Ads

স্বামী-স্ত্রী তালাকের পরও ভালো বন্ধু হতে পারে কি?।। ৫ম পর্ব

।। জামান শামস ।।

তালাক খুবই অপছন্দীয় কাজ

ইসলাম কখনো কামনা করে না দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটুক, স্বামী স্ত্রীতে বিচ্ছেদ হয়ে একটি পরিবারের বিলুপ্তি ঘটুক কিন্তু তবুও কোনও কারণে যদি স্বামী স্ত্রীতে একত্রে ঘরসংসার করা একেবারেই সম্ভব না হয়, পারস্পরিক সম্পর্ক যখন তিক্ত হয়ে পড়ে, একজন আরেকজনকে একেবারে সহ্য করতে না পারে তখন এ বাঁধনকে কোরামিন দিয়ে জিইয়ে রাখার কোন অর্থ হয় না। এমতাবস্থায় বিয়ের রশি ছিন্ন করে উভয়কে যন্ত্রনা থেকে নিস্কৃতি দেয়াই অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামে এরূপ সম্পর্কের অবসানকে তালাক বলে। ইসলামে তালাক কোন পছন্দনীয় কাজ নয়। আল কুরআনের একটি বাণী কিংবা হাদীসের একটি উদ্ধৃতিও এমন নেই যাতে তালাককে উৎসাহিত করা হয়েছে। স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক যখন এতদূর খারাপ পর্যায়ে পৌঁছে যেখানে ঐক্য ও সৌহার্দের আর কোন সম্ভাবনা নেই, সংশোধনেরও রাস্তা বাকী থাকেনা এমতাবস্থায় উভয়ের জীবন রক্ষার্থে তিক্ততার অবসান কল্পে একটি নিরুপায় পন্থা হিসাবে তালাককে অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

রাসূল (সাঃ) বলেন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিন্দনীয় ও নিকৃষ্ট হালাল হচ্ছে তালাক। (আবু দাউদ)

তালাক কোনও খেল তামাশা নয়। অনেকেই মনে করে তালাক খুবই সহজ ব্যাপার মনে করে একের পর এক বিয়ে করে এবং একের পর এক তালাকও দেয়।এ বিষয়ে আগামী পর্বে উদাহরনসহ লিখবো ইনশাআল্লাহ। অশিক্ষিত, অজ্ঞ, মুর্খ পুরুষরা কথায় কথায় স্ত্রীদের তালাক দেয় এমনকি দিনে তিনবারও তালাক ঠুকে দেয় আবার তালাক দেয়া স্ত্রীকে নিয়ে ঘর সংসারও করে। আবার কেউ কেউ তো বলে,তালাক হলে কি হবে আমরা পূর্বের চেয়েও এখন একজন অপরজনের ভালো বন্ধু। নির্লজ্জতারও সীমা থাকা উচিত। এভাবে তালাককে একটি খেল তামাশার বস্তু বানানো হয়েছে।

রাসূল (সাঃ) বলেন “তোমাদের কি হল? তোমরা আল্লাহর বিধান নিয়ে তামাশা করছ। একবার যাকে তালাক দিচ্ছ আবার তাকেই গ্রহন করছ। (ইবনে মাযাহ)

হযরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে বলা হয়েছে তোমরা বিয়ে কর কিন্ত তালাক দিওনা কেননা তালাক দিলে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে।”

আরও পড়ুন-

স্বামী-স্ত্রী তালাকের পরও ভালো বন্ধু হতে পারে কি?।। ৪র্থ পর্ব

কিভাবে তালাক কার্যকর হয়

১. স্বামী ও স্ত্রী তালাক দানের পূর্বে উভয়কেই নিজের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে ভাবতে হবে। একে অপরের অধিকার কতটুকু রক্ষা করেছে যার যা কর্তব্য ছিল দাম্পত্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর তা যথার্থভাবে পালন করেছে কি? কেননা আমাদের প্রত্যেককেই স্ব স্ব দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে আল্লাহর কাছে দায়ী হতে হবে আদালতে আখেরাতে। অধিকার ও কর্তব্যকর্ম সম্পাদনের ক্ষেত্রে তিনি কাউকেই বিনা জিজ্ঞাসায় জান্নাত জাহান্নামের ফয়সালা দিবেন না।

