সুখের মরীচিকা

-আবদুল্লাহ আরমান

বাদামকে অনেকে ‘প্রেমফল’ বলে! কারও নিকট এটা নাকি উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক ফল। বিকেলের মৃদু হাওয়ায় কড়া ভাজা বাদাম ও ঝাল লবনের সাথে মিষ্টি মিষ্টি গল্পের রসায়নটা জমে ভালোই ! হাতের মৃদু মর্দনে ছাড়ানো বাদামের লাল আবরণে ফুঁ দেয়া বাতাসে কতো যে গল্প লুকিয়ে থাকে তার ইয়ত্তা নেই!

বিয়ের পর  খুব শখ ছিল উভয়ের পছন্দের  সেই বিশাল জলরাশির তীরে দু’জন পাশাপাশি হাঁটবো, ঠোঙ্গা ভরে বাদাম নিয়ে একটু নির্জনতায় বসে আমি আদর্শ স্বামীর মতো বাদামের খোসা ছাড়াবো আর আমার ‘উনি সাহেবা’ জগাখিচুড়ি গল্পের পুটলির বাঁধনটা খুলে দিয়ে আমার দু’কান ঝালাপালা করবে। আমি বোকার মতো ওর নেকাব পরা মুখের দিকে তাকিয়ে বাদামের সাথে বিচিত্র সব গল্প  গলাধঃকরণ করতে থাকবো। আহা! পৃথিবীতে এমন সুখ  আর কয়টা আছে!

কয়েকটি চন্দ্র বছর গত হয়েছে। জানালার গ্রিল ধরে হাতে কফির পেয়ালা নিয়ে জোসনা রাতে দুজনের  “চন্দ্র উপভোগ” হলেও মধুচন্দ্রিমার সেই আশা আজও পূর্ণ হয়নি! গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে বেকার ও ছাত্রাবস্থায় বিয়ে করাই যেখানে একরকম ‘বিলাসিতা’ সেখানে বাবার টাকায় মধুচন্দ্রিমার চিন্তা তো ‘অন্যায়’ বৈকি!

ওদিকে ৬ বছর আগে কেনা আমার মানিব্যাগ দেখতে যতটা না করুণ, তার আর্থিক দৈন্যতা ছিল আরও শোচনীয়। ওটার নাম ‘মানি’ব্যাগ হলেও কয়েকটা পুরাতন কাগজ ছাড়া মানির মুখ দেখার সৌভাগ্য খুব একটা হয়নি তার! বধূ আমার মানিব্যাগের ভিতর ও বাইরের এই দশা দেখে সেই জলরাশি দেখার বাসনা হৃদয়ের জলেই সাময়িক জলাঞ্জলি দিয়েছিলো হয়তো!

কিন্তু তাতে কি! ভ্রমণপিয়াসী যুগলের ভ্রমণ তো আর থেমে থাকেনা! শশুর বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট জলরাশির বড়াল নদী আমাদের হতাশ করেনি! তার তীর বেয়ে দুজনে বহু হেঁটেছি, পাশাপাশি বসেছি আর  সস্তায় কেনা প্রেমফল আমাদের সময় দীর্ঘ করতে সহযোগিতা করেছে!

আজ আল্লাহ নতুন মানিব্যাগ দিয়েছেন, সেই জলরাশি অনেকবার দেখার মতো যথেষ্ট অর্থও তাতে আছে…… কিন্তু আজ নেই শুধু ‘সময়’! একসময় হয়তো সময় ও অর্থ উভয়ই থাকবে, থাকবেনা হয়তো আয়ু,সুস্থতা বা যৌবনের মতো পাশাপাশি হাঁটার আকুলতা!

👉এটাই দুনিয়ার জীবন,সুখের সব উপাদান এখানে একসাথে পাওয়া অসম্ভব! এ দুনিয়ায়  প্রতিনিয়ত হাজারো সীমাবদ্ধতা আমাদের ঘিরে ধরছে! এখানে একটা সুখ খুঁজতে গেলে আরেকটা হাতছাড়া হয়ে যায়। মরিচীকার মতো পরিপূর্ণ সুখ অর্জনের জন্য আমরা ছুটছি অবিরত। আমাদের এ যাত্রার আদৌ শেষ আছে কি?
মহান আল্লাহ বলেনঃ
اَلۡہٰکُمُ  التَّکَاثُرُ.حَتّٰی زُرۡتُمُ  الۡمَقَابِرَ ؕ
অর্থঃ “অধিক (পার্থিব) সুখ সম্ভোগ লাভের মোহ তোমাদেরকে (অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে) ভুলিয়ে রেখেছে। এমনকি (এ অবস্থাতেই) তোমরা কবরে এসে পড়”। (সূরা তাকাছুর:১-২)

জান্নাত, সেই কাঙ্খিত জান্নাত! মুমিনের বিশ্বাসে যেখানে নেই কোনো  অপূর্ণতা, সীমাবদ্ধতা,জীর্ণতা ও সময়ের সংকীর্ণতা! সেখানে আছে সুখ উপভোগের অফুরন্ত সময় ও উপাদান! জান্নাতের সাথে দুনিয়ার সুখের মৌলিক পার্থক্য এখানেই! তাইতো আল্লাহর কাছে আমাদের এই দোআঃ
اللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنَ النَّارِ
অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনার জান্নাত আমাদের করুন দান আর জাহান্নাম থেকে দিন পরিত্রাণ!

আবদুল্লাহ আরমান – লেখক ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন