আমি স্বার্থপর দেশপ্রেমিক

মনসুর আলম

আমি থাকি সাউথ আফ্রিকা। অন্য কেউ হয়তো থাকেন অন্য কোনো দেশে। আমরা যে, যেখানেই থাকিনা কেন সেই দেশটি আমাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে। তার আলো বাতাসে ভাগ বসানোর অধিকার দিয়েছে। মৃত্যুর পরে বুকে টেনে নেবার জন্য কবরের ব্যবস্থাও করে রেখেছে। অথচ আমার কাছে এটি কেবলই একটি প্লাটফর্ম! আমি কি স্বার্থপর নই?

মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার সন্তান হলো, সেই সন্তান জন্ম দেবার জন্য আমার স্ত্রীর প্রেগন্যান্সির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবধরনের সেবা যত্ন করলো এদেশের ডাক্তার, নার্স, হাসপাতালের সহযোগী কর্মীরা। বাচ্চার জন্মের পরে হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানাতে আসলো প্রতিবেশীরা। এখানে বসবাসরত বন্ধু বান্ধবরা দেখতে আসলো বিভিন্নধরনের উপহার সামগ্রী নিয়ে।

অথচ আমি সেই বাচ্চার আকিকা করার জন্য টাকা পাঠিয়ে দিলাম দেশে। স্থানীয় মানুষজন জানতেই পারলো না আকিকা কী? আমার ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক রীতিনীতির সাথে এদের পরিচয় করিয়ে দেবার সুযোগ থাকলেও আমি স্বার্থপরের মতো এদেরকে উপেক্ষা করলাম। মনে মনে বগল বাজালাম আমি দেশপ্রেমিক।

চাকরি কিংবা ব্যবসা যে, যা’ই করিনা কেনো আমার জীবিকা নির্বাহ হয় এদেশের মানুষের সহযোগিতায়। এই সমাজের আলো বাতাসে থেকে, তাদের প্রত্যক্ষ/ পরোক্ষ সহযোগিতার মাধ্যমে আমার পুরো পরিবারের ভরণপোষণের জন্য অর্থ রোজগার করি। গাড়ি চালিয়ে রাস্তা ধ্বংস করি এখানে, বাড়ি বানিয়ে সুখে থাকি এখানে। বাচ্চা স্কুলে যায় এখানে, হাসপাতালে চিকিৎসা নেয় এখানে।

এই সমাজের রিসোর্স ব্যবহার করে আমি জীবন ধারণ করি আগাগোড়া। অথচ রোজার মাস আসলেই ফিতরার টাকা, যাকাতের টাকা সব পুঁটলি বেঁধে পাঠিয়ে দিলাম দেশে। মসজিদের দরজায় একজন দাঁড়িয়ে গেলেন ফিতরার টাকা তোলার জন্য, সেই টাকা দেশে পাঠানো হবে। এখানেও দরিদ্র মানুষ আছে। অভাবের পরাকাষ্ঠায় জর্জরিত একেবারে বিধ্বস্ত পরিবার আছে, এতিম আছে। একেবারেই অসহায় মানুষজন আছে। এদের প্রতি সামাজিক দায়িত্ব পালনের বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে আমি দেশপ্রেমিক সাজার বিফল চেষ্টায় লিপ্ত থাকি সারাক্ষণ – এটি আসলে আমার স্বার্থপরতার নিম্নতম স্তর।

নিজে খেয়ে না খেয়ে আমরা দেশে কুরবানীর জন্য টাকা পাঠাই। অবশ্য কেউ কেউ এখানেও কুরবানী দিয়ে থাকেন যার যার অর্থনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী।

তো, কুরবানী দিয়ে মাংসের পুরো অংশটি ফ্রিজে রেখে দিলাম। আমার দরিদ্র প্রতিবেশী জানতেই পারলো না “কুরবানী” কী? আমরা কুরবানী কেন দেই? এর মূল প্রতিপাদ্য কী? স্থানীয় দরিদ্র জনগণকে আমার ধর্মের সৌন্দর্য্য দেখাবার সুযোগ থাকলেও আমি সে সুযোগ ব্যবহার করলাম না। পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারতাম।

যে দেশটি আমাকে আশ্রয় দিলো, তার সমস্ত রিসোর্স ব্যবহার করে জীবিকা নির্বাহ করার সুযোগ করে দিলো সেই আশ্রয় দাতা দেশটির সমাজের প্রতি বিন্দুমাত্র দায়িত্ব পালন না করেই আমি দেশ প্রেমিক! তারচেয়ে বরং স্বার্থপরের তকমাটাই আমাকে বেশি মানায়।

লেখকঃ সাউথ আফ্রিকা প্রবাসী লেখক

আরও পড়ুন