২. স্বামী স্ত্রীতে মনোমালিন্য হলে প্রত্যেকেই নিজের সহ্য শক্তিকে বৃদ্ধি করবে। একজন গরম বা চরম হলে আরেকজন অবশ্যই নরম হবেন। অন্তত পক্ষে দাম্পত্য জীবনের পবিত্রতা রক্ষার্থে। সন্তানাদি থাকলে তাদের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে উভয়কেই নিজের জিদ, রাগ, ক্ষোভ প্রশমিত করতে হবে।

৩. এরপরও যদি দেখা যায় বিরোধ ক্রমশ: বেড়েই চলছে এবং একজনের জন্য আরেকজন অসহনীয় হয়ে উঠছেন তখন প্রত্যেকের তরফে একজন করে শালিসকারী হিসাবে উভয়ের মধ্যে মিলমিশ প্রতিষ্ঠার জন্য ডাকা হবে। তারা উভয়ের বক্তব্য শুনবেন এবং উভয়কে বিচ্ছেদের পরিণতি সম্পর্কে অবহিত করবেন। বুঝিয়ে শুনিয়ে মিলমিশের আহবান জানাবেন প্রয়োজনে দূর থেকে তাদেরকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন যাতে করে তাদের মধ্যে বিরোধ মিটে যায়।

তালাক খুবই অপছন্দীয় কাজ

৪. এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে স্ত্রীর পবিত্রাবস্থায় মাত্র একটি তালাক দিবে। স্ত্রীকে কোনভাবেই ঘর থেকে বের করে দিতে পারবে না কিংবা খোরপোষও বন্ধ করতে পারবে না। স্ত্রী স্বামীর ঘরেই ইদ্দত অর্থাৎ তিন ঋতুকাল অবস্থান করবে। স্বামী স্ত্রীতে কোন সম্পর্ক থাকবে না কথাবার্তা দেখা সাক্ষাৎ নিয়ন্ত্রিত হবে, যৌন সম্পর্ক তো নয়ই। যৌন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হলে অথবা কামভাবে একে অপরকে সম্পর্শ করলে তালাক অকার্যকর হয়ে যাবে। এটি একটি মনস্তাত্বিক পরীক্ষা। যে সংসারে ছেলে মেয়ে আছে সেখানে মা বাবার এমন অবস্থা কতটা লজ্জাকর ও অসহনীয় হতে পারে তা কল্পনা করাও কষ্টকর। এর মধ্যে মিলমিশ হলে উভয়ে কোন রকম বাধ্য বাধকতা ছাড়াই পূর্বের অবস্থায় অর্থাৎ দাম্পত্য সম্পর্কে ফিরে যেতে পারবে।

৫. এরপরও যদি স্বামী স্ত্রীতে মিলমিশ না হয় তাহলে প্রথম তালাক দেওয়ার তিনমাস পর দ্বিতীয় তালাক প্রয়োগ করবে এবং একই ভাবে তিন ঋতু পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। এর মধ্যে মনোমালিন্যের অবসান ঘটলে এবং স্ত্রীর সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে নুতনভাবে উভয়কে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে যেমনটি নুতন বিয়ের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। স্ত্রী ইচ্ছা করলে এই সংসারে ফিরতেও পারে নাও ফিরতে পারে। এ ব্যাপারে তার উপর কোন চাপ প্রয়োগ করা যাবে না।

৬. দ্বিতীয় তালাক ঘোষণার তিন মাসের মধ্যে কোন মিলমিশের লক্ষণ না থাকলে স্বামী তৃতীয় তালাকের অধিকার প্রয়োগ করবে। তৃতীয় তালাকের অর্থই হবে স্ত্রী তার জন্য চিরতরে হারাম হয়ে গেল পুনরায় উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার আর কোন উপায়ই বাকী রইল না। সমস্ত মাযহাবের মত এই যে দুই বার তালাক দেওয়ার পর ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে স্বামী মুখে তালাক না দিলেও স্বতঃসিদ্ধভাবে বিবাহ বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়। (ইবনে কাসীর)

আরও পড়ুন-

ট্যাবু ভাঙার নামে শালীনতাবোধ হ্রাসের প্রশিক্ষণ !

