আপসোস

কামরুন নাহার মিশু

আমার বরের কিনে দেওয়া কোনো জিনিসই আমার পছন্দ হয় না। সে যদি আমার জন্য সাগর সেচে মুক্তোও নিয়ে আসে। সাত সমুদ্র তেরো নদী সাঁতরে পাড়ি দিয়ে দূর্লভ কালো গোলাপও নিয়ে আসে, তারপরও নয়।

এটা কিন্তু এমনি এমনি নয়। আমার বিয়ের পুরো গুনেগুনে ৩৬৫ দিন পর আমার বৌভাতের অনুষ্ঠান হয়। পুরো এক বছর আমি শুধু শ্বশুর বাড়ি যাইনি। তবে বরের ফ্ল্যাটে গিয়েছি, ননশদের বাসায় গিয়েছি, বরের বন্ধুর বাসায় গিয়েছি। ও আমাদের বাসায় এসেছে। কত জায়গায় একসাথে ঘুরেছি। শপিং করেছি, খেয়েছি। ও আমার পায়ের সাইজ থেকে শুরু করে, ব্লাউজের মাপ পর্যন্ত জানত। স্বাভাবিক আমরা স্বামী-স্ত্রী বলে কথা।

অনুষ্ঠানের সময় একসাথে শপিং করার অফার করেছিল ওরা আমার পরিবার রাজি হয়নি। সবার একটা স্বক্রিয়তা আছে, বিয়ের শপিংটা নিজের মতোই করা উচিত। আম্মার ধারণা আর কি!
আমরাও আম্মার মতামতকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কেউ আর শপিংয়ে যাইনি। মুরুব্বীরা নিজের মতো করে সব কেনাকাটা করল।

বিয়েরদিন পার্লারে যখন আমার ছোট ননশ লাগেজ থেকে জুতা বের করল, ব্লাউজ বের করল। আমি তো থ মেরে বসে রইলাম। সে জানে আমার জুতোর মাপ ৩৮। অথচ জুতা আনছে মনে হয় ৩০। যে জুতা দিয়ে আমার দুটো পায়ের আঙ্গুলও ডুকেনি। ব্লাউজের ভেতর পুরো আমার মতো ১০টা ডুকতে পাবরে।
অগত্যা কোনো উপায় না দেখে আমি পুরনো ব্লাউজ আর পুরনো জুতো পরেই শ্বশুর বাড়ি এসেছি। অথচ ১০০ বার কল করে বলা হয়েছে পায়ের মাপ।
যাই হোক ভুল হতেই পারে। ব্যপারটা সবাই স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে।

এবার রক্ষনশীল শ্বশুর পরিবার। বউরা সচরাচর মার্কেটে গিয়ে কিছু কিনে না। প্রয়োজনীয় সব কিছু বর’ই নিয়ে আসে।
বেশ ভালো সব জা’দের মতো আমিও মেনে নিয়েছি ব্যপারটা। কিছু করার নেই।

একবার ঘরে পরার জন্য ড্রেস লাগবে। ড্রেসের ধরণ, মাপ, সব বলে দেয়ার পর। অনলাইনে অর্ডার করে ১০ সেট কিনাইছে।
মাশাল্লাহ আমি ২ সেট মাস খানেক করে পরে এ দুই সেট সহ বাকি আরও ৬ সেট কাজের লোকদের দিয়ে দিয়েছি। আরও ২ সেট এখনো আলমারিতে এক কোণে পড়ে আছে। একটাও পরার মতো না। আমি কী ধরণের ড্রেস পরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি সেটা ওর জানার কথা। অথচ…
ড্রেসগুলো ভালো। শুধু আমিই খুঁতখুতে স্বভাবের। যাই হোক মুখ ফুটে একটা কথাও বলিনি।

