ভদ্রজ্ঞান

মো: ইব্রাহীম খলিলঃ
———————————-
খুব সহজ একটা সমীকরণ। তবে, উত্তর দিতে গেলে একটু ভেবে চিন্তেই দিতে হবে। কারণ, ভদ্রতা এবং অভদ্রতার মধ্যে ভিন্নমুখিতা খুঁজে বের করাটা, নিজের পক্ষে বোধগম্য নাও হতে পারে। তাই, মাঝে মধ্যে, নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি, ‘আমি কি প্রতিনিয়ত ভদ্রতা বজায় রাখছি?’ বা, সবাই কি সবার সাথে ভদ্রতা বজায় রাখছে? প্রতিউত্তরে আমি কিছুই পায়নি। হয়তো পাবোওনা। এটি নিয়ে আমার বেশ আক্ষেপ রয়েছে। আর, আক্ষেপ থাকার কারণও আছে বটে। কারণগুলো নিয়ে বিষদ আলোচনা করার চেষ্টা করছি।

যদিও ভদ্রতা শিষ্টাচারের (Etiquette) একটি বৃহৎ অংশ, তবুও, এর সারমর্মটা হয়তো অনেকের কাছেই অজানা। ছোট বেলার বেশ কিছু বিষয় এখানে আলোকপাত করতে চাইবো। ছোট বেলায়, স্কুলে দুষ্টুমি করলে শিক্ষক শিক্ষিকারা শাসন করতো। ঘরে দুষ্টুমি করলে মা-বাবা শাসন করতো। আর, সেই দুষ্টুমির পুরস্কারস্বরূপ শিক্ষক-শিক্ষিকা, কিংবা মা-বাবার কাছ থেকে কয়েকটা গালিগালাজ শুনতে হতো। শব্দগুলো হয়তো এমনি হবে, দুষ্টু, অসভ্য কিংবা অভদ্র। তবে, শাসনের দিক থেকে সবার উপরে রাখতে হবে পিতামাতাকে। আদব কায়দা, শিষ্টাচার, আচার-আচরণ, ভদ্র আচরণ, শ্লীলতা, শালীনতা, নৈতিক আচরণের মত বিষয়গুলো ছোট বেলা থেকেই, প্রারম্বে পরিবার থেকে, এবং, পর্যায়ক্রমে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের আঁচল আঁকড়ে থাকার সময়ই শিখে নিতে হয়। সঙ্গত কারণেই শিখে নেওয়ার কথাটা তুলে ধরলাম। কারণ, দুর্ভাগ্যবশত, এইসব বিষয়গুলো শেখা হয়ে ওঠেনা অনেকেরই। এই বিষয়টিকে দুর্বলতা ভেবে এড়িয়ে চলেন অনেকেই। কিন্তু, পরিবার থেকে যদি এই বিষয়গুলো শিখে না নেওয়া যায়, তাহলে “অভদ্র” শব্দটা নিজের নামের সাথে জোড়ালোভাবে জড়িয়ে যাবে।

অসভ্যতার প্রকার হতে পারে ভিন্নরকম। স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকার কথা না শুনা, যাকে-তাকে তুই-তাই করে কথা বলা, বড়-ছোট চিনতে না পারা, রুঢ় আচরণ, এবং আগ্রাসী মনোভাব যা কলহ সৃষ্টির অন্যতম কারণ। আর, যদি কেউ উল্লেখিত বিষয়গুলোর মধ্য থেকে একটিমাত্র বিষয়টিকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নেই, তাহলে সে ব্যাক্তি ক্ষেত্রবিশেষে অসভ্য বলে অবহিত হবেন এটা নিশ্চিত। অসভ্যতা, একজন মানুষকে শুধুমাত্র সবার কাছে ছোট করার জন্যেই যথেষ্ট।
হুট করেই একজনকে অপমানিত কিংবা কারো দুর্বলতা নিয়ে মজা করাটাও কিন্তু অসভ্যতার মধ্যে পড়ে। এতে করে সাময়িক পুলকিত হতে পারলেও, পরবর্তীতে মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়েছে বলে ধারণা করা হবে। কথাটা শুনতে খারাপ লাগতে পারে, তবুও বলছি। মানুষের আচরণগত দিকগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বংশেরই পরিচয় বহন করে। তাই, অসভ্যতাকে দুর্বলতা ভাবার কোন কারণ নেই। অন্ততপক্ষে, বংশের পরিচয় ঠিক রাখার জন্যে সভ্য আচরণ করা বাঞ্ছনীয়।

আমি যখন থেকেই ভদ্রতা এবং অভদ্রতা সম্পর্কে বুঝতে শিখেছি, অর্থাৎ, তৃতীয় শ্রেণির পড়াশুনার অধ্যায়টা শেষ করতে যাচ্ছি, ঠিক তখন থেকেই আমি আমার বাবার মুখ থেকে একটা প্রবাদবাক্য শুনতাম, ‘বৃক্ষ তোমার নাম কি, ফলে পরিচয়’। এর মর্মার্থ হচ্ছে, কার সাথে কেমন আচরণ করা হচ্ছে, অন্যের প্রতি মুখের ভাষার নিক্ষেপণ, বয়সের তারতম্য না বোঝা, এই সবকিছুই পরিচয় বহন করে বংশের। তাই, শুধুমাত্র ডিগ্রী অর্জন করলেই শিক্ষিত হওয়া যায়না, পাশাপাশি, স্যুট-কোট পরলেই ভদ্রতার পরিচয়টা নিজের নামের সাথে মানিয়ে নেওয়া যায়না। আমি ব্যাক্তিগতভাবে, স্যুট-কোট-কে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক পোশাক হিসেবেই বিবেচনা করবো। জীবন পথে চলতে গেলে সৌজন্যতা এবং ভদ্রতা বজায় রাখা জরুরী। এটা কোন পুঁথিগত বিদ্যার মাধ্যমে নয়, কিংবা, এজন্যে কিঞ্চিৎ পরিমাণ অর্থও খরচ করতে হবেনা, বরং, প্রয়োজন, পারিবারিক শিক্ষা।

অতএব, চলুন অন্ততপক্ষে আগামীর প্রজন্মকে সুন্দর করে সাজানোর জন্য হলেও, অভদ্রতাকে দুর্বলতা না ভেবে ভদ্রতা শিখি, এবং, একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করি।

লেখক: কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন