বিয়ে ও বোঝাপড়া( পর্ব- ২): বিয়ে যখন ফ‍্যান্টাসি!

ইমরান হোসাইন নাঈম

স্যোসাল মিডিয়ায়, প্রায় প্রতিদিনই; বিয়ে নিয়ে পোস্ট দেখা যায়। আকছার পোস্টই হয় হাস্যরসাত্মক। অনেকেই বিয়ে করতে চায় বলে পোস্ট দেয়। তারা মেয়ে খুঁজছে বলে জানায়। ব্যক্তিজীবনেও এমন অনেক যুবক আছে, যারা বিয়ে করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। তারা মেয়ে খুঁজতে শুরু করে দেয়। এবং এক সময় বিয়েও করে ফেলে।

বিশেষ করে অধুনা দীনের বুঝ পাওয়া যুবক-যুবতীর একটা বড় অংশই বিয়ে করতে আগ্রহী। বিয়ে না-করতে পারলে তারা যেন দীন পালনই করতে পারবে না— তাদের কথা শুনলে এমনটাই মনে হয়। যেকোন হারামের প্রসঙ্গ উঠলেই তারা বিয়ের কথা টেনে আনে। তাদের সঙ্গে কথা বললে মনে হয়, বিয়ে করলেই যেন তারা মুক্তি পেয়ে যাবে হারাম থেকে। এবং বেঁচে যাবে জাহান্নাম থেকে।

অথচ কতো মানুষ বিয়ে করে হারায় দীন ও দুনিয়া।

তার ওপর বিয়ে নিয়ে তাদের ফ্যান্টাসির শেষ নেই।

বিয়ে করার আগেই হাজারো স্বপ্নের জাল ‍বুনতে থাকে তারা। কখনও তারা চলে যায় সেন্টমার্টিন দ্বীপে। দু’জনে হাত ধরে হাঁটতে থাকে বালিয়াড়িতে। কখনও বা তারা উঠে যায় নীলাচল বা নীলগিড়ি পাহাড়ে। কখনও বা তারা নিজেকে আবিস্কার করে সুন্দরবনে—প্রাণের সখা বা সখির সঙ্গে।

স্যোসাল মিডিয়ায় অনেক নতুন বিবাহিত স্বামী বা স্ত্রী তাদের আনন্দের মুহূর্তগুলো শেয়ার করেন। হয়ত কখনও সন্ধ্যায় রেস্টুরেন্টে বসা ছবি আপলোড করেন। কখনও বা শেয়ার করেন তাদের নানান খুঁনসুটির গল্প।

এসব পড়েও মাথা বিগড়ে (ভালো করে পড়ুন “মাথা বিগড়ে”) যায় অনেক যুবক বা যুবতীর। তখন বিয়ে মানেই তাদের কাছে “আকাশকুসুম ভাবনা”।

এদের ধ্যান-ধারণায় বিয়ে একটা ফ্যান্টাসি হয়ে আছে। বিয়ের কিছু দিন পরই তারা বুঝতে পারে যে, বিয়ে মানে কেবল সমুদ্রে হাত ধরে হাঁটা নয়। পাহাড়ে উঠে ছবি তোলা নয়। রেস্টুরেন্টে গিয়ে লাভ আঁকা কফি পান নয়।

বরং বিয়ে মানে একটা বড় দায়িত্ব। বিয়ে মানে অন্য একটা মানুষের ভার বহন করা। স্বামী যেমন স্ত্রীর দায়িত্ব বহন করবে। স্ত্রীও তেমন বহন করবে স্বামীর দায়িত্ব।

কিন্তু এই দায়িত্ব বহনের জন্য তাদের কোন রকমই প্রস্তুতি থাকে না।

আমি এমন অনেক দেখেছি যে, বিয়ের মাত্র সপ্তাহখানেকের মধ্যেই গোলমাল বাঁধে। শুধু কি গোলমাল? বরং বিচ্ছেদও হতে দেখেছি। ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটু কৌশল অবলম্বন করলেই টেকানো যেত এই সম্পর্কটা। বাচ্চা পয়দা করার সক্ষমতা অর্জন করলেও তারা অর্জন করতে পারে নি দায়িত্ব পালনের দক্ষতা।

আমি কি বিয়ে করার যোগ্য?

বিয়ের আগে ক’জন ছেলে বা মেয়ে এই প্রশ্ন নিজেকে করে! খুঁজে দেখলে যে-কেউই হতাশ হবে। এমন প্রশ্ন করা তো দূরের কথা। যোগ্যতা বলতে কী বোঝায়, এটাই বা জানে ক’জন?

একটা ছেলে ভাবে, আমি শারিরীকভাবে ফিট। আমার ভালো চাকরি আছে। অথবা আছে টাকা। আমি একটা মানুষের পেট পালতে পারি। আমার থাকার মতো ঘর আছে। অথবা বৌ নিয়ে রাখার মতো সামর্থ আছে।

বিয়ের আগে কোন ছেলেকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, তোমার প্রস্তুতি কতোখানি?

তার উত্তর নিশ্চিতভাবে এমনই হবে যে, শাড়ি গহনা কেনা হয়ে গেছে। এখন কসমেটিক কেনা বাকি। অথবা এখনও দাওয়াতের কার্ড ছাপানো হয় নাই। বা অমুক অমুককে দাওয়াত দেয়া বাকি আছে।

যদি কনেকেও জিজ্ঞেস করা হয় তার প্রস্তুতি নিয়ে। তার উত্তরও এর চে’ ভালো হবে না। হাতে মেহদি লাগানো বাকি। বা এখনও পার্লারে গিয়ে অমুক জিনিসটা করানো হয় নাই ইত্যাদি।

বিয়র প্রস্তুতি বলতে আমরা এমনটাই বুঝি। অথচ যে ছেলেটা বিয়ে করতে যাচ্ছে, তার মাঝে দীনদারিতা নেই। মানুষকে বোঝার ক্ষমতাই নেই। সে ভালো করে একজনের সঙ্গে কথা বলতে পারে না। তার ধৈর‌্য একেবারেই কম। তার ভেতরে মানুষকে সম্মান করার কোন অনুভূতি নেই। রেসপন্সিবিলিটি বা দায়িত্ব নেয়ার মতো যোগ্যতা নেই তার। পরিস্থিতি সামলানোর মতো বোধ ও বুদ্ধি নেই ছেলের। ছেলের বয়স হয়ে গেছে অনেক। কিন্তু এখনও সে বাচ্চা ছেলেদের মতো সারাদিন ভিডিও গেমস নিয়ে মত্ত থাকে।

এই ছেলে যখন বিয়ে করবে, তখন কী ঘটবে?

সে তার স্ত্রীকে সম্মান করতে পারবে না। বিয়ের পরে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খাবে। প্রেম করার সময় তো কেবল লুতুপুত করে কেটেছে। কিন্তু বিয়ের পরই তার পাগলা ঘণ্টা বাজতে শুরু করবে। দায়িত্ব থেকে সে পলায়ন করতে চাইবে। সে ভাববে, যেন বন্দি জীবন কাটাচ্ছে। এক সময় সে কেটে পরতে বাধ্য হবে বিয়ের বন্ধন থেকে।

মেয়ের বেলায়ও অনুরূপ কথা।

আমাদের ঘরে মেয়েদেরকে এমনভাবে লালন করা হয় যেন, তার গায়ে ফুলের টোকাটা পর‌্যন্ত না লাগে। সারাদিন সিরিয়াল দেখা নয়ত বান্ধবীদের সঙ্গে চ্যাটিং করা অথবা ভিডিও গেমস খেলা, এর বাইরে মেয়েরা করে কী! পরিবার ভাবে, মেয়ে তো পরের বাড়ি চলেই যাবে। ওকে আর কষ্ট দেবো কেন!

কিন্তু পরের বাড়ি গিয়ে সে কি পারবে মানুষের সঙ্গে মিশে থাকতে। তার মেয়ে কি যোগ্য হয়েছে দায়িত্বভার গ্রহণ করার জন্য! যোগ্য মা হতে পারবে কি তার মেয়ে! তার মেয়ে কি জানে সংসার কাকে বলে! বাসায় মেহমান এলে কেমন ম্যানার বজায় রাখা উচিত, এসব কি শিখেছে তার মেয়ে!

পরিবারগুলো এমন করে ভাবে না।

বিয়ের আগে নিজের সঙ্গে নিজের কিছু বোঝাপড়া আছে।

অনেকেই ভাবেন যে, বিয়ের পর তিনি দীন পালন করা শুরু করবেন। বিয়ের পরই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে কিন্তু তা হয় না। বিয়ে বিচ্ছেদের হার প্রবলভাবে বাড়ছে। যদি সব ঠিক হয়েই যেত, তবে অনেক বিচ্ছেদই আমরা ঠেকাতে পারতাম।

বিয়ের আগে, ছেলে-মেয়ে উভয়কেই, দেখা দরকার তার কমিউনিকেশন স্কিল বা কথা বলার দক্ষতা কতোখানি। পটর পটর করে কথা বলা কমিউনিকেশন স্কিল নয়। বরং যথা সময়ে যথা শব্দটা ব্যবহার করতে পারাই কমিউনিকেশন স্কিল।

আমার ভেতরে দায়িত্ববোধ কতোখানি, এটা দেখা দরকার। আদৌও আমি বিয়ের মতো একটা গুরূত্ববহ ভার উত্তলন করতে “সজাগ” কি না! বিয়ে মানে আমি কী বুঝি, এটাও খুঁটিয়ে দেখা দরকার।

মানুষকে কি সম্মান করতে পারি আমি, এটা অত্যন্ত গুরূত্বপূর্ণ একটা বিষয়। স্বামী বা স্ত্রী অনেক কিছুই ছাড় দিতে পারে। কিন্তু সম্মানের প্রশ্ন খুবই কঠিন।

নিজেকে নিজে চিহ্নিত করতে না পারলে, অন্য কারও স্মরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। বিয়ের আগে অন্তত জানুন যে, আপনি কোন জগতে পা রাখছে্

আমি এমন কয়েকজনকে চিনি, যারা বিয়ে করতে চায়। ইতোমধ্যে মেয়েও দেখেছে বহুত। কিন্তু যখন তাদের সঙ্গে বিয়ের হাল-হাকিকত নিয়ে আলাপ করলাম, তখন তাদের মুখ পানসে হয়ে গেল। তাদেরকে তখন বললাম যে, মেয়ে ঠিক করার আগে নিজেকে ঠিক করুন।

বিয়ে কোন চাকির নয় যে, মিল হচ্ছে না তো একটা ছেড়ে আরেকটা ধরলাম। বিয়ে হচ্ছে সারা জীবনের প্রশ্ন।

একটা বিবাহবিচ্ছেদ অনেকগুলো মানুষের কষ্টের কারণ!

চলবে….. ইনশাআল্লাহ

লেখক : কলামিস্ট

আগের পর্ব

আরও পড়ুন