৭. স্ত্রীলোকদের মাসিক বা ঋতুকালিন অবস্থায় তালাক দিলে তা প্রত্যাহার করে নিতে হবে । কেননা এ অবস্থায় মহিলারা মানসিক ও শারীরিক ভাবে সুস্থাবস্থায় থাকে না । খিটখিটে মেজাজে থাকে, মনমানসিকতা ভাল থাকে না। সবচে বড় কথা হল এসময় স্বামী স্ত্রীতে শারীরিক মিলন নিষেধ করা হয়েছে। আশা করা যায় যে স্ত্রী পবিত্র হলে স্বামী স্ত্রীর সহবাস হলে স্বামীর মধ্যে হয়তো তালাকের চিন্তাই থাকবে না।

৮. একই সঙ্গে তিন তালাক দিতে নিষেধ করা হয়েছে। অধিকাংশ ফুকাহার মতে এ ধরনের তালাক তালাকে বিদআত। একই সাথে তিন তালাক প্রয়োগের ফলে সংশোধন ও মিলমিশ প্রতিষ্ঠার জন্য স্বামী স্ত্রীর কেউই ভাবার অবকাশ পায় না। যে নির্বোধ  সে একই সাথে তিন তালাক দিয়ে এক আঘাতে সব সুযোগকেই নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

হিলা বিয়ে এবং পূনর্মিলন

এতসব বুঝার পর এটি পরিষ্কার যে ইসলাম তালাক চায় না। যত সমস্যাই হোক শরীয়তের উদ্দেশ্য হল একটি সংসার টিকে থাকুক, স্বামী স্ত্রীর দাম্পত্য সম্পর্ক স্থায়ী হোক। আর তালাক যদি দিতেই হয় তাহলে চিন্তা ভাবনা করে সকল চেষ্টা উদ্যোগ ব্যর্থ হবার পর চুড়ান্তভাবে স্ত্রীকে বিদায় করে দেওয়ার নিয়তেই দিক। যে পুরুষ স্ত্রীকে বিদায় করার ইচ্ছায় তালাক দিল, তাকে আবার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আরেকটি ছলচাতুরী ছাড়া আর কিছু না। যদি তাকে ঘরে নেওয়ার নিয়ৎই থাকতো তাহলে এসব সুযোগের যে কোন পর্যায়েই তা সম্ভব হতো। এজন্য আল্লাহ পাক তৃতীয় বার ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাকে কঠিন করেছেন।

অতঃপর স্বামী স্ত্রীকে যদি তৃতীয়বার তালাক দেয় তবে সে মেয়েলোকটি তার জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ না অন্য পুরুষের সাথে তার বিয়ে হবে এবং সে তাকে তালাক দিবে। আলেমগণ বলেন, সেই স্ত্রীলোকটি প্রথম স্বামীর কব্জামুক্ত হয়ে স্বাধীনা হিসাবে অন্য পুরুষের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে, পূর্ণ স্ত্রীর মর্যাদায় ঐ স্বামীর সঙ্গে বসবাস করবে এবং সে স্বামী যদি কোন সংগত কারণে জায়েজ পন্থায় তাকে তালাক দেয় অথবা মৃত্যুবরণ করে তাহলে মেয়েলোকটি যথাযথ ইদ্দত পালন করে আবার বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে প্রথম স্বামীর ঘরে যেতে পারবে। এ হচ্ছে তালাকের ব্যাপারে সীমালংঘনকারীর শাস্তি।

বর্তমানে আমাদের সমাজে দেখা যায় তালাক সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে জেদের বশবর্তী হয়ে মুর্খ লোকেরা একই সঙ্গে তিন তালাকের অধিকার প্রয়োগ করে, পরে অনুতাপ জাগে এবং খুচরা মৌলভীদের কাছে ধর্না দেয়, কিভাবে তার স্ত্রীকে আবার ফেরৎ পাবে তা বাৎলে দেবার জন্য। মৌলভীরা টাকার বদলায় ফতোয়া জারী করে বুদ্ধি আবিষ্কার করে যে তোমার বন্ধু বান্ধব অথবা আত্মীয় কোন পুরুষের সঙ্গে তোমার স্ত্রীর আকদ পড়িয়ে একরাতের জন্য থাকতে দাও। পরদিন সকালে ওর কাছ থেকে তালাক নিয়ে তুমি বিয়ে করে নিলেই তোমার স্ত্রী তোমার ঘরে উঠতে পারবে। এরূপ ক্ষণিকের বিয়েকে নাম দেয়া হয়েছে হিলা বিয়ে অর্থাৎ হালাল করার উদ্দেশ্যে বিয়ে।

বলাবাহুল্য এটি অত্যন্ত ভুল ফতোয়া এবং কুরআনের নির্দেশের পুরাপুরি খেলাপ। যেহেতু দ্বিতীয় বারে যে পুরুষটি বিয়ে করে সে জানে যে মেয়েলোকটি তার স্ত্রী নয় শুধু একরাতের সঙ্গী রাত পোহালেই সে পূর্বের স্বামীর ঘরে পৌছে যাবে অন্যদিকে স্ত্রীলোকটিও মনে করে যে এ বিয়ে ঘর সংসার বা দাম্পত্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নয়, মাত্র একরাত্রের জন্য সে এখানে এসেছে, রাত শেষেই সে আবার যথাস্থানে বহাল হবে। নির্বোধ শ্রেণীর স্বার্থবাজ আলেমরা এরূপ বিয়েকে জায়েজ ফতোয়া দিয়ে ইসলামী আইন ও হুকুমকে অপমানিত করছেন। কেননা আজ পর্যন্ত কোন মুহাক্কিক আলেম এরূপ ছলচাতুরীর বিয়েকে শুদ্ধ বলেননি।

চলবে…

লেখকঃ কলাম লেখক এবং সাবেক এডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি

…………………………………………………………………………………………………………………………

মহীয়সীর প্রিয় পাঠক ! সামাজিক পারিবারিক নানা বিষয়ে  লেখা আর্টিকেল ,আত্মউন্নয়নমূলক অসাধারণ  লেখা, গল্প  ও কবিতা  পড়তে মহীয়সীর ফেসবুক পেজ মহীয়সী / Mohioshi  তে লাইক দিয়ে মহীয়সীর সাথে সংযুক্ত থাকুন। আর হা মহীয়সীর সম্মানিত প্রিয় লেখক! আপনি আপনার পছন্দের লেখা পাঠাতে পারেন আমাদের ই-মেইলে-  [email protected]  ও  [email protected] ; মনে রাখবেন,”জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও উত্তম ।” মহীয়সীর লেখক ও পাঠকদের মেলবন্ধনের জন্য রয়েছে  আমাদের ফেসবুক গ্রুপ মহীয়সী লেখক ও পাঠক ফোরাম ; আজই আপনিও যুক্ত হয়ে যান এই গ্রুপে ।  আসুন  ইসলামী মূূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রজন্ম গঠনের মাধ্যমে সুস্থ,সুন্দর পরিবার ও সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখি । আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা সৎ কাজে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে চলো ।” (সূরা বাকারা-১৪৮) । আসুন আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে সমাজে অবদান রাখতে সচেষ্ট হই । আল্লাহ আমাদের সমস্ত নেক আমল কবুল করুন, আমিন ।

ফেসবুকে লেখক জামান শামস

আরও পড়ুন