ডিভোর্স দায়ভার কার?

আবদুল্লাহ আরমান

“ডিভোর্সে দায়ী কে,স্বামী নাকি স্ত্রী?” এটি একটি নিম্নমানের উস্কানিমূলক বিতর্ক। এই উস্কানিতে সাড়া দিয়ে নারী-পুরুষ একে অপরের দোষের ফিরিস্তি বর্ণনা করে সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীত্ব বা পুরুষত্বের অহেতুক শক্তি প্রদর্শন করছে। শক্তির মহড়া যুদ্ধের পূর্বাভাস, শান্তির নয়। তাই যারা মানুষের সামনে দুটো কথা বলতে বা লিখতে জানেন অন্তত তাদের উচিত বিতর্ক উস্কে না দিয়ে ভারসম্যপূর্ণ সমাধান নিয়ে আলোচনা করা।

দাম্পত্য সম্পর্ক একটি বিনি সুতোর মালার মতো। পারস্পরিক ভালোবাসা ,শ্রদ্ধাবোধ,দায়িত্ববোধ,বিশ্বাস, স্যাকরিফাইজ,বোঝাপড়া ইত্যাদি সেই মালার এক একটি দানার মতো। যখন এর একটি দানা সুতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয় তখন অবশিষ্ট দানা গুলোও অল্প সময়ের ব্যবধানে ঝড়ে পড়তে শুরু করে। স্বামী-স্ত্রী কিংবা তৃতীয় কোনো পক্ষ; যার বা যাদের নেতিবাচক ভূমিকার কারণে এই মালা ছিঁড়ে যায় আপেক্ষিকতার ভিত্তিতে সেই ডিভোর্স ঘটানোর জন্য দায়বদ্ধ।
আমরা পুরুষ জাতি পরিবারের অঘোষিত নেতা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা এই নেতৃত্বকে ‘ক্ষমতা’ মনে করি। নেতৃত্বের মূল অর্থ ‘দায়িত্বশীলতা’, ক্ষমতা তার একটি অংশ মাত্র। আমরা যদি দায়িত্বশীল আচরণ করতে পারতাম তাহলে উগ্র নারীবাদ গোড়াতেই প্রত্যাখ্যাত হতো। নারীর প্রতি আমাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ পরোক্ষভাবে নারীবাদের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক।

সংসার একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র,তাই রাষ্ট্রের ন্যায় এর কাজও বহুমুখী। সংসারের কোনো কাজই ছোট নয়। “অর্থ উপার্জন থেকে শুরু করে টয়লেট ক্লীন সবই সম মর্যাদার” এই ছোট্ট অনুধাবন হাজারো পারিবারিক সমস্যার সমাধান। কিন্তু পুঁজিবাদ GDP’র দাঁড়িপাল্লায় কেবল অর্থোপার্জনকে ‘কাজ’ হিসেবে মূল্যায়ন করে নারীর সাংসারিক শ্রমকে অবমূল্যায়ন করেছে,করছে। “বেকার গৃহিণী” তাদের অন্যতম উস্কানিমূলক পরিভাষা।ফলশ্রুতিতে নারী-পুরুষ উভয়ই এখন ঘরোয়া কাজকে ‘কাজ’ মনে করে না।
শিক্ষা,চিকিৎসা সহ বিভিন্ন পেশায় নারীর অংশগ্রহণ বর্তমানে ক্ষেত্রবিশেষে অপরিহার্য। রক্ষনশীল মুসলিম দেশে এর প্রয়োজন আরও জোরালো । তাই উপযুক্ত কারণ ছাড়া শরয়ী নির্দেশনা মেনে তাদের পেশা গ্রহণে নিরুৎসাহিত করার সুযোগ নেই।

কিন্তু স্বামীর যথাযথ আর্থিক সামর্থ্য ও স্বদিচ্ছা থাকা স্বত্বেও সন্তান প্রতিপালন ও সাংসারিক দায়িত্বকে উপেক্ষা করে আর্থিক স্বাবলম্বিতার নামে কর্মক্ষেত্রে নেমে পড়া বর্তমানে সাংসারিক কলহ ও ভারসাম্যহীনতার অন্যতম কারণ।

স্বামীর মা-বাবাকে যত্ন করা আমাদের দায়িত্ব নয়। যদি যত্ন নেই সেটা আমাদের ‘অনুগ্রহ(!)’ …প্রত্যক্ষভাবে এই দাবী অসত্য নয় কিন্তু পরোক্ষভাবে সম্পূর্ণ সত্যও নয়। স্ত্রীর ভরনপোষণের দায়িত্ব পালনের জন্য পুরুষরা জীবনের সবটুকু সামর্থ্য ব্যয় করে ,প্রয়োজনে প্রবাসেও যায়। তাই স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার মা-বাবার যত্ন নেয়াকে ‘দয়া/করুণা’ বলা কতটুকু মানবিক তাও বিবেচনা যোগ্য। আজকের পুত্রবধূ যখন আগামী দিনে বৃদ্ধ শাশুড়ী হবেন তখনও তিনি কি তার পুত্রবধূর সেবা বা ভালোবাসাকে ‘অনুগ্রহ/করুণা ’ হিসেবেই মূল্যায়ন করবেন? ব্যাপারটা ভেবে দেখার মতো! পক্ষান্তরে স্ত্রীকে মা-বাবার সেবাদাসী ভাবাও নিঃসন্দেহে পুরুষদের মানসিক দৈন্যতা। এক্ষেত্রে উভয় পক্ষের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রেখে আমাদের সমন্বয়ের পথে হাঁটতে হবে।

যৌতুক,মাদকাসক্তি,পরকীয়া,দায়িত্বজ্ঞানহীনতা,নির্যাতন,দায়িত্বের ভারসাম্যহীনতা,সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার,অসুস্থ পুঁজিবাদী চেতনা ,তৃতীয় পক্ষের নাক গলানো(উগ্র নারীবাদও এর অন্তর্ভুক্ত) ইত্যাদি ডিভোর্সের বিভিন্ন নিয়ামক। তাছাড়া শিক্ষার হার বৃদ্ধির সাথে সাথে ডিভোর্সের হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে,যা শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটির বহিঃপ্রকাশ। তাই শিক্ষার প্রচলিত ধারার সাথে ধর্মীয় মূল্যবোধ যুক্ত করাও সময়ের দাবী।
স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক। তিন কথার এ ভালোবাসার বাঁধন জান্নাত পর্যন্ত অটুট থাকবে।আল্লাহ প্রদত্ত জান্নাতী এ সম্পর্ককে মৃত্যু অবধি সুন্দরভাবে টিকিয়ে রাখতে চ্যালেঞ্জিং মনোভাব পরিত্যাগ করে স্বদিচ্ছা ও আত্মত্যাগের মানসিকতা হৃদয়ে ধারণ করা খুব জরুরী।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন