অপসংস্কৃতি ও দ্বীনের জ্ঞানের অভাব আমাদের করছে অন্ধকারাচ্ছন্ন   

সালমা সাহলি    

“তোমরা অন্ধকার রাতের ঘনঘটার ন্যায় ফিতনা আসার পূর্বেই দ্রুত সৎ আমল করো। যখন ব্যক্তি ভোর করবে মুমিন অবস্থায়, সন্ধ্যা করবে কাফির অবস্থায়, অথবা সন্ধ্যা করবে মুমিন অবস্থায় আর ভোর করবে কাফির অবস্থায়। দুনিয়ার সামান্য বিনিময়ে মানুষ তার দ্বীন বিক্রি করে বসবে।“ – হাদিস গ্রন্থ  মুসলিমে রাসুল (সঃ)এর উপদেশ বা নির্দেশ মূলক এই সহিহ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আবু হুরায়রা (রাদিআল্লাহু আনহু)। আজকের দিনে মনোযোগের সাথে যে দিকেই তাকাই, আমরা দেখতে পাবো এই ফিতনাই যেন ঘিরে ফেলেছে চারদিক থেকে সংসার, সমাজ, দেশ এবং বিশ্বময় আমাদের।

আজ আমাদের সমাজে সুখ, নিরাপত্তা শান্তি কমে গিয়ে জনজীবন দুর্বিসহ কঠিন হয়ে গেছে। চারদিকে দুর্নীতি এবং অনৈতিকতার জালে জড়িয়ে যাচ্ছে নিম্নবিত্ত অশিক্ষিত আদর্শহীন পরিবারের কম বয়সী সন্তান থেকে শুরু করে বুড়ো দিনমজুরটি পর্যন্ত। তেমনি ভাবে শিক্ষিত, আদর্শবান, উচ্চবিত্ত, উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাবান পরিবারের কম বয়সী সন্তানদের লুকিয়ে পর্ণে ঝুঁকা থেকে শুরু করে প্রবীণ মানুষটিও আত্মসাৎ, হয়রানি, খুন-গুম করে দিব্যি জীবন যাপন করছেন কোনো প্রকার অনুশোচনা ছাড়াই। সাধারণ মানুষের জীবনের মানদণ্ড নির্ধারণ হচ্ছে প্রভাবশালী জনের নিছক সার্থ আর খামখেয়ালীপনায়। দ্বীনের সঠিক জ্ঞানের অভাব, পরম্পরা কুসংস্কারের আচ্ছন্নতায় ডুবে থাকা, ধার করা সংস্কৃতির চর্চা এবং শিরক-বিদাতের কারণে মুসলিম সমাজের  আজ এই বিশাল অধঃপতন। দিন দিন কুসংস্কার আর অপসংস্কৃতির অন্ধকারে আসক্ত হয়ে পড়ছি আমি, আপনি, আমাদের পরিবার ও সমাজ। আমরা ডুবে যাচ্ছি এক ধার করা ভিন্ন অন্ধকার কূপে। আর আমরা আলো আঁধারের  ফারাকটা ধরতে পারার জ্ঞানটু্কুও রাখিনা। সম্মুখে যা পাচ্ছি তাই আঁকড়ে ধরছি, ঘিরে নিচ্ছি নিজেদের জাহিলিয়াতের চাদরে, বেঁধে ফেলছি নিজের মন্দ নফসের বেড়ীতে আর চারপাশে তুলে দিচ্ছি গোঁড়ামির দেয়াল। পারিবারিক ও সামাজিক নৈতিক আদর্শ চর্চার অভাব, ধর্মীয় অনুশাসন অমান্য এবং আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সামাজিক গণমাধ্যমের বদৌলতে খুব দ্রুত কঠিন আকার ধারণ করছে এই অন্ধকারের দেয়াল। নিম্নগামী হচ্ছে মানুষের চিন্তা চেতনা। যুগে যুগে মানুষ এভাবেই বিপথে নেমে নিজেদের করেছে বিপদগামী, যাহিল(অন্ধকারাচ্ছন্ন)। পৃথিবীর যে প্রান্তেই মানুষ এমন অন্ধকারের দেয়ালে নিজেদের ঢেকে নিয়েছিলো, সেখানেই আল্লাহ তায়ালা এক বা একাধিক নাবী বা সত্যের পথে আহ্বানকারী পাঠিয়েছিলেন। মানুষ সেই সত্যের ডাকে সারা দিয়ে সুন্দর জীবন অতিবাহিত করতে পেরেছিলো। আর যারা জাহিলিয়াতের কদর্য অবগাহনে নিজেদের অন্তর কয়লা করে ফেলেছিলো, আল্লাহ তায়ালার মনোনীত পথকে অপছন্দ করে বিরোধীতা করেছিলো, নিজেদের নফসের অনুস্মরণ করে বানিয়ে নিয়েছিলো খাম খেয়ালী নিয়ম নীতি, তাদের জন্য নেমে এসেছিলো দুর্ভোগ আযাব।

আলহামদুলিল্লাহ; ইসলাম এমন একটি পরিপুর্ণ জীবন বিধান, যেখানে কোনো ঘাটতি নাই। যেখানে বাড়াবাড়ি কিংবা সংকীর্ণতার কোনো জায়গাই নেই। এই এমনই এক পূর্ণাংগ দ্বীন  যা শুধু মাত্র নির্দিষ্ট কোনো জায়গা বা জাতীর জন্য নয়, বরং সর্ব যুগে সর্ব জাতী সর্ব স্থানের জন্য প্রযোজ্য।  যে বিধান জীবনে প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যক্তি জীবন, পরিবারিক, সমাজিক ও রাষ্ট্রিয় জীবনসহ বিশ্বে পুর্ণ শান্তি এবং দুনিয়া আখিরাতের সফলতার উচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত হতে পারে মানুষ। শুধু প্রয়োজন ইসলামের সঠিক জ্ঞান অর্জন এবং তা অনুস্মরণ।