আমি খুব একটা সাজগোজ করি না। কিন্তু মেয়ে আমার খুব সাজুনী হয়েছে। সারাক্ষণ ড্রেসিংটেবিলের সামনে মেকাপবক্স নিয়ে বসে থাকে। সবচেয়ে পছন্দের আইটেম তার লিপিস্টিক। চোখে, নখে ঠোঁটে সারাক্ষণ লিপিষ্টিক ঘষে। মেয়ের বাবার কাছে একদিন বিষয়টা শেয়ার করলাম। এবার সে ঢাকা গিয়ে যমুনা ফিউচার পার্ক থেকে ৯০০ টাকা করে ১০ টা লিপিস্টিক নিয়ে আসলো।
বাড়ি এসে আমাকে ভাউচার দেখায় লিপিস্টিকেই এনেছে ১০ হাজার টাকার।
মাশাল্লাহ্ মেয়ে মাস তিনেক গায়ে, ওয়ালে লেপ্টে সব শেষ করে ফেলেছে।
আমি এরপর থেকে ইচ্ছে করই খুব একটা প্রয়োজন না হলে কোন কিছুর কথা বলতাম না।
একবার ঘরে পরার সেন্ডেল লাগবে । বলার পর মার্কেটে গিয়ে খুশি হয়ে এবার আমার জন্য বিয়ের সোনালি রংয়ের পুথিসহ পেন্সিল হিলের জুতা নিয়ে এসেছে দুই জোড়া।

অনেক অধৈর্য হয়ে এবার আমি মুখ খুলেছি।
এসব কী! এ জুতা পরে কি আমি রান্না ঘরে রান্না করতে যাব। মেয়েকে নিয়ে হাঁটতে যাব?
তার উত্তর কেন বেশি ভালো হয়নি। দীপক মামাসহ কিনেছি দুই জোড়া ছত্রিশ টাকা নিয়েছে। একজোড়া মামির জন্য আরেক জোড়া তোমার জন্য।
আমার এত পছন্দ হয়েছে। মামাকে না দিয়ে দুই জোড়াই তোমার জন্য নিয়ে এসেছি।
এরকম বহু কাহিনী আছে।
এবার একটা মোবাইল লাগবে। তাকে বলায় সে আমার জন্য নোকিয়া বাটন মোবাইল একটা নিয়ে এসেছে, যেটা আমি বছর খানেক ব্যবহারও করেছি।
এরপর থেকে আতংকে আমি আর তাকে কোনো জিনিসের কথা বলি না।
ঐ যে বাটন মোবাইলে আর চলে না। বাসায় ওয়াইফাই আছে। ঘরের সবার ফেসবুক আইডি আছে। কেউ কারো সাথে কথা বলে না। কাজ কর্ম দ্রুত সেরে সবাই মোবাইল নিয়ে বসে পড়ে। একা একা হাসে, কাঁদে। আরও কতকি।
বাটন মোবাইলের দিকে তাকিয়ে আমি কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলি।
অবশেষ সব ভয় দূর করে তাকে একটা মোবইলের নাম মডেল সব লিখে কিনতে পাঠালাম। সাথে টাকাও দিয়ে দিয়েছি। সে যেদিন মোবাইল এনেছে সেদিন থেকে বাড়ির ওয়াইফাই ডিস্টার্ব করা শুরু হয়েছে। আমি তো ভেবেছি তার কেনা মোবাইল নষ্ট না হয়ে আর পারে না। নেটওয়ার্ক না পেয়ে জিদ করে মেরেছি এক আচাড়। এর পর থেকে আমি মোবাইল ছাড়া আছি। পরে জানতে পেরেছি সবার মোবাইলে একই অবস্থা ছিল। ওয়াইফাই কানেকশানে সমস্যা।

এক সপ্তাহ মোবাইল ছাড়া ছিলাম। আম্মা কল দিতে দিতে বিরক্ত হয় । এবার বরের মোবাইলে কল দিয়ে মোবাইল বন্ধের কারণ জানতে চাইল।

এই প্রথম বিয়ের আট বছর পর আম্মাকে সব খুলে বললাম।

আম্মা উল্টো আমার উপর রাগ।
স্বামীর সাথে কখনো এরকম করা ঠিক নয়। সে যেটাই আনে সব হাসি মুখে, খুশি মনে মেনে নিতে হয়। না হলে গুনাহ হবে। এই টাইপের বহু মাসলা মাসায়েল ঝাড়লেন।
আমিও উপায় না দেখে চুপ করে রইলাম।

এখন আমার প্রশ্ন হলো এই পরিস্থিতে কি আমার সত্যি গুনাহ হবে। সে টেনশানে ঘুমাতে পারছি না।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

 

আরও পড়ুন