বেঁচে থাকার গান

তামান্না স্মৃতি

ক্রিং ক্রিং ক্রিং। সেই কখন থেকে একঘেয়ে শব্দে বাসার ল্যান্ড ফোনটা বেজে চলেছে। রেবেকা টেলিফোন সেটের পাশে বসে আছে কিন্তু সেটা ধরছে না। একবার ভাবলো ফোনটা ধরে তবে পরমুহূর্তে নিজের এই চিন্তা বাদ দিল। গতকাল থেকে রেবেকা নিজের মোবাইল ফোনের সুইচ বন্ধ রেখেছে। চাইলে বাসার ল্যান্ড ফোনের লাইনটাও ডিসকানেক্ট করে রাখতে পারে তবে আনোয়ারের কারনে তা করছে না। আনোয়ার রেবেকার স্বামী। গত পরশু সে আর আনোয়ার বিয়ে করেছে এবং বিয়ের পর সে আনোয়ারের একুশশো স্কোয়ার ফুটের বেইলী রোডের এই ফ্ল্যাটে এসে উঠেছে। আনোয়ারের আগের পক্ষের মেয়ে অপরুপা তার স্বামীর সঙ্গে নিউইয়র্কে থাকে। অপরুপা রোজ রাত আটটায় তার বাবাকে ফোন দেয়। রেবেকা ঘড়ির দিকে তাকালো। এখন আটটা পনের বাজে। এর মানে অপরুপায় ফোন করছে। এই মুহূর্তে আনোয়ার বাসায় নেই। রেবেকা কী করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। এমন না যে অপরুপার কাছে সে খুব অপরিচিত কেউ কিংবা অপরূপার অমতে সে তার বাবাকে বিয়ে করেছে। বরং তাদের দুজনের বিয়ের পেছনে যে মানুষটার অবদান সবচেয়ে বেশী সেই মানুষটা হলো অপরুপা। কিন্তু গতকাল তাদের বিয়ের একটা ছবি আনোয়ার তার ফেসবুক প্রোফাইলে শেয়ার করার পর ছবির কমেন্টে তাদের বিয়ে নিয়ে যে পরিমান আলোচনা, সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে তা দেখে রেবেকার আর অপরূপার ফোন ধরার সাহস হচ্ছে না। না জানি মেয়েটা তাদের নিয়ে কী ভাবছে? আর সবার মতো অপরুপাও তাদের বিয়েটাকে বুড়ো বয়সের ভীমরতি, নস্টামী, নোংরামি, বেহায়াপনা ভাবতে শুরু করেনি তো?
রেবেকার যখন চব্বিশ বছর বয়স তখন রফিকের সাথে তার পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের তিন বছরের মাথায় রফিক তার অফিসের ব্যক্তিগত সহকারীর সাথে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং রেবেকার কাছে এক রকম হাতে নাতে তা ধরা পড়ে। এরপর রেবেকার আর রফিকের সাথে সংসার করার রুচি হয়নি। রেবেকার বাবা মাও সবসময় রেবেকার পাশে ছিলেন। রেবেকা এবং রফিকের কোন সন্তান ছিল না। তাই রফিকের সাথে ডিভোর্সের পর রেবেকা নিজের পড়াশোনা এবং ক্যারিয়ার গোছানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছিল। এখন সে স্বনামধন্য একটা ব্যাংকের অ্যাসিস্টেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট। ডিভোর্সের পর রেবেকার পুনরায় সংসার করার প্রতি খুব একটা আগ্রহ-ও ছিল না আবার অনাগ্রহ-ও ছিল না। বরাবরই তার মনে হয়েছে যদি মনের মতো কোনো সঙ্গী পাওয়া যায় তবে কেন নয়? ন্যাড়া একবার বেলতলায় যায় একথায় সে বিশ্বাসী নয়। অপরদিকে আনোয়ারের স্ত্রী মারা যায় তার প্রথম সন্তান অপরুপা জন্মানোর সময়। অবাক হলেও সত্যি এরপর আনোয়ার আর বিয়ে করেনি। অপরুপাকে নিয়ে জীবনের অনেকটা সময় একা পার করে দিয়েছেন। মেয়েকে বড় করেছেন। নিউইয়র্ক প্রবাসী এক ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন এবং মেয়ে নিউইয়র্কে চলে যাওয়ার পর টের পেয়েছেন একাকিত্ব কী জিনিস!
আনোয়ারের সাথে রেবেকার পরিচয়ের সূত্রপাত ঘটে তার ব্যাংকে। আনোয়ার রেবেকাদের ব্যাংকের খুব পুরোনো একজন ক্লায়েন্ট ছিলেন। সেই সুবাদে আনোয়ারের সাথে রেবেকার বেশ ভালো রকমের জানাশোনা ছিল। তাদের মধ্যেকার এই জানাশোনাটা সুসম্পর্কে রূপ নিল তখন যখন অপরূপার বিয়ে হয়ে গেল। একদিকে একেবারে একা সঙ্গীহীন একজন পঞ্চাশোর্ধ পুরুষ অপরদিকে চল্লিশের কোঠায় দাঁড়ানো একজন একাকী স্বাবলম্বী নারী। দুজনের সব আছে টাকা পয়সা, আত্নীয় স্বজন, বন্ধু পরিজন সব। শুধু নেই একজন কাছের মানুষ, একজন সঙ্গী যে কিনা অবসরের সময়, মানসিক অথবা শারীরিক কষ্টগুলোর সময় কিংবা রাতের অন্ধকারে একলা কাটানো মুহুর্তগুলোতে পাশে এসে বসবে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলবে, ভয় নেই আমি আছি, আমি তোমার পাশেই আছি।

