স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

ফারহানা শরমীন জেনী

১৯৪৭ সালে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন শেষ হয়ে বিজয় এসেছিল ঠিকই কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ স্বাধীনতার স্বাদ ঠিক সেভাবে আস্বাদন করতে পারেনি।বারবার বাঙালিদের ওপর এসেছে শৃঙ্খলার বেড়ি যা তাদের মাতৃভাষা থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক মুক্তি পর্যন্ত কেড়ে নিতে চেয়েছে। মেরুদণ্ডহীন দাস জাতিতে পরিণত করতে চেয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ১৯৭১ সালের দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ যা বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকায়,বাংলার অবারিত সবুজের বুকে চীর স্মরণীয়।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর বলা কথাগুলো নিপীড়িত, শোষিত জনগনকে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে সাহায্য করে। বাঙালির রক্তে জাগিয়ে তোলে বিদ্রোহের স্রোত, অধিকার আদায়ের দৃঢ় সংকল্প।

পঁচিশে মার্চ রাতে শুরু হয় অপারেশন সার্চলাইট নামক ঘৃণ্য বর্বর অভিযান যা কালরাত্রি নামে অভিহিত। এই অভিযানের মাধ্যমে ইয়াহিয়া, ভুট্টো, নিয়াজী এদের রক্তলোলুপ অভিলাষ আরও প্রকটভাবে ফুটে ওঠে। এরফলে বাঙালি ভীত না-হয়ে হয়ে উঠেছিল দূর্বার।শান্তিপ্রিয় ঘুমন্ত মানুষ হত্যার মাধমে সৃষ্টি করতে চেয়েছিল ত্রাসের রাজত্ব।কিন্তু হিতে বিপরীত হয়।বাংলার সহজ সরল জনগন হয়ে ওঠে তাতে বিদ্রোহী।ছাব্বিশে মার্চ থেকে শুরু হয়ে গিয়েছিল সশস্ত্র যুদ্ধ।

এই স্বাধীনতা যুদ্ধের ছিল কিছু লক্ষ্য উদ্দেশ্য। ২০২১ সালে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। যা অত্যন্ত গৌরবের। কিন্তু এই গৌরব কতটা ঔজ্জ্বল্য লাভ করলো সেটাই এখন আমাদের আলোচ্য বিষয়। শিশুকাল থেকে স্বাধীনতার লক্ষ্য উদ্দেশ্য গুরুত্ব নিয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে পার হয় আমাদের রচনা শেখার অধ্যায়।কিন্তু কতটুকু শিখতে পারছি কতটুকু প্রত্যাশা পূরণ করছি আর কতটুকু আমাদের প্রাপ্তি এটাই আমাদের আলোচ্য বিষয়।

১। পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিড়ে শোষণমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু কতটা শোষণ মুক্ত রাষ্ট্র আমরা গড়ে তুলতে পেরেছি এটা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ।পেশিশক্তির কাছে হার মেনে যাচ্ছে অসহায় দূর্বল জনগণ। এর থেকে প্রতিকারের জন্য আমাদের অবশ্যই স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের স্মরণ করে তাদের আত্মত্যাগ এবং নির্যাতিত নারী ও শিশুদের সেই ভিষণ চিত্রগুলো ভেবে সুযোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। স্বার্থপর নেতৃত্ব পরিহার করতে পারলে আমরা শোষন মুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে পারবো।

২। মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ তথা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, কর্মসংস্থান প্রভৃতি নিশ্চিত করে সমাজের সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা। এই চাহিদা আমাদের মৌলিক চাহিদা। কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে প্রত্যেকের জীবীকা নির্বাহ নিশ্চিত করণ ছিল মুক্তি যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য যা নিশ্চিতকরণে আমরা এখনও সফলকাম হতে পারিনি। এর জন্য অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি দায়ী। যা ১৯৭৫ এর ১৫ ই আগষ্ট শুরু হয়ে অদ্যবধি চলছে।

৩। মুক্তচিন্তা চেতনায় সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সকল ধর্মের মানুষ নির্বিঘ্নে তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে এবং কেউ কারও ধর্মে আঘাত করবে না এটাই সকল ধর্মের শান্তিপূর্ণ রিতী।কিন্তু স্বাধীনতা এসেছে আমাদের ঠিকই কিন্তু মানসিক বৈষম্য থেকে আমরা মুক্তি পায়নি।আমরা ধর্মকে পুঁজি করে একদল আরেকদলেকে ঘায়েল করার জন্য কখনও মন্দির ভাঙছি কখনও মসজিদে কুরআন পুড়চ্ছি যার ফলে সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত হতে পারছি না পুরোপুরি।নিজের অজান্তেই পাকিস্তানি আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব লালন করছি।

