সংসারের হালচাল

অধ্যাপিকা মৌলুদা খাতুন মলি

(এক)
আজকে আমি প্রচণ্ড রেগে আছি। মাথায় রক্ত চড়ে গ্যাছে। কিছুতেই রাগ কমাতে পারছি না। ক্যানো?
হ্যা, সে কথাই বলবো ।
একটু ওয়েট।
‘করোনা’ আসার পর থেকে আমাদের সংসারের হালচাল পুরোই বদলে গ্যাছে। ঘুম, খাওয়া, লেখাপড়া- সবকিছুতেই অনিয়ম। এই অনিয়মই য্যানো আজকাল পাকাপোক্তভাবে নিয়মে পরিণত হয়েছে।
তবে- নানান অশান্তির মাঝে একটাই মানসিক প্রশান্তি যে- আলহামদুলিল্লাহ্‌, আমাদের সবার একসাথে জামাতে নামায, নফল রোযা, কুরআন-হাদিস-অধ্যয়ন, পারিবারিক বৈঠক, কুরআন হাদিসের আলোচনা- আগের তুলনায় অনেকগুণ বেড়ে গ্যাছে। হয়তবা ‘করোনা’য় মৃত্যুর ভয়ে এটি হয়েছে। তা যাই-হোক। আল্লাহ্‌ পাক য্যানো সবার মাঝে এভাবে আমল করার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন, আমিন।
তো রোজ ভোর সাড়ে চারটার দিকে- আমি, বেলাল আগে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ে কুরআন অধ্যয়ন অথবা দোয়া-দরুদ পড়ি। তারপর সোয়া পাঁচটার দিকে বাচ্চাদের ডাকি। জামাতে ফজর নামায শেষে চা-নাস্তা করে একদম ইশরাক পড়ে আবার শুয়ে পড়ি।
‘ইশরাক’ নামায সম্পর্কে একটি সহীহ হাদিস শুনুন-
রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জামাতের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করল এবং সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহর জিকিরে বসে থাকল; অতঃপর দুই রাকাত (ইশরাক) নামাজ আদায় করল, সে একটি পরিপূর্ণ হজ ও ওমরাহর সওয়াব পাবে।’ সুবহানআল্লাহ!!
(তিরমিজি, হাদিস : ৫৮৬)।
——
আমি, বেলাল আবার ন’টা/সাড়ে ন’টার দিকে উঠে চাশত নামায পড়ি। বেলাল ডাইনিং টেবিলে বসে কুরআন, দোয়া দরুদ পড়ে আর আমি রান্নাঘরের কাজ শুরু করি। এটিই আমাদের মোটামুটি প্রাত্যহিক রুটিন।
উল্লেখ্য- আপাতত কোনোই কাজের লোক নেই। শুধু বাইরের সিঁড়ি মোছার জন্য একজন (সীমা) আছে।
ফলে-আমার উপর অতিরিক্ত কাজের চাপ। একটুতেই মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে তাই। ওদিকে হসপিটালে রুগী ভর্তি আছে। সেখানেও যেতে হচ্ছে। সবকিছু মিলে মারাত্মক খারাপ পরিস্থিতি সামাল দিতে দিতে জানের বারোটা বেজে যাচ্ছে।
তারমধ্যে-
সকালে চা খেতে খেতে কথা হলো যে- জিহান আজ থালাবাসন মাজবে। বেলাল বটতলা থেকে সবজি কিনে আনবে। আমি উঠে জাস্ট কেটে-বেছে রান্না করবো। ব্যস।
ঘুম থেকে উঠে চুলারপার নোংরা দেখলে- আমার আবার মাথায় আগুন লেগে যায়। তাইজন্য (বেশিরভাগ দিন) আমি রাতেই মাজাঘষা কমপ্লিট করে রাখি।
আজ উঠতে একটু দেরি হয়ে গ্যাছে। সাড়ে দশটায় উঠে দেখি বেলাল ডাইনিং টেবিলে কুরআন পড়ছে। মাশুকের অনলাইনে পরীক্ষা চলছে- জিহানেরও ক্লাস…। আশিক তখনো অঘোরে ঘুমুচ্ছে। সিংকে এঁটো হাড়িপাতিলের স্তুপ। হয়ত আরেক দফা চা হয়েছে । আমি বেলালের দিকে তাকালাম। ভাবগতিক দেখে বেলাল কুরআন পড়ার সাউন্ড বেড়ে দিয়ে আরও মনোযোগী হলো। আড়চোখে একবার আমাকে দেখে নিয়ে শুধু আস্তে করে বললো-
— মাশুকের কিন্তু পরীক্ষা চলছে মলি, আর জিহানের ক্লাস..। শান্ত হও। বললাম-
— বুঝলাম। কিন্তু তুমিও তো পারতে..একটু সাহায্য করতে..। এখন যে আমি রাগ কিছুতেই কন্ট্রোল করতে পারছিনা, তার কি হবে?
সবজি কোথায় উঁ? রাতে যে এত করে বলে রাখলাম! এখন তো আরও মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে বেলাল। বাজারেও যাওনা। দুয়ারের পাশেই তো দোকান (বটতলা)। এটুকুন কাজও করতে পারবে না?
ঠিক আছে। তোমরা সবাই ঘরে বসে থাকো- আমিই যাচ্ছি বাজারে। ‘করোনা’ ধরলে আমাকেই ধরুক। মরি– আমিই মরি! তোমরা সব ভাল থাকো!!
