ডিভোর্স

নুুুুরুন নাহার লিলিয়ানঃ

একজন উচ্চ শিক্ষিত নারী যখন তাঁর কাঙ্ক্ষিত ক্যারিয়ার ছেড়ে শুধু সংসারকে গুরুত্ব দেয় । মানে সমাজকে দেখাতে যে সে সংসার টিকিয়ে রাখতে সক্ষম ।নারী নামে একটা সংসার পায় ঠিকই কিন্তু ততোদিনে সে হারায় আত্মমর্যাদা , আত্মবিশ্বাস আর বুকে লালন করে রাখা স্বপ্ন ।

এখন সমাজে কম বেশি সব মেয়েই শিক্ষা ও চাকরি/ব্যবসা / উদ্যোক্তা /সৃষ্টিশীল কাজ কে গুরুত্ব দেয় । কিন্তু সব পূর্ণ হতে হতে বিয়ের বয়সটা ও থেমে থাকে না। ইচ্ছে করলেই নিজের যোগ্য মানুষটি পাওয়া যায়? বিয়ের প্রশ্নে তাই অনেক উচ্চ শিক্ষিত ডাক্তার , ইঞ্জিনিয়ার , শিক্ষক , শিল্পীসহ নানা পেশার নারীকে সবচেয়ে প্রিয় ক্যারিয়ারটাকে ছেড়ে দিয়ে স্বামী/ সংসারকে গুরুত্ব দিতে হয় ।

সমাজে কয়জন আছেন বিবাহিতা সিঙ্গেল কিংবা অবিবাহিতা কে মেনে নেয় সহজে । যখন বলবেন বিয়ে হয়নি বা করেননি কয়জন তা সহজে মেনে নিবে?

তাই হয়তো স্বামী কিংবা সংসারের অনেক অবিচার মেনে নিয়ে ও মুখ বুজে সংসারটা চালিয়ে নেয় ।কিন্তু এতো কিছু ত্যাগ স্বীকার করার পর ও সেই সংসারে যদি নারীটি নিগৃহীত, নিপীড়িত ও অবহেলিত হয় কিংবা জীবন হুমকির মুখে পড়ে তাহলে সংসার নামক মৃত্যুকুপ থেকে বের হয়ে আসাই উচিত ।

চারপাশে উচ্চ শিক্ষা কিংবা উচ্চ অবস্থান দিয়ে আমরা এটা বিচার করতে পারিনা যে সেই লোক ঘরে তাঁর স্ত্রীর সাথে সঠিক বিচার করছে । ঘরে উচ্চ শিক্ষিত সুন্দরি বউ থাকা সত্ত্বেও দেখা যাবে বন্ধুর স্ত্রী , মেয়ে সহকর্মী , সমাজের অন্য কোন নারীর প্রতি তাদের আলাদা আকর্ষণ কাজ করে । হয়তো সেসব নারীগন তাঁর ঘরে থাকা স্ত্রীর যোগ্যতা বা সৌন্দর্যের ধারে কাছে ও নেই ।আবার পুরুষের ক্ষেত্রে ও একই অভিজ্ঞতা হতে পারে ।

বিয়ের আগে বাঙালি পুরুষগনের চেহারা আর বিয়ের পরের চেহারা অনেক আলাদা । পুরুষগণের বহুরূপী আচরন যারা দেখে তারাই কেবল অনুধাবন করতে পারে । তদ্রুপ নারীদের ও একই ঘটনা হতে পারে। মানুষ মাত্রই পরিবর্তনশীল ।

ঘরে থাকা বউটা যাতে তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে না পারে সেজন্য সেই জন্য তৈরি করে নানা রকম বিধিনিষেধ । নিজের মেয়ে চাকরি করলে সমস্যা নেই , নিজের মেয়ে রাত করে ফিরলে সমস্যা নেই । কিন্তু ছেলের বউ চাকরি করলে , কাজের কারনে রাত হলেই বউটির নামে কুৎসা কিংবা মধ্যযুগীয় কায়দায় অত্যাচার করতে দ্বিধা করেনা ।

ইদানিং পরিচিত অনেকের ডিভোর্সের খবর শুনলাম । প্রতিটি ডিভোর্স কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন উপাখ্যান । বেশির ভাগ উচ্চ শিক্ষিত ও উচ্চ অবস্থানে থাকা ব্যক্তিবর্গ । অনেক আগে হয়তো তাদের অনেককে সুখি কাপল জানতাম । কিন্তু ডিভোর্সের পর জানতে পারলাম । বছরের পর বছর শুধু মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ছিল শুধুই সমাজকে দেখাতে । আর দুই একটা আছে ক্যারিয়ারের কারনে মিউচুয়াল সেপারেসশন ।কারন নারীরা একটি চাকরির উপর যতোটুকু আস্থা রাখতে পারে তাদের স্বামীদের উপর ঠিক ততোটা আস্থা রাখতে পারেনা ।

সমস্যা কি এখানেই শেষ । ডিভোর্স হওয়া একজন নারী কিংবা পুরুষের মানসিক অবস্থার উপর যে চাপ যায় তার শতভাগ আর ও বাড়িয়ে দেয় আশে পাশের সমাজের আপন মানুষরা ব্যাক বাইটিং করে । কার ও হয়তো মিউচুয়ালি সেপারেশন হয়েছে । সামাজিক অনুষ্ঠান বা পার্টিতে দেখা যাবে তাদের সম্পর্কে কিছু না জেনেই এমন সব নারী কিংবা পুরুষ তা নিয়ে আলোচনা করছে ।যে বিয়ে নামক সম্পর্কে থেকে ও অনেক নোংরামি তারা নিজেরাই করে যাচ্ছে । আমরা নিজেদের দেখি না । অন্যদের দেখে আমাদের সময় কাটে ।

দিন শেষে আজ হয়তো আপনার বন্ধু, সহকর্মী কিংবা পরিচিত কার ও ডিভোর্স হয়েছে । সামাজিক আসর গুলোতে খুব রসিয়ে রসিয়ে বলছেন , আরে ওই লোকটা ভাল না ! ভাল হলে কি বউ যায় ? অন্যদিকে আরে ওই মহিলার ও সমস্যা আছে । দেখেন গিয়ে কার সাথে কি করছে ? আজকে আপনি অন্যকে নিয়ে বলছেন । কাল হয়তো আপনার স্ত্রী / স্বামী ও আপনাকে ছেড়ে যেতে পারে ।

আজকে অন্যদের বিনাদোষে দোষী করে মুখরোচক গল্প করছেন । কাল আপনি ও মুখরোচক গল্পের বিষয় হয়ে যেতে পারেন ।

তাই জীবন কে সহজ করে দেখুন । মানুষ মাত্রই লোভী এবং হিংসুট ।

আর দাম্পত্যেই কেবল তা আর ও গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ হয় । দাম্পত্য এমন এক সম্পর্ক যেখানে না আসলেই লুকানোর কিছু থাকেনা ।

খুব দুঃখ লাগে উচ্চ শিক্ষিত আর উচ্চ অবস্থানে থাকা মানুষ গুলোর নীতিহীন কার্যক্রম দেখে ।

এখন বিয়ে মানে কোন কোন সময় মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রথম ধাপ ও । তাই অনেকে বিয়ে করতে ও ভয় পায় । এসব বিষয় রুখতে কেউ যদি ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেয় তাকে নিয়ে সমালোচনা নয় । তাকে অভিবাদন করুন ।তিনি নিজের জীবনকে ভালবেসেছেন । ডিভোর্স শব্দটাকে মেনে নিন সহজে । ডিভোর্সি হলেই কেউ খারাপ হয়ে যায় না। ডিভোর্স না দিয়ে ও এই বহুরূপী সমাজে অনেক নারী / পুরুষ বহু রকমের কুকর্মে লিপ্ত ।

সমস্যা কি জানেন সেগুলো অনেকে জানতে পারেনা । আর ডিভোর্স হলে সেটা জানাজানি হয় ।

একজন ডিভোর্সি নারী / পুরুষকে সহজ ভাবে মেনে নিন। একজন মানবিক মানুষ হিসেবে তার ব্যক্তিজীবনে ঘটে যাওয়া সত্যকে সহজ করে দিন।

আবার কোন অবিবাহিতা নারী / পুরুষ যদি কোন বিবাহিত / বিবাহিতা নারী / পুরুষকে বিয়ে করে তাদের ও সম্মান করতে শিখুন । আপনি হয়তো উচ্চ শিক্ষা নিয়ে ও জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য অনুধাবন করতে পারেননি । অনেক যোগ্যতা অর্জন করার পর ও মনের জগত শূন্য । তাই হয়তো অন্য দুজন মানুষের মনের সৌন্দর্য অনুধাবন করতে পারছেন না । কারন হয়তো আপনার শিক্ষা আপনাকে আলোকিত করতে পারেনি ।

অনেক বিচিত্র সব মানবিক কারনে একজন অবিবাহিত/ অবিবাহিতা নারী পুরুষ একজন বিবাহিতা / বিবাহিত নারী পুরুষকে বিয়ে করতে পারে । অথচ সব সময় সব জায়াগায় সমাজ সেই সুন্দর জায়াগায় বৈষয়িক দৃষ্টিতে বৈষয়িক ভাবে বিচার করে বৈষয়িক খোঁচা বা অসম্মান করে ।

এক ভাবি/ আপুর বোনের পঁয়ত্রিশের উপর বয়স । বিয়ে হচ্ছিল না । অনেক অনেক দিন ধরে পাত্র খুজতেছিল । কোনভাবেই মিলে না। এক সময় বেশ ধনী , শিক্ষিত পরিবার কিন্তু লোকটা শর্ট ডিভোর্সি । সেই লোকের ডিভোর্সের কারন ছিল বউ অন্য এক ছেলেকে বিয়ের আগেই ভালবাসত । তাহলে এই ডিভোর্সে লোকটার কি অপরাধ ? তাই আপু পজিটিভ ভাবে বিষয়টা নিয়ে তার বোনকে রাজি হতে বলল ।যাইহোক পরবর্তীতে সেই বিয়েটা হয়নি ।

আবার পরিচিত এক মিডিয়ার ভাইয়া কোন এক পরিচিত ডাক্তার কাপল কে নিয়ে নির্মম মজা করছিল । সেই ডাক্তার কাপল কে আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনি । ডাক্তার ভাইয়ার আগের একটা শর্ট ডিভোর্স ছিল । কারন ছিল মেয়েটি কানাডায় চলে যাবে হঠাৎ ইমিগ্রান্ট হয়ে । পরে ডাক্তার ভাইয়া সেই ডাক্তার আপু যিনি তার ছাত্রীসম তাকে বিয়ে করে । ডাক্তার আপু ভাইয়ার অতীত জেনে ও ডাক্তার ভাইয়ার সুন্দর মানবিক গুণাবলি এবং সৃষ্টিশীলতা দেখে বিয়ে করেন । সবচেয়ে বড় ব্যাপার ডাক্তার আপু অত্যন্ত সাহসী এবং মেধাবি নারী। তারা বর্তমানে সুখি সুন্দর জীবন পার করছেন ।

যে মিডিয়ার ভাইয়া নির্মম মজা করছিলেন । তিনি নিজেই ঘরে আটপৌরে মধ্যবয়স্কা বউ রেখে সমাজের চোখ ফাকি দিয়ে বহু নারীতে আসক্ত । তাই অন্যের সুখ ও সুন্দর জীবন দেখে নির্মমতার পরিচয় দিলেন । তার মজাটা ছিল এমন দ্বিতীয় স্ত্রীদের স্বামীরা একটু বেশি ভালবাসে । অথচ ডাক্তার ভাইয়ার মুখে সব সময়ে শুনেছি এই ডাক্তার আপু তার জিবনে প্রথম ও অদ্বিতীয় প্রেম । আগের ঘটনাটা একটা দুর্ঘটনা । এক জীবনে প্রথম ও দ্বিতীয় বলে কি আদৌ কিছু আছে ।

আবার আমার এক পরিচিত বান্ধবির দুইবার বিয়ে হয় । তৃতীয় বিয়ে একজন উচ্চ শিক্ষিত বিদেশি ডিগ্রিধারী অবিবাহিত ভাইয়ার সাথে হয় । ওরা প্রবাসে এখন সুখেই আছে । এখন কথা হল । এই আমার বান্ধবির দুইবার বিয়ে হয়েছিল । তার কি কোন অপরাধ ছিল ডিভোর্সের পেছনে ? জি না । প্রথম ছেলেটি অর্থনৈতিক সমস্যা ও পারিবারিক সমস্যার কারনে মিউচুয়াল ডিভোর্স নেয় । দ্বিতীয় বিয়ে ও পারিবারিক ভাবে হয় । কিন্তু জানা যায় দুই সপ্তাহ পর স্বামীর অন্য ধর্মের এক নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক । যাইহোক সব চুকিয়ে চাকরিতে মনোযোগী হলে এক বিদেশী ডিগ্রি নিয়ে ফেরা অবিবাহিত সহকর্মী বিয়ের প্রস্তাব দেয় ।

সব মিলিয়ে একটি সুন্দর সম্পর্ক ও জীবন রচনা হয় ।

তাই বলে কি এখন সমাজ সন্দেহ করবে ওই ভাইয়ার ও কোন অতীত আছে ?

এই সমাজ আসলে তখনই অনুভব করে যখন সে নিজে ওই অবস্থায় পড়ে ।

দাম্পত্য গভীর ও সুন্দর এক অধ্যায় । কিন্তু দুজন মানুষের মধ্যে কাঁচের মতো স্বচ্ছ বিশ্বাস, বন্ধুত্ব ও ভালবাসা থাকতে হয় । তা না হলে ভেঙ্গে যাওয়া টুকরো কাচে ও রক্তগঙ্গা বয়ে যেতে পারে ।

আপনার অনেক আগেই বিয়ে হয়েছে, নিজের প্রেমিক/ প্রেমিকাকেই বিয়ে করেছেন ,আপনার সম্পর্ক বিশ বাইশ বছর অতিক্রম করেছে । নিজের সম্পর্ক ,সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে খুব বেশি অহংকারি হবেনা । সব তুচ্ছ হয়ে যেতে পারে যেকোন সময়ে।

জীবন গুলো নিরাপদ হোক , মানুষের ভাবনা গুলো সুন্দর হোক ।

লেখকঃ কথাসাহিত্যিক ও ফাউন্ডার লিলিয়ান লিটারেচার ক্যাফে।

আরও পড়ুন