৪। সকল নাগরিকের জন্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি এখনো পুরোপুরি না হলেও অনেকটা এসেছে। আমাদের যুবসম্প্রদায় বহির্বিশ্বের নাগরিকদের মতো যদি সব কাজে অংশগ্রহণ করার মানসিকতা ধারণ করতে পারতো তবে অর্থনৈতিক মুক্তি শতভাগ মিলতো আমাদের। সামাজিক ভাবে বাল্যবিবাহ শতকরা আশিভাগ বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে বর্তমান নারীবান্ধব সরকার। ৭১ সালে যত নারী ধর্ষিত হয়েছিল স্বাধীনতার পরে নারী অত্যাচার বেড়েছে বরং কমেনি।ধর্ষনের উদাহরণ হিসেবে তনু,রিশা,নুসরত, ছোট্ট শিশু, এমনকি সূবর্ণচরের সেই নারীর প্রতি পাশবিক এবং অমানবিক নির্যাতন উল্লেখযোগ্য এবং অত্যন্ত হৃদয় বিদারক সাথে ন্যাক্কারজনকও বটে। যা আমাদের সামাজিক অগ্রগতি প্রাপ্তির সূচক থেকে অপ্রাপ্তির সূচকে নামিয়ে আনে।নারী অধিকার আইন ও নারী ও শিশু নির্যাতন আইন স্বাধীনতার পরে প্রাপ্তির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক।

৫। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ মানবাধিকারসমূহ নিশ্চিত করা। ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আমরা অনেক বিষয়ে অপ্রাপ্তির মাঝে আছি যেমন ভোটাধিকার আমার স্বাধীন অধিকার কিন্তু এ অধিকার কি সবাই স্বাধীনভাবে ভোগ করতে পারছি আদতেও।আর গণমাধ্যমের উন্নতি সাধন হয়েছে প্রচুর যার ফলে মানুষ অনেক অজানা বিষয় মুহূর্তে জেনে যাচ্ছে। কিন্তু গণমাধ্যমেরও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। যখন যে সরকার থাকে গণমাধ্যম যেন তখন তার।

৭। বাঙ্গালীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির আলোকে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় সরকার থেকে শুরু করে সমাজকর্মীরা বহু চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কতিপয় সার্থান্বেষী মহলের জন্য তা স্বাধীনতার এই পঞ্চাশ বছরে বহু বিঘ্ন ঘটছে।

অনেক বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা। এতে কিছু অপ্রাপ্তি থাকলেও
গত ৪৯ বছরে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশার আলোকে আমাদের যথেষ্ট প্রাপ্তি রয়েছে, যদিও সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের কাংখিত অর্জন আজো সম্ভব হয়নি। কিন্তু আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছি। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা মুক্ত স্বাধীন স্বদেশভূমি পেয়েছি, লাল সবুজের মধ্যে লাল বৃত্তে আঁকা জাতীয় পতাকা পেয়েছি।

অধিকার আদায়ের জন্যে আত্মসচেতন হওয়ার প্রেরণা দিয়েছে এই মুক্তিযুদ্ধ। সমাজ জীবনে ব্যক্তিস্বাধীনতা, নারীমুক্তি আন্দোলন, নারী শিক্ষা, গণশিক্ষা, সংবাদপত্রের বিকাশ, সর্বোপরি গণতান্ত্রিক অধিকার চেতনা ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করেছে। আমাদের সাহিত্যে বিশেষ করে কবিতা ও কথাসাহিত্যে যতটা ব্যাপ্তি পেয়েছে তার বড় অবদান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। গণসচেতনতামূলক গান, নাটক, চলচ্চিত্র ব্যাপকভাবে রচিত হয়েছে স্বাধীনতার পর। তবে উল্লেখ্য যে, আশানুরূপভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিংবা গৌরবগাঁথা সাহিত্যে আজো প্রতিফলিত হয়নি।

এখনও আমরা চিকিৎসা ব্যবস্থায় অনেকটা মানসিক ভাবে পিছিয়ে আছি।তিনমাস আগে থেকে আমাদের যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত ছিল তা আমরা করোনা ভাইরাস সংক্রামিত হওয়ার পরও নিতে পারছি না। ডাক্তারদের জন্য নির্ধারিত পোশাকের ব্যবস্থা অন্তত আমাদের করা উচিত ছিল।

যে স্বপ্ন আকাঙ্খা সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল সেই স্বপ্ন নানা কারণেই গত ৪৯ বছরেও সাফল্যের লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি স্পর্শ করতে পারেনি।আজও শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ হয়নি যার ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন হচ্ছে না।শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি ও শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া সাফল্যের আশা দুরাশা মাত্র।

সর্বোপরি অর্থনৈতিক, সামাজিক মুক্তি ছাড়া সফলতা সম্ভব নয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরে এর লক্ষ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার মাধ্যমে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা বাঙালি বাংলাদেশী এই চেতনায় একযোগে কাজ করলে তবেই আমাদের প্রত্যাশা পূরণের পথে এগিয়ে যেতে পারবো।যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে এবং ভোটাধিকার সঠিক ভাবে প্রয়োগ এবং গণসচেতনতা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

এদেশটা একসাগর রক্তের বিনিময়ে লাখো শহীদের আত্মার ওপর ভীত গড়ে আর ত্রিশ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত ঢাল হয়ে অর্জিত। স্বাধীনতা যুদ্ধে কারও অবদানকে আমরা খাটো করে দেখতে পারি না।সুতরাং আমাদের এই বিজয় যেন প্রত্যাশা পূরণ আর প্রাপ্তির আলোকসজ্জায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। সবাইকে স্বাধীনতা দিবসের  শুভেচ্ছা।

২৫/০৩/২০২০
ফারহানা শরমীন জেনী
প্রভাষক, দর্শন বিভাগ
কমেলা হক ডিগ্রী কলেজ, বিনোদপুর,মতিহার,রাজশাহী

তথ্যসূত্রঃইন্টারনেট

আরও পড়ুন