খুট করে দরজা খোলার একটা শব্দ হলো আনোয়ার ফিরল বোধহয়।
আনোয়ার ব্যস্ত ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ইশ আটটা বেজে গেছে। অপরুপা ফোন করেছিল কী?
রেবেকা বিব্রত মুখে বলল, বোধহয় করেছিল তবে আমি ফোন ধরিনি।
আনোয়ার অবাক হয়ে বলল, কেন?
– আমার ভীষণ ভয় করছিল আনোয়ার। আমাদের বিয়ের পর থেকে আত্নীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব যাদের-ই ফোন ধরেছি তারা সবাই এত বাজে ভাবে রিয়াক্ট করেছে যে আমার আর অপরূপার ফোন ধরতে সাহসে কুলোয়নি।
– আমরা কী এমন কোনো কাজ করেছি রেবেকা যে বিব্রত হয়ে কারো ফোন ধরব না? এভাবে চোরের মত লুকিয়ে থাকব। আর তুমি যদি অপরূপার কথা বলো তাহলে আমি বলবো, প্রথম থেকে আমাদের এই বিয়েতে কার সবচেয়ে বেশী আগ্রহ ছিল, অপরুপার-ই তো তাই না?
– কী জানি। সবার এত সব নেগেটিভ মন্তব্য দেখে অপরুপারও যদি এখন মনে হয় আমরা যা করেছি আসলে তা খুব গর্হিত কাজ করেছি।
– তোমার কী মনে হয়? আমরা কী আসলেই কোনো ভুল কাজ করেছি? দুজন স্বয়ং সম্পূর্ণ মানুষের কী নিজের মতো বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই?
– অবশ্যই আছে। কিন্তু সবাই যে ভাবে বলছে…
– সবার কথা বাদ দাও রেবেকা। ছয় মাস আগে তুমি যখন অসুস্থ হয়ে সাতদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলে তখন তোমার এই সবার মধ্যে কয়জন তোমাকে হাসপাতালে দেখতে এসেছিল? হাসপাতালে দেখতে আসা তো দূরের কথা এদের মধ্যে কয়জন একটা বার ফোন করে তোমার খোঁজ নিয়েছিল, বলো তো? আমরা কোনো ভুল কাজ করিনি রেবেকা। দুজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছি মাত্র। আর এতে যদি আমাদের বন্ধু বান্ধব, আত্নীয় পরিজনদের অন্তর জ্বলে তাহলে আমরা নিরুপায়, এই বিষয়ে আমাদের কিছু করার নেই । যাই হোক এসব কথা বাদ দাও। এমনিতে অনেক দেরী হয়ে গেছে। এখন তৈরি হও। এই ফাঁকে আমি অপরুপার সাথে কথা সেরে নিই।
– তৈরি হব মানে? কোথায় যাব আমরা?
– ডিনার করতে বাইরে যাব। আর শোনো দয়া করে তুমি তোমার মোবাইল ফোনটা অন করো। তুমি কোন অন্যায় করোনি যে ভয় পেয়ে তোমাকে মোবাইল ফোন বন্ধ রাখতে হবে।
রেবেকা তার স্বামী আনোয়ারের সাথে ডিনারে যাবে বলে মেরুন কালারের একটা শাড়ি পরেছে। চুলে একটা খোঁপা করে তাতে বেলি ফুলের মালা জড়িয়েছে। সে এখন গুন গুন করে রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটা সুর ভাজছে। তার মন এই মুহূর্তে খুব ভালো। একটু আগে সে অপরুপার সাথে কথা বলেছে। অপরূপার বলা কথাগুলো এখনো তার কানে ভাসছে।
” মামনি, তোমাদের নিয়ে কে কী বলল তা নিয়ে মোটেও ভাববে না। খোঁজ নিয়ে দেখো যারা তোমাদের নিয়ে এসব বলছে তাদের কেউই তোমাদের সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। তাদের কাজ-ই হলো কোনো কিছু না জেনে, না বুঝে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মন্তব্য করা। যদি আত্নীয় পরিজন বন্ধু বান্ধবদের বলো তাহলে আমি বলবো, যাদের কাছে তোমাদের কষ্ট, একাকিত্ব, অনুভুতিগুলোর কোন মূল্য নেই তোমাদের পাশে এমন নিকটজন থাকার চেয়ে না থাকা ভালো। আর মামনি তোমরা যদি আমাকে নিয়ে ভাবো, তাহলে আমি বলবো, আমি আমার বাবার একমাত্র সন্তান। আমার বাবা কিভাবে ভালো থাকবেন, কিভাবে সে মনের মত করে বাঁচবেন, কিভাবে তার দিনগুলো শান্তিতে কাটাবেন এটাই আমার একমাত্র ভাবনা। তিনি যদি ভালো থাকেন, তোমরা দুজন যদি একে অপরের সাথে ভালো থাকো তাহলে এখানে তৃতীয় কোনো ব্যাক্তির মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন, তাই না?”
হ্যাঁ আসলেই তাই। এখন থেকে রেবেকা আর অন্যের কথায় প্রভাবিত হয়ে নিজের মন খারাপ করবে না। নিজেদের ভালো সময়গুলো অযথা মন খারাপ করে নষ্ট হতে দিবে না। রেবেকা তাই হাসিমুখে মোবাইল ফোনের সুইচটা অন করে দৃঢ় প্রত্যয়ে তার স্বামী আনোয়ারের সাথে ডিনারে যাওয়ার জন্য বের হলো।

(সমাপ্ত)

লেখকঃ গল্পকার ও ডাক্তার

আরও পড়ুন