আমার কথাগুলো কানে গ্যাছে কিনা জানিনা। দেখি, একই সাথে দুই ঘরের দরজা খুলে গ্যালো। ভারসাম্য রক্ষাকারী, ধীরস্বভাবের ‘মাশুক’ হাসিমুখ নিয়ে বের হলো– জিহানও। ওমা চেয়ে দেখি আশিকও!! সবার মুখেই বদমাইশি হাসি…!!
মাশুকঃ আমরা এখন কেউই কিচ্ছু খাবো না মামনি। একদম পেটভরা। তুমি ধীরেসুস্থে রান্না করো। জুম’আ নামায পড়ে এসে- সবাইমিলে একসাথে খাবো ইনশাআল্লাহ।
জিহানঃ (জিভ কেটে) সরি, মামনি। ইশ! মাজতে একদম ভুলে গেছি। এই এক্ষুণি পটাপট মেজে দিচ্ছি মামনি। তুমি সরো। মাজাঘষা কোনো ব্যাপার হলো নাকি?
আশিকঃ মামনি, তুমিতো ‘মপ’ কিনে এনেছো। আমি ঘরমোছার থিওরি জানি। একটু দেখে দিলেই মুছতে পারবো ইনশাআল্লাহ। তুমি কোনো চিন্তা করো না মামনি। এখন থেকে ঘর-দুয়ার আমিই মুছবো। সপ্তাহে একিদিন।সংসারের কাজ করা তো সুন্নত, সওয়াবের কাজ তাইনা মামনি???
আমি রাগ ভুলে বেলালের দিকে তাকালাম।
বেলালঃ গিজার ছেড়ে রোজ দু/একটা করে কাপড় আমিও ধুতে পারবো মলি। তাছাড়া এমাসেই তোমাকে ওয়াশিং মেশিন কিনে দিচ্ছি , ইনশাআল্লাহ। তুমি একদম কোনো চিন্তাই করবে না। করোনাকালীন দুঃসময়ে কাজের লোক না রাখাই ভাল। শীত পার হোক। তারপর দেখা যাবে..। ধরো, সার্বক্ষণিক আমরা তোমার পাশেই আছি।।
(দুই)
জুম’আ নামায পড়ে মাশুক, আশিক বাসায় এলো। বেলাল গ্যাছে ভাই-পাগলা গোরস্থানে- কবর জিয়ারত করতে। রোজ শুক্রবার যায়। খুব ভালকথা।
আমি নামায পড়ে ডাইনিং টেবিলে বসা। বাচ্চারাও। প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছে আমার। বেলাল আসছে না। প্রায় তিনটে বাজে তখন। ফোন এলো। বেলালের…ফোন।
ঃ হ্যালো, রোদের মধ্যে হাঁটতে মজাই লাগছে মলি। তোমার জন্য ডাব কিনে আনি? সেদিন কিনতে বলেছিলে। তোমার শরীর, মেজাজ নাকি খুব চড়া!! তো ডাব খাওয়া দরকার, তাইনা?
আমিঃ (প্রচণ্ড রেগে) উহ বেলাল! আমি রোজা রাখলে ডাব খাই। গতকাল পর্যন্ত টানা রোজা ছিলাম। কই, তখন তো কিনে দাওনি? বলার পরও…। আর এখন আমি ভাতের ক্ষুধায় অস্থির। খাবার নিয়ে টেবিলে বসে আছি- আর তুমি কিনা যাচ্ছো ডাব কিনতে বেলাল? এটাই তোমার বিবেক, আক্কেল…ভালবাসা..!!! আর তুমি রিক্সা না নিয়ে ভরদুপুরে রোদের মধ্যে হাঁটছো ক্যানো? যদি অসুস্থ হয়ে পড়ো?
মাশুক হেসে বললো–
ঃ মা শোনো। আব্বু খুব সহজসরল। কখন, কোন কথা বলতে হবে– আব্বু সেটা মোটেই বুঝেনা। ফলে- ভাল করতে গিয়ে- চরম ল্যাঠা পাকায়। কথা গুছিয়ে না বলতে পারলে– কখনো-সখনো বিপত্তি যে ঘটে, আব্বু তার চলন্ত উদাহরণ । এখন ডাবের কথা তোলার কি দরকার ছিল??
আমি আমার শ্রদ্ধাভাজন শাহাদত স্যারের রেফারেন্স টানলাম-
“নিজের কথাটা গুছিয়ে না বলতে পারার কারনে অনেক বিরোধ বাঁধে, অনেক সমস্যা অমিমাংসিত থেকে যায়।
নিজের বক্তব্যটা গুছিয়ে উপস্থাপন করতে পারা জরুরি”।
(শাহাদত হোসেন স্যার। জেলা জজ)।
একই কথা শুধুমাত্র উপস্থাপনের কারণে- অনেক সময় অর্থ-পার্থক্য ঘটে। সাথে বিপত্তিও বাড়ে।
কথা আর্ট। সুন্দর করে কথা বলতে পারাটা ন্যাকামি নয়- ভদ্রতা।
আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘সদ্ব্যবহার, সুন্দর কথা ওই দান অপেক্ষা উত্তম, যার পেছনে আসে যন্ত্রণা”।
(সূরা-বাকারা-২৬৩)।
রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘সুন্দর আচরণই নেক আমল। ’
–সহীহ মুসলিম
আল্লাহ্‌ পাক আমাদেরকে সবার সাথে গুছিয়ে সুন্দরভাবে, সুন্দর ভাষায় কথা বলার তওফিক দিন, আমিন।
——-
মলি, বগুড়া।
০৫ ডিসেম্বর, ২০২০খ্রিঃ।

লেখকঃ শিক্ষক ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন