শিশু পার্কে একদিন

ডাঃ জোবায়ের আহমেদ

পার্কটি শিশুদের জন্য করা। কিন্ত সেখানে শিশুদের আনাগোনা খুবই নগন্য।বড় মানুষ, যুবক যুবতী,তরুণ তরুণী, কিশোর কিশোরীদের উপস্থিতি সেদিন বেশি লক্ষ্য করলাম।

কোন কারণে আমার মনের আকাশে বিষন্নতার মেঘ জমেছিলো।সেই বিষন্নতার মেঘ তাড়াতে আমার একজন প্রিয় লেখক বুদ্ধদেব গুহ এর অববাহিকা উপন্যাসটি হাতে নিয়ে ভর দুপুরে আমি গেলাম সেই পার্কে।ভাবনা ছিলো আনমনে বই পড়বো আর শিশুদের দেখবো।শিশুরা নিষ্পাপ, আমরা বুড়োরা পাপী।ছোট ছোট নিষ্পাপ প্রাণগুলো দেখে মন জুড়াবো।

আমি একটা রাইডের পাশে চেয়ারে বসলাম।চারদিকে তাকিয়ে বই খুলে পড়া শুরু করলাম।মাঝে মাঝে পড়া বন্ধ করে কানে হেড ফোন দিয়ে গান শুনলাম।সেদিন বারবার শুনেছিলাম সুবীর সেনের হৃদয়ের গহীনে নীরব ঝড় তোলা গানটা।

এত সুর আর এত গান
যদি কোনদিন থেমে যায়
সেইদিন তুমিও তো ওগো
জানি ভুলে যাবে আমায়।।

কতদিন আর এ জীবন
কত আর এ মধুলগন।
তবুও তো পেয়েছি তোমায়
জানি ভুলে যাবে যে আমায়।।

আমি তো গেয়েছি সেই গান
যে গানে দিয়েছিলে প্রাণ।

ক্ষতি নেই আজ কিছু আর
ভুলেছি যত কিছু তার।
এ জীবনে সবই যে হারায়
জানি ভুলে যাবে যে আমায়।।

আসলে এ জীবনে সবই একদিন হারিয়ে যায়।হারিয়ে যায় পাগল পাগল প্রেম, অদম্য ভালবাসা,প্রিয় কোন মুখ যার জন্য গভীর রাতে একাকীত্বের দহনে পুড়ে অশ্রুসিক্তহই আমরা।তারপর সেই মানুষের রেশটা রয়ে যায় মনের গহীনে নীরবে।
সব কিছু চাইলেই ভুলা যায় না,ভুলে থাকার অভিনয় করা যায়।

আমার ঠিক সামনে দশ হাত দূরে একটা ছেলে ও মেয়ে বসে আছে।আমার মন যখন উদাস হয়ে উঠতো,তখন আমি তাদের দেখতাম।ছেলেটার বয়স ৩০ এর কাছাকাছি হবে,মেয়েটা ২৪/২৫.হঠাৎ ছেলেটা মেয়েটাকে চুমু খেতে চাইলো,মেয়েটা মুখ পিছনে সরিয়ে নিলো।চুমু খেতে না পারার অতৃপ্তি ছেলের চোখে মুখে ভেসে উঠলো।মিনিট তিনেক পর মেয়েটা নিজ থেকেই আচমকা ছেলেটাকে চুমু খেলো।তারা অনেকগুলো সেল্ফি তুললো।মেয়েটার কাঁধে ছেলেটির হাত।তারা গল্প করছে আর মেয়েটি হেসে ছেলেটির কাঁধে লুটিয়ে পড়ছে।

আরো কিছু সময় গেলো।ছেলেটি মেয়েটির সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো।তারপর তাকে কিছু একটা বুঝাতে লাগলো।
সম্ভবত ছেলেটা মেয়েটাকে নিয়ে কোথায়ও যেতে চাচ্ছিলো।মেয়েটা রাজি নয়।মুখ ভার করে আছে।ছেলেটা খুব পীড়াপীড়ি করছে, রাগ দেখাচ্ছে কিন্ত মেয়েটা শান্ত ভাবে না বলে যাচ্ছে।ছেলেটা যখন দেখলো মেয়েটাকে পোষ মানানো যাচ্ছেনা,তখন জেদ ছেড়ে আবার মেয়েটির পাশে এসে বসলো।তারপর মেয়েটির হাত নিজের হাতের ভেতর নিয়ে খেলা শুরু করলো।

আমি যখন পার্কে প্রবেশ করি,তখন বেলা ১২ টা।শীতের দুপুর। মিষ্টি রোদ ছিলো।আমি পুরো পার্কটি আগে ঘুরে দেখলাম।মোট বারো জোড়া কপোত কপোতি পুরো পার্কে।আর আমার মত তিন চার জন একা মানুষ।
তার মধ্যে দশ জোড়া হিজাবী কপোতীকে দেখলাম।হিজাব পরিধান করে প্রেম করলে, চুমু খেলে সেই প্রেম হয়তো হালাল প্রেম হয়ে যায়।

এর মধ্যে আমার সামনে দিয়ে হেঁটে গেলো মেডিকেল পড়ুয়া একজন ছেলে ও মেয়ে।মেয়েটির গায়ে মেডিকেলের এপ্রন।
পার্কে এপ্রন পরে যাবার কারণ খুঁজে পেলাম না।আমাদের দেশের মেডিকেল পড়ুয়া মেয়েরা এপ্রন পরে শপিং এ যায়,কাঁচা বাজার করতে যায়, পার্কে গেলে ক্ষতি কি তা ভেবে মনকে প্রবোধ দিলাম।অদ্ভুত তাদের মানসিকতা।এটা সম্ভবত জাহির করার মানসিকতা যে আমি মেডিকেলে পড়ি,আমি খুব ব্রিলিয়ান্ট, আমি তোমাদের থেকে আলাদা এমন কিছু হয়ত তারা ভাবে।

দুই ঘন্টা পর প্রথম শিশুর দেখা পেলাম।মেয়ে শিশু। বাবার কোলে ছিলো।আমার সামনে এসেই বাবা শিশুটিকে কোল থেকে নামিয়ে দিলেন।তারপর শিশুটির এক হাত বাবা, এক হাত মা ধরলেন।শিশুটি হাঁটতে চাচ্ছিলো না।বাবা মা দুইজন দুই হাত ধরে তাকে টেনে নিতে চাইলে একটু পর শিশুটি টুকটুক করে হাঁটা শুরু করলো।কি মায়াবী দৃশ্য,সম্ভবত সেদিন পার্কে দেখা সেরা দৃশ্য।

জোড়ায় জোড়ায় প্রেম চলছে।প্রেমিক পুরুষটি এদিক ঔদিক তাকিয়ে টুপ করে চুমু খাচ্ছে প্রেয়সীর গালে।তারপর নিজেই লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে।

আমি যেখানে বসেছিলাম যেখানে একটি ছোট দোকান।চিপস, চানাচুর, চকোলেট ও কফি পাওয়া যায়।বেচারা দোকানীর মন খারাপ ছিলো সেদিন।আমি চার ঘন্টা খেয়াল করলাম, তার একটাকাও বিক্রি নেই শুধু আমি ৩০ টাকায় এক কাপ কফি খেয়েছিলাম।হয়তবা বিকেলের দিকে বিক্রি বাড়ে।

আমার ঠিক পেছনে একটা রাইডের পাশে অনেক বড় খোলা জায়গা।অনেকটা জঙ্গল এর মত।হঠাৎ লক্ষ্য করলাম স্কুল ড্রেস পরা দুইটা ছেলে সেখানে সিগারেট ফুঁকছে।আমি অবাক বিস্ময় নিয়ে তাদের দেখতে লাগলাম।স্কুল ফাঁকি দিয়ে পার্কে এসে এই বয়সে যারা সিগারেট খায়,তারা অচিরেই নেশার জগতে হারিয়ে যাবে অন্ধকারে।কিছুক্ষণ পর একটা ছেলে পকেট থেকে মোবাইল বের করে অন্য ছেলেটাকে কিছু একটা দেখাচ্ছে।

