প্রগতিশীলতা ও অসাম্প্রদায়িকতার ব্যাখ্যা-অপব্যাখ্যা

কাজী মুস্তাফিজ

‘অন্ধ প্রেম’ শুধু কাছে টানে না, বরং দূরেও ঠেলে দেয়। এ ধরনের প্রেমের কারণেই পৃথিবীতে যতো অসুন্দর ঘটনা ঘটে। অর্থবিত্ত (টাকা-পয়সা, ধনসম্পদ), ক্ষমতা ও নারী-পুরুষ (প্রেমিক-প্রেমিকা)- এই তিনটির কোনো একটির প্রতি ‘অন্ধ প্রেম’ আমাদের সমাজে অশান্তির কারণ হিসেবে দাঁড়ায়। যেকোনো ‘অসুন্দর’ ঘটনার পেছনে এই তিনটির কোনো একটি কারণ অবশ্যই থাকবে। সত্যিকারের প্রেম কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে গত ২৬ সেপ্টেম্বর ‘রাজনীতি, ক্ষমতার ব্যবসা ও ইসলাম’ শীর্ষক লেখায় বিস্তারিত উল্লেখ করেছি।

সব ধরনের ‘সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তি’কে রুখে দেয়ার শপথ নিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থীরা। গত বুধবার (১৬ অক্টোবর’১৯) এ শপথে তারা বলেছেন, বুয়েটের আঙিনায় আর যেন নিষ্পাপ কোনো প্রাণ ঝরে না যায়, আর কোনো নিরপরাধ যেন অত্যাচারের শিকার না হয়, সেটা নিশ্চিত করবেন সবাই মিলে। তাদের এই মহৎ উদ্যোগকে পূঁজি করে একটা স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের ফায়দা লুটার চেষ্টা করবে। ‘প্রগতিশীলতা’র অপব্যাখ্যার মাধ্যমে অনেক আগ থেকেই এই চেষ্টা চলছে। তাই তরুণদের জন্য বিষয়টি পরিষ্কার করার চেষ্টা থাকবে এই লেখায়।

‘প্রেম’ সম্পর্কিত কিছু উক্তি ও বিশ্লেষণ:

মায়ূন আহমেদ বলেছেন, “গভীর প্রেম মানুষকে পুতুল বানিয়ে দেয়। প্রেমিক প্রেমিকার হাতের পুতুল হন কিংবা প্রেমিকা হয় প্রেমিকের পুতুল। দুজন একসঙ্গে কখনো পুতুল হয় না। কে পুতুল হবে আর কে হবে সূত্রধর তা নির্ভর করে মানসিক ক্ষমতার ওপর। মানসিক ক্ষমতা যার বেশি তার হাতেই পুতুলের সুতা।”  তিনি আরো বলেছেন, “যুদ্ধ এবং প্রেমে কোনো কিছু পরিকল্পনা মতো হয় না।”

“পৃথিবীতে অনেক ধরনের অত্যাচার আছে। ভালবাসার অত্যাচার হচ্ছে সবচেয়ে ভয়ানক অত্যাচার। এ অত্যাচারের বিরুদ্ধে কখনো কিছু বলা যায় না, শুধু সহ্য করে নিতে হয়।” – এই কথাটিও হুমায়ূন আহমেদের।

এই শেষ কথাটির ব্যাখ্যায় যদি আসি তাহলে বলতে পারি, ‘অত্যাচার’ বলতে এখানে যা বুঝানো হচ্ছে তা হলো ‘ভোগে নয়, ত্যাগেই সুখ’। ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে যদি বলি তা হলো, স্বর্গকে স্রষ্টা সাজিয়ে রেখেছেন চার দিকে দুঃখ, কষ্ট দিয়ে। সেগুলো সহ্য করে তারপর স্বর্গে জায়গা করে নিতে হবে। আর নরকের চারপাশে রেখেছেন সুখ, শান্তি, আভিজাত্য, ভোগবিলাস ইত্যাদি দিয়ে ঘেরা। এগুলো যারা ইহজগতে ‘ইচ্ছামতো’ ভোগ করবেন তাদের জায়গা হবে নরকে। অর্থাৎ মূল বিষয়টি হলো ‘অন্ধ প্রেমের’ প্রভাবে নিয়মের বাইরে গিয়ে যা ইচ্ছে তাই করা যাবে না। প্রেমের সম্মানে নিয়মের মধ্যে থেকে প্রয়োজনে অনেক কিছু ‘সহ্য’ করার নামই প্রকৃত প্রেম।

