেন—এটা আমরা জানি। আর এ জাতির সামগ্রিক সংকটগুলোও সচেতন পাঠকরা কম-বেশি সবাই জানেন। জীবনানন্দের ঘনীভূত অন্ধকারে, ফররুখের ‘পাঞ্জেরী’ কখন ভোরের আলো নিয়ে উপস্থিত হবে—কিংকর্তব্যবিমূঢ় জনগোষ্ঠীকে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য অপেক্ষাই করতে হবে বৈকি ! সামর্থহীনদের জন্য দিবাস্বপ্নই একমাত্র সম্বল।

মিরপুর, ২২-১১-২০১৯

লেখকঃ সাহিত্যিক  সঙ্গীত পরিচালক।

আরও পড়ুন
1 টি মন্তব্য
  1. Adeeb Imtiaz বলেছেন

    Harsh truth about the present situation of our society.

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.