অতি উৎসাহ থেকে আমি তাদের অনুসরণ করতে তাদের কাছাকাছি গিয়ে আড় চোখে তাকালাম তাদের মোবাইলে কি চলছে তা বুঝতে।আমার চক্ষু চড়কগাছ, মোবাইলে পর্ণ ভিডিও চলছে।কিভাবে আমাদের কিশোররা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তা দেখে শিহরিত হলাম আতংকে।

এত বড় পার্কে আমি ছাড়া কারো হাতে একটা বই দেখলাম না।অথচ বই পড়ার সুন্দর একটা জায়গা এটা।বিকেল তিনটায় একটা মেয়ে ও একটা ছেলে আমার সামনে দিয়ে হেঁটে গেলো।দুইজন কে খুব স্মার্ট লাগলো,দুজনের কাঁধে ব্যাগ।তারা কিছু দূরে গিয়ে বসলো।তারপর মেয়েটি ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে পড়তে লাগলো।ছেলেটি একটি খাতা বের করে কি যেন লিখতে লাগতো।তাদের মাঝে শালীনতা দেখলাম।এই জোড়া টা দেখে আমার ভালো লাগছে অনেক।

বিকেল চারটার পর পার্কে ভীড় বাড়লো।বিভিন্ন বয়সের মানুষ আসা শুরু করলো।পার্ক মানুষ গিজগিজ করা শুরু করলো।

এক বৃদ্ধ আন্টি একজন বৃদ্ধ চাচাকে নিয়ে আসলেন পার্কে।। চাচাকে হাত ধরে আস্তে আস্তে হাঁটাচ্ছিলেন তিনি।তাদের চোখে মুখে দেখলাম প্রশান্তির আভা।একটা জীবন দুইজন মানুষ একসাথে কাটিয়ে এতদূর এসেছেন, সুখ ও দুঃখ নিয়েই জীবন,তাদের জীবন সুখেই যে কেটেছে তা তাদের মুখ দেখলে অনুমেয়।

অনেক গুলো ভার্সিটি পড়ুয়া একসাথে পার্কে প্রবেশ করলো।তাদের আগমনে পার্কটি চঞ্চল হয়ে উঠলো।তাদের খেয়াল করলাম।।কতটা প্রানশক্তি তাদের মাঝে।তাদের দিকেই তাকিয়ে আমার প্রিয় স্বদেশ।

আমাদের দেশের পার্ক গুলিতে সবচেয়ে বড় অসুবিধা প্রাকৃতিক কাজে সাড়া দেবার জায়গা গুলো নোংরা, অস্বাস্থ্যকর।
এত টাকা খরচ করে পার্ক গুলো গড়ে তুলা হয় কিন্ত উন্নত বাথরুম এর ব্যবস্থা কেন রাখেনা তাই মাথায় আসেনা।

আমি বাথরুমে গেলাম একবার।ফেরার সময় দেখলাম একটা মেয়ে চুপচাপ বসে আছে।তার গাল গড়িয়ে অশ্রু নামছে।কি দুঃখ মেয়েটির মনে তা ভেবে আকুল হলাম।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো।আমি মেতে রইলাম বুদ্ধদেব গুহের অববাহিকায়৫ ঘন্টা ২০ মিনিটে আমি ১২০ পেইজ পড়ে ফেললাম।
উপন্যাসের নায়িকা কোপাই।কোপাই কিন্ত নদীর ও নাম।ময়ূরাক্ষী নদীর উপ নদী কোপাই যা বয়ে গেছে শান্তিনিকেতন এর পাশ দিয়ে।এই নদীকে নিয়ে কবিগুরু লিখেছিলেন,

“আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।”

নদীর বাঁকগুলো হাঁসুলির আকৃতিবিশিষ্ট তাই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এই নদী নিয়ে লিখেন হাঁসুলি বাঁকের উপকথা।শান্তিনিকেতনের পটভূমিতে লেখা চমৎকার উপন্যাস অববাহিকা কে বন্ধ করে ব্যাগে ঢুকালাম।তারপর পার্কটি কে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে লাগলাম আমার আপন রাজ্য।সাথে নিয়ে আসলাম ৫ ঘন্টা ২০ মিনিট ধরে দেখা পার্কেরদাক্তা

লেখকঃ সাহিত্যিক ও ডাক্তার

আরও পড়ুন