আইনস্টাইন বলেছেন, জীবন হলো বাইসাইকেলের মতো। ভারসাম্য রাখতে হলে আপনাকে চালিয়ে যেতেই হবে। পবিত্র কোরআনেও তাই বলছে। ইহজগত ও পরজগতকে ‘ব্যালেন্স’ করতে বলছে। তার মানে আপনি যে শুধু ইহজনম কিংবা শুধু পরজনম কোনো একটিকে প্রাধান্য দিয়ে জীবনযাপন করবেন তা নয়। বরং ইহজনমকে বলা হয়েছে পরজনমের জন্য প্রস্তুতির জায়গা। অর্থাৎ এখান থেকে আপনাকে প্রস্তুতি নিয়ে যেতে হবে পরজনমে কেমন থাকতে চান।

স্রষ্টার বাণী- “…মানুষদের মধ্যে এমনও আছে যারা বলে, হে আমাদের প্রভু (সব) ভালো জিনিস তুমি আমাদের ইহজগতেই দিয়ে দাও, হ্যাঁ (যারা এ ধরনের কথা বলে) তাদের জন্যে পরকালে আর কোনো পাওনাই (বাকী) থাকলো না। (আবার) তাদের মধ্যে এমনও আছে যারা বলে, হে আমাদের প্রভু, তুমি এই ইহজগতে আমাদের কল্যাণ দাও, (কল্যাণ দাও) পরজগতেও; (সেদিনের বড় কল্যাণ হিসেবে) তুমি আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে বাঁচাও – (সূরা বাকারাহ: ২০০-২০১)। অর্থাৎ ইহজনম ও পরজনমের ভারসাম্যের কথা বলা হচ্ছে এখানে।

মূল আলোচনা:

শুরুতেই বলেছি, অর্থবিত্ত, ক্ষমতা ও নারী-পুরুষ – এগুলোর কারণেই সমাজে যতো অশান্তি। অর্থাৎ এগুলোকে ঘিরে যাবতীয় নিয়ম-কানুনের বাইরে গিয়ে ‘অন্ধ প্রেমে’ পড়ে যা ইচ্ছে তাই যখন করি তখনই আমরা অশান্তি ডেকে আনি। তার মানে প্রেমও করতে হবে নিয়মের মধ্যে থেকে। সৃষ্টিগতভাবেই আমরা নিয়ম শিখে আসছি। প্রত্যেক মানুষের জন্ম নারী-পুরুষের শুক্রাণু-ডিম্বানুর মিলনের মাধ্যমে হয়। যখন আমরা স্রষ্টার দেয়া নিয়মের বাইরে কিছু করতে যাই তখনই ঝামেলা তৈরি হয়।

প্রগতিশীলতা:

কয়েকমাস আগেও ‘প্রগতি’র অর্থ ভুল জানতাম আমি। বাংলাদেশের প্রচলিত সমাজব্যবস্থা আমাকে শিখিয়েছে ‘প্রগতিশীলতা’ মানে ‘ধর্মহীনতা’। কিন্তু না। প্রগতির সঠিক অর্থ হলো: ‘অন্ধের মতো কোনো কিছুকে গ্রহণ না করা’। অর্থাৎ অন্যভাবে বললে হয়, কোনো কিছু নিয়ে মুক্ত, স্বাধীন বা নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করা এবং এরপর সেটা গ্রহণ কিংবা বর্জনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। ইসলামও প্রগতির কথা বলে।

পবিত্র কোরআনের বহু জায়গায় বলা হয়েছে, এতে চিন্তাশীল মানুষদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। চন্দ্র-সূর্য কিভাবে আলো দেয়? রাত-দিন কিভাবে হয়? ছোট চারা কিভাবে বড় হতে হতে একসময় বৃক্ষে পরিণত হয়? এগুলো সম্পর্কে চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন এগুলোর অবশ্যই একজন ‘চালক’ বা স্রষ্টা আছেন। আর সেই স্রষ্টার কাছেই আমাকে ফিরে যেতে হবে। সুতরাং তিনি যে নিয়ম-কানুন দিয়েছেন সেভাবেই আমাকে জীবনযাপন করতে হবে।

