বিডিআর বিদ্রোহ

সুমেরা জামান

বরপক্ষের অতি আগ্রহের কাছে হার মেনে বাবা আমার বিয়ের অনুমতিটা দিয়ে দিলেন মাকে। মা চেয়েছিল ডেট পিছিয়ে বিয়েটা দুমাস পর হোক।

কিন্তু বাবা আমাকে বললেন তুমি একজন সৈনিকের সন্তান। সৈনিকের এক চোখে দেশ আর অন্য চোখে পরিবার। দুটো চোখের একটিও গুরুত্বহীন নয়। তবে
একটিতে সামান্য সমস্যা হলে অন্যটিকে বাকী কাজ চালিয়ে নিতে হয়। দেশের জন্য যে কোন সমস্যা তার পরিবারকে মেনে নিতে হয়।
দু মাস পর অন্য কোন সমস্যাও আসতে পারে। তুমি বিয়েতে রাজি হয়ে যাও।

২০০৯ সালে জানুয়ারী মাসের ৯ তারিখে জামানের জীবনের সাথে জড়িয়ে গেলাম। বাবা তখনও নতুন জামাইকে দেখননি।

বিডিআর বিদ্রোহ আমার বিয়ের মাত্র ৪৬ দিন পরের ঘটনা। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের কারনে আমার বাবার ছুটি বাতিল হয়ে যায়।

চিকিৎসার জন্য ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বাবা সিলেট থেকে পিলখানাতে গেলেন।  এটা অফিসিয়াল অর্ডার। প্রতি ৬ মাস পরপর বাবাকে চেকআপ করাতে যেতে হত।

বিদ্রোহের দিন সকাল থেকেই আমরা কি অসহায়ের মত আমরা টিভি পর্দায় তাকিয়ে থেকেছি!
যখন দেখলাম সেনাকর্মকর্তারা মাইকিং করছে, এলাকার লোকজন আশপাশ থেকে সরে যেতে বলছে তখন কলিজা ছিঁড়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে । সেখানে আমার বাবার মত অসংখ্য বাবা বন্দি।
দেশ তখন দু ভাগে বিভক্ত।
কেউ বিদ্রোহের পক্ষে কেউ বিপক্ষে।
অথচ আমরা সকল সৈনিকদের জন্য কাঁদছি কি বিডিআর কি আর্মি!

২৫ তারিখ রাতে শেষবার যখন বাবার সাথে ফোনে কথা হয়
তখন বলেছিলাম বাবা আপনি চিন্তা করবেন না। সব আল্লাহর হাতে। হাসপাতাল থেকে পালিয়ে বাহিরে যাবেন না। রুমে থাকবেন। অথচ বাবা আমাকে বারবার বলছিল মা সবাই ভয়ে চলে গেল। সব বেড খালি। আমি একা।
কি করবো এখনো ঠিক করে বলো।

আমি বলেছি আপনি থাকবেন। কোথাও যাবেন না। এই ঘটনার কথা স্মরণ ক করে বাবা আজও  কেঁদে ফেলে ।
বিদ্রোহ নিয়ে গল্প হবে আর বাবা চোখের পানি ফেলবেনা এটা আমার মনে পরেনা। ১১ বছর ধরে এখন এই ধারা অব্যাহত।
যারা পালিয়েছে তাদের সবাই কে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

ঠিক ঐ মুহুর্তের পরিস্থিতি কি ভয়ানক তা দেশবাসী লাইভ দেখেছে।
ভেতরে চলছিল ভয়ানক হত্যাকান্ড আর বাহিরে  পাহারারত সেনাবাহিনী।

দেশের সেরা ৫৭ সেনাকে বিডিআর বিদ্রোহের নামে পৃথিবীর বুক থেকে সরিয়ে দিয়ে নতুন ইতিহাস রচনা করা হলো!

আমার বাবা ফিরে আসে ৮ মাস পর।
ঘটনার পর থেকে আমার বাবার সাথে আমাদের যোগযোগ বন্ধ ছিল।

বিডিআরদের দিয়ে সেনাকর্মকর্তাদের সরিয়ে ফেলার ফলাফল এ জাতি আজও ভোগ করছে।
আহা!
আমার বাবা ফিরে এসেছিল কিন্তু অসংখ্য বাবা হারিয়ে গেছে।
এসব ভাবলে আজো চোখ জলে ঝাপসা হয়ে উঠে।
আহা! ক্ষমতা!
রক্তের নদীতে ভাসছে!!

আরও পড়ুন