মুসলিমদের রয়েছে দু’টি অর্থবহ আনন্দময় পবিত্র উৎসব। যে উৎসবে আছে সব রকম শালীন আনন্দ, আদর্শ বিনোদন, আছে প্রফুল্লময় উদারতা, পুর্ণ সৌহার্দতা এবং শ্রদ্ধাময় ভালোবাসা।  আর আছে খুব উন্নত শিক্ষা; সাম্যের শিক্ষা, ভালোবাসার শিক্ষা। যা আমাদের চিন্তা চেতনাকে উন্নত করে, সমৃদ্ধ করে। পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনে সুখ এবং প্রশান্তির বারতা বয়ে আনে।  এটা  আজ আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, আমরা নিজেদের সুন্দর, পবিত্র, আদর্শময় উৎসবকে এক পাশে রেখে অন্য দেশ, এবং অনেক ক্ষেত্রে অন্য ধর্মের রীতি নীতি কৃষ্টির  অনুসরণ অনুকরণ করে চলেছি। তারা যা করছে আমরাও তাই করছি। উচিত-অনুচিত, বৈধ-অবৈধ, বিদাত কিংবা কুফর কিছুকেই যেন তোয়াক্কা করার বালাই নেই। পোষা প্রাণীটির মতো দেখছি, শিখছি আর অনুকরণ করছি। কেনো করছি, কি করছি তাও জানিনা। নিজের অস্তিত্ব বিবেক, বিচার বিবেচনা বোধকে অন্যায়, অনুচিত আর সেচ্ছ্বাচারীতার অন্ধকারে চাপা দিয়ে ডুবে যাচ্ছি গহীন অতলে। ভিনদেশী কৃষ্টির সঙ্গে পরিচিতির নাম করে বিভিন্ন মিডিয়ায় কিছু লোক নিজেদের সেলিব্রেটি করার মানসে কিংবা নিজের বিকৃত রুচি, চেতনার স্বীকৃতি পাবার জন্য অল্প বয়সী কোমলমতি কৈশোর যৌবনে পদার্পিতদের মন ও মগজে বসিয়ে দিচ্ছে অপসংস্কৃতির চর্চা। তাদের দিয়ে প্রচলন করা হচ্ছে বিভিন্ন উৎসব আয়োজনের নিজেদের উদ্যোগে। কিছুদিন আগেও যে সকল (ধার করা কু)উৎসব এবং বিকৃত রুচির আনন্দ আমাদের সমাজে ছিলোনা, আজ সেগুলোকে জোর করে বলা হচ্ছে আমাদের ঐতিহ্য।  দুনিয়ার যত বার্ষিকী আর অপসংস্কৃতি আছে তা নিয়ে আমরা বড় বেশী  ব্যস্ততা ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে।  এসব ধার করা উৎসব আমরা  কেন করবো, এসব করে নিজেদেরকে আমরা  কোথায় নিয়ে যাচ্ছি, এসবের পরিনতি কি সেটা উপলব্ধি করা বা ভেবে দেখারও  সময় যেন আমাদের হচ্ছেনা। ইংরেজী বছরের শেষ মাস থেকে শুরু হয়ে যায়; তারপর এই দিবস, সেই দিবস করে চলতেই থাকে নিজেদের এবং বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন উতসবের। অন্য দেশের, অন্য ধর্মের, অন্য কৃষ্টির অনুসরণ ও উৎসব করে আমরা বলছি, আমাদের সংষ্কৃতি, হাজার বছরের ঐতিহ্য কিংবা প্রাণের উৎসব। ন্যায় এবং সত্যের কাছে এসব চেতনা মোহ যে কতোটা হাস্যকর সেই বোধটুকু আমাদের হয়না। আমরা বুঝতেই পারিনা এই সব চেতনার উৎস আসলে আসে আমাদের নীচুমানের হীনমন্যতা থেকে। বিশিষ্ট সাহাবী  আবু সাঈদ খুদরি রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত সেই হাদিসটির বর্নণাচিত্রই যেন আজ আমাদের চার পাশে ফুটে উঠেছে, তিনি বলেছিলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “ তোমরা অবশ্যই তোমাদের পরবর্তী উম্মাতের রাস্তা অনুসরণ করবে বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে। তারা যদি গুইসাপের গর্তে প্রবেশ করে তোমরা অবশ্যই তাদের অনুসরণ করবে।“ লক্ষ্য করলে বুঝা যায় এই গুইসাপের গর্তে প্রবেশের উদাহরণটিতে কঠিন অনুসরণের কথা বুঝানো হয়েছে। যা ছিলো আমাদের বিপদগামীতার সতর্কবাণী। এখনই সময় নিজেকে পরিশুদ্ধ করার, পরিবার এবং সমাজকে বিকৃত রুচি অপসংস্কৃতির অন্ধকার থেকে বাঁচানোর।  আল্লাহ আমাদের বুঝার তাওফিক দিন, সঠিক পথে চালিত করুন। হিফাযত করুন সব রকম অজ্ঞতা, কুশিক্ষা, অপসংস্কৃতি এবং সকল অন্ধকার থেকে। চিরাত্বল্লাযিনা আনআমতা য়ালাইহিম, গ্বয়রিল মাগদুবি য়ালাইহিম ওয়ালাদ্দ্বল্লিন, আমীন।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও প্রবাসী বাংলাদেশী,  লস এ্যাঞ্জেলেস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

 

আরও পড়ুন