ইসলামকে বুঝতে হলে ‘জ্ঞানী’ হওয়া শর্ত। যেমন: একজন কৃষকের ঘরে জন্ম নিয়ে কৃষক হতে পারে, কামারের ঘরে জন্ম নিয়ে কামার হতে পারে। কিংবা নাপিতের ঘরে জন্ম নিয়ে নাপিত হতে পারে। কিন্তু একজন কম্পিউটার প্রকৌশলীর ঘরে জন্ম নিয়ে যে কেউ প্রকৌশলী হবে, কিংবা বিজ্ঞানীর ঘরে জন্ম নিয়ে বিজ্ঞানী হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা কি আছে? অর্থাৎ প্রকৌশলী বা বিজ্ঞানী হতে হলে তাকে সেই বিষয়ে জ্ঞানের অধীকারী হতে হবে। এর জন্য তার পূর্বপুরুষ কী ছিল সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। তেমনিভাবে ইসলাম বুঝতে হলেও জ্ঞানী হতে হবে। এরজন্যও তার পূর্বপুরুষ কোন ধর্মের অনুসারী ছিল তা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

প্রকৃত অর্থে প্রগতিশীল একজন মানুষ অবশ্যই স্রষ্টার অস্তিত্ব বুঝতে পারবেন এবং তার পাঠানো সর্বশেষ মেসেঞ্জার (বার্তাবাহক) বা দূত হযরত মুহাম্মদ সা. যে সত্যের বাণী প্রচার করে গেছেন সেটির মর্ম বুঝবেন। আর কোরআনের বিষয়বস্তু যেহেতু মানুষ, তাই যে কেউ কোরআন ও এর প্রচারক মুহাম্মদ সা. এর বিষয়গুলো নিয়ে নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করার অধিকার রাখেন।

অসাম্প্রদায়িকতা:

বর্তমানে বাংলাদেশে ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ শব্দটিরও অপব্যাখ্যা চলছে। কিছু ‘অবুঝ মানুষ’ বলেন, এক ধর্মের অনুসারীরা অন্য ধর্মের মানুষের ধর্মীয় আচর-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে উদারতার পরিচয় দেবেন, এর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হবে। এর নাম ‘অসাম্প্রদায়িকতা’। এটা একটা সম্পূর্ণ ভুল ধারনা। এবং এই ধারনা আমাদের মগজে যারা দিয়েছে সেটাও খুবই সুপরিকল্পিত বলেই আমি মনে করি। কারণ ধর্মীয় প্রার্থনা, আচার-অনুষ্ঠান আর সামাজিকতা কখনোই এক নয়। সামাজিক প্রেক্ষাপটে যেকোনো ধর্মের মানুষ আমার সদাচরণ, ন্যায়বিচার, ইত্যাদি পাওয়ার অধিকার রাখেন। তার কাছ থেকে আমিও একই ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করতে পারি। অন্যদিকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান যার যার ধর্মে যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবেই হবে। এতে চুল পরিমান পার্থক্য থাকা বা মনগড়া কিছুই করা যাবে না।

বর্তমানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য বাংলাদেশ যেমন উদাহরণ, তেমনি কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা যে ঘটছে না তাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এগুলোর চেয়েও মারাত্মক দিক হলো আমাদের সমাজে ‘অসাম্প্রদায়িকতা’র অপব্যাখ্যা প্রচার হচ্ছে ব্যাপক এবং এটি তারাই করছে যারা এই দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে উঠে-পড়ে লেগেছে। এর কারণ হলো ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে তাদের ‘অসৎ উদ্দেশ্য’ পুরণ করা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলে পরোক্ষভাবে তারা সেই কাজটিই করছে।

কাজ দিয়েই মানুষকে বিচার করতে হয়। কিছু আচরণ দেখলে বুঝা যাবে কারা প্রকৃতপক্ষে সাম্প্রদায়িক মানসিকতা লালন এবং চর্চা করে। এ নিয়ে কিছু বাস্তব চিত্র তুলে ধরা যাক-

ফেনীর দাগনভূঞায় আমাদের বাসার আশপাশে অনেকগুলো হিন্দু পরিবার আছে। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি যে. তাদের সঙ্গে আমাদের সুন্দর সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে। আগে আমাদের বাসার টিউবওয়েল থেকে পানি নিতে আসতেন হিন্দু ভাই-বোনেরা। কারণ হলো তাদের পানির উৎস ‘আর্সেনিকমুক্ত’ নয়। যখন তারা কলসিভর্তি পানি নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন মুসলিম পরিবারের কারো হাত বা শরীরের কোনো অংশ ওই কলসিতে লাগলে সঙ্গে সঙ্গে সব পানি ঢেলে ফেলে দেন এবং আবার পানি নেন। অথচ যে টিউবওয়েল থেকে পানি নিচ্ছেন সেটা আমাদের কেউই চেপে পানি তুলছেন এবং সেই পানিই তারা নিচ্ছেন। অর্থাৎ সমস্যাটা মানসিকতায়।

এবার আসি মুসলিমদের বিষয়ে। তাদের মধ্যেও কেউ কেউ যে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ লালন করে না যে তা নয়। এর বড় উদাহরণ হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের পোস্টকে কেন্দ্র করে, রংপুরের পাগলাপীর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর ও কক্সবাজারের রামুতে ঘটে যাওয়া নজিরবিহীন সহিংসতা। কেউ একটা পোস্ট দিয়েছে, আর সেটার সত্যতা না জেনে ভাইরাল করা হলো। ফল হিসেবে পাওয়া গেলো অনেকগুলো মানুষের মধ্যে সহিংসতা, আগুন, হয়রানি, মামলা।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে ব্যাখ্যা:  

আগেই বলেছি, ইসলাম বুঝতে হলে জ্ঞানী হওয়া শর্ত। ইসলামী শরিয়তের নানা বিষয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে মানবজীবনের দৈনন্দিন সব কাজ দুই ভাগে বিভক্ত। একটি হলো সামাজের মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটাকে সামাজিকতা বা মানবতা বললে বুঝতে সহজ হয়। ইসলামে এটার নাম দেয়া হয়েছে ‘মুয়ামালাত’। অন্যটি হলো সরাসরি স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটাকে বলা হয় ‘ইবাদত’। ইবাদতের সঙ্গে অন্য কোনো ধর্মের তুলনা, সামঞ্জস্য কিংবা এক ধর্মের লোকজন অন্য ধর্মের ইবাদতে যোগ দেয়ার সুযোগ নাই। আর মুয়ামালাত হলো সামাজিকতার অংশ হিসেবে সব মানুষের সঙ্গে একটা সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে করা হবে।

বিভ্রান্তি যে কারণে:

বর্তমানে কিছু ‘অবুঝ মানুষ’ যে বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন, তা হলো আমার ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, অর্থাৎ যা ইবাদত বা ধর্মীয় রীতিনীতির অংশ সেখানে অন্য ধর্মের লোকজন অংশ নেবেন। এবং আমিও অন্য ধর্মের এসব কার্যক্রমে অংশ নেবো। এই ভুল ধারনা থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। মূলত অসাম্প্রদায়িকতা হলো একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেক নাগরিক ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমান সুযোগ-সুবিধা পাবেন। কোনো ধর্ম-গোত্রের দোহাই দিয়ে কোনো নাগরিকের প্রতি অবিচার করার নাম হবে ‘সাম্প্রদায়িকতা’। আরো সহজভাবে বললে, রাষ্ট্র সব নাগরিকের ধর্ম পালনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ – এই কথাটি বর্তমানে যারা প্রতিষ্ঠিত করার দুরভিসন্ধি নিয়ে এগুতে চাইছে তারাই সেই ‘অপশক্তি’; যারা ১৯৭১ সালের আগ থেকে বাংলাদেশের এই ভুখন্ড নিয়ে ‘অস্বস্তিতে’ ভুগছে।

ঐতিহাসিক ঘটনা:

ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে এটা আরো পরিষ্কার হওয়া যাবে। তা হলো পবিত্র কোরআনের সূরা কাফিরুন অবতীর্ণের কারণ। সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়। সূরাটির বিষয় এবং ঘটনা পরিস্কারভাবে স্থান, সময় ও পরিস্থিতিকে বুঝাতে সক্ষম। এটা ইসলামের উত্থানের মুহূর্তে অবতীর্ণ হয়েছে যখন সংখ্যায় অবিশ্বাসীদের তুলনায় মুসলিমরা সংখ্যালঘু এবং রসূল সা. প্রবল চাপের মধ্যে ছিলেন। অবিশ্বাসীরা তাকে তাদের ধর্মের (মূর্তিপূজা ও ইসলাম পরিপন্থী কার্যক্রম) পথে ডাকার চেষ্টা করলে তিনি কোনপ্রকার দ্বন্দ্ব ছাড়াই প্রত্যাখ্যান করেন।

রেফারেন্স:

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, ওলীদ ইবনে মুগীরা, আস ইবনে ওয়ায়েল, আসওয়াদ ইবনে আবুদল মোত্তালিব ও উমাইয়া ইবনে খলফ প্রমুখ মক্কার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কয়েকজন একবার রসূলুল্লাহ্‌ (সা.)- এর কাছে এসে বলল: আসুন, আমরা পরস্পরের মধ্যে এই শান্তিচুক্তি করি যে, একবছর আপনি আমাদের উপাস্যদের এবাদত করবেন এবং একবছর আমরা আপনার উপাস্যের এবাদত করব।

তিবরানীর রেওয়ায়েতে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, কাফেররা প্রথমে পারস্পরিক শান্তির স্বার্থে রসূলুল্লাহ্‌ (সা.)- এর সামনে এই প্রস্তাব রাখল যে, আমরা আপনাকে বিপুল পরিমাণে ধন-সম্পদ দেব, ফলে আপনি মক্কার সর্বাধিক ধনাঢ্য ব্যক্তি হয়ে যাবেন। আপনি যে মহিলাকে ইচ্ছা বিবাহ করতে পারবেন। বিনিময়ে শুধু আমাদের উপাস্যদেরকে মন্দ বলবেন না। যদি আপনি এটাও মেনে না নেন, তবে একবছর আমরা আপনার উপাস্যের এবাদত করব এবং একবছর আপনি আমাদের উপাস্যদের এবাদত করবেন।

আবু সালেহ্‌-এর রেওয়ায়েতে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, মক্কার কাফেররা পারস্পরিক শান্তির লহ্ম্যে এই প্রস্তাব দিল যে, আপনি আমাদের কোন প্রতিমার গায়ে কেবল হাত লাগিয়ে দিন (সমর্থন দিন), আমরা আপনাকে সত্য বলব। এর পরিপ্রেক্ষিতে জিবরাঈল (আ.) সূরা কাফিরূন নিয়ে আগমন করলেন। এতে কাফেরদের ক্রিয়াকর্মের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ এবং আল্লাহ্‌ তা’আলার অকৃত্রিম ইবাদতের আদেশ আছে। এই সূরার সারাংশ হলো: তোমরা যার ইবাদত করো, আমি তার ইবাদত করিনা এবং আমি যার ইবাদত করি তোমরাও তার ইবাদত করো না। তোমার কর্মফল তুমি পাবে, আমার কর্মফল আমি পাবো।

শেষ কথা:

পুরো আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে, প্রগতিশীলতা ও অসাম্প্রদায়িকতার অপব্যাখ্যা করে বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ নেই। কারণ তারা অনেক সচেতন, মুক্তচিন্তার চর্চা করে এবং সর্বোপরি দেশপ্রেমিক নাগরিক। ধর্মের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ালে তা কখনোই সফল হবে না এই দেশে। বরং অসাম্প্রদায়িকতার ধোঁয়া তুলে যারা চিৎকার-চেচামেচি করছেন তাদের বুঝা উচিত এই বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য বিশ্বে উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, তরুণ উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী

আরও পড়ুন