স্বকীয়তা ও আত্মপ্রত্যয়ের পথে আমার ও নাহিনের পথ চলা

সাবরিনা শারমিন বনি
তারিখটা ঠিক মনে নেই সকাল এগারোটা হবে হয়তবা।শিশু হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্রের কোরিডোরে আমরা পরিবারের পাঁচ সদস্য দাঁড়িয়ে। কখনো সবাই মিলে মেডিকেল টিমের মুখোমুখি হচ্ছি কখনো বা একেকজন সদস্য আলাদা আলাদাভাবে। আজ আমার নাহিনের পরিচয় নির্ধারন করা হবে সে সমাজে বিশেষ না সাধারন না অসাধারন।
অনেকটা সময় পার হয়ে গেল আর সেকেন্ডে আমার ড্রপবিট পড়ছে বেশ কয়েকটা করে যেটা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশী।শেষ হলো মেডিকেল বোর্ডের মিটিং সিটিং আলোচনা।
আমার নাহিনের পরিচয় আমাকে জানানো হলো ঃ””সে সমাজে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু “”””
তবে মাইল্ড।
শুরু হলো আমার পথচলা যেখানে ছিলো স্বকীয়তা ছিলো দৃঢ়প্রত্যয় কখনোবা রুঢ়তা। তবে সেই রুঢ়তা কিন্তু কারো প্রতি নয় সেটা আমার প্রতি। প্রতিক্ষনে ক্ষনে নিজেকে বলতাম “” তুমি কেন চলবে না? চলতে তোমাকে হবেই। তোমার ভয় কিসের তোমার আছে নাহিন।
কারন একদা একদিন ——
দিনটা ২৯ শে সেপ্টেম্বর। আলোঝলমলে সকাল। আমাকে নেয়া হলো অপারেশন থিয়েটারে। চারিদিক বন্ধ।মানুষগুলো রোবটের মতকাজ করে চলেছে।চারিদিকে নাইট্রাসের মিস্টি গন্ধ।আর আমার মনের মাঝে অব্যাক্ত একটা আনন্দ। কারন আমি সমাজে গন্ডির বাইরে আসতে পারি নি। নাহিন আমার তিন নং বাচ্চা।ওর আগে আমার ফুলের মত দুটি মেয়ে বাবু আছে। কিন্তু সমাজ আমাকে বলতে ছাড়ে নি। “” আহা তোমারাও দুই বোন আবার তোমারও দুই মেয়ে!!””
২য় মেয়েটি যেদিন হয় সেদিন ওটি থেকে যখন আমাকে বের করা হচ্ছে তখন আমি ও ওদের বাবা অনেক খুশি। কিন্তু কিছু মানুষ উপযাচক হয়ে এসে সান্তনা দিতে শুরু করলো “” আহা ২য়টাও মেয়ে দুঃখ করোনা”””,
আমাদের কনো দুঃখ নেই কিন্তু যেন সমাজের সব দুঃখ। আমার বড় মেয়ে “”সাদিয়া “” নিজেদেরকে সৌভাগ্যবান মনে করেছিলাম জন্য আমার বড় মেয়ের নাম রেখেছিলাম সাদিয়া। আর ২য় মেয়েকে জান্নাতের সুসংবাদের বাহন মনে করে তার নাম রেখেছিলাম “জান্নাতি ঝর্না ” তাসনীম।
সেযাই হোক অব্যক্ত আনন্দের কথাটা এবার বলি —-
আমার গর্ভে নাহিনের বয়স যখন ৭মাস তখন আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে দেখা গেল ও ছেলে। এ্যাটোমিক এনার্জি সেন্টারে আল্ট্রাসনো করছিলেন সনোলজিস্ট ডাঃ রোকেয়া আপা।সেই সময় নাহিনের বাবার পোস্টিং রাজশাহী মেডিকেল কলেজে এ্যানেস্থেসিয়া ডিপার্টমেন্টে এ্যানেস্থেটিস্ট হিসাবে। ডাঃ রোকেয়া আপার সাথে খুব ভালো সম্পর্ক। আপা আল্টর্সনোগ্রাফি করতে করতে চিৎকার দিয়ে উঠলেন “” জাহাংগীর ভাই ছেলে ছেলে”””।আপার সেই উৎফুল্ল চিত্তের চিৎকার আমার কানেও আটকে গেল। আমিও সেই উৎফুল্লতা মনের মুকুরে বহন করে বেড়ালাম।। ২৯শে সেপ্টেম্বর সকাল দশটায় নাহিনের পৃথিবীর আলোতে আসার মাধ্যমে আমার সেই আনন্দ ব্যক্ত হলো।নাহিনের কান্নার তীক্ষ্ন চিৎকার আমাকে প্রতিনিয়তই মনে করাতে লাগলো সমাজের সেই সংকীর্ণ গন্ডির প্রতিবন্ধী কন্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি। আবার এটাও মনে হলো বারবার সেই বিশেষঞ্জ চিকিৎসক আপা ও আমি যারা মুক্তবুদ্ধির মানুষ তারাওতো এই গন্ডির বাইরে আসতে পারলাম না।
দিনে দিনে নাহিন বড় হতে লাগলো। ওর শ্যামলা মিষ্টি গায়ের রং ডাগর ডাগর বুদ্ধিদীপ্ত চোখ আর মিষ্টি হাসি সবসময় তার প্রতি আমাকে মনোযোগী করে তুলতে লাগলো।ওরবোনরাও ওকে নিয়ে সবসময় খুশি। মহা আনন্দে আকিকা দিয়ে তার মরহুম দাদার রেখে যাওয়া নামটিকেই তারনাম হিসাবে select করা হলো “সাদেক জাফর ” আর তার দুই বোন নাম রাখলো নাহিন।
আমার শশুড় আব্বা আমার প্রথম ইস্যুর সময় থেকেই ছেলের নাম ঠিক করে রেখেছিলেন।
ছেলে হলে উনি নাম রাখবেন “সাদেক জাফর ”
প্রথমবার হলো না। দ্বিতীয়বার হলো না তৃতীয় বার তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দেয়া নামটি রাখার মত একজন সন্তান আমি প্রসব করলাম।
নাহিনের জীবনের তিনটি বছর কাটলো খুব সুন্দরভাবে। সবার কোলে কোলে সে বেড়ে উঠতে লাগলো।ঠিক সময়ে বসা শিখলো, ঠিক সময়ে হাঁটা শিখলো, ঠিক সময়েই কথা বলা শিখলো, আই কন্টাক্ট ও খুব স্বাভাবিক। দুই বছর বয়সেই বড় বোনদের কাছে শুনে শুনে ৩৩ চরনের কবিতা সে মুখস্ত করে ফেললো।কেউ যদি তাকে জিজ্ঞেস করতো বড় হয়ে বাবার মতো ডাক্তার হবা? ও তখন উত্তর দিতো “”” না আমি আপেস হবো”” অর্থাৎ সে কুরআনে হাফেজ হবে।সবাই বলতো “বনির ছেলেটা বনির মেয়েদের চেয়েও মেধাবী হবে’।এভাবেই নাহিনের তিনটা বছর পার হয়ে গেল।হঠাৎ সাড়ে তিন বছর বয়সে খুব চন্চল হয়ে উঠলো।ওয়ার্ড্রোবের মাথার উপর স্টিলের আলমারির মাথার উপর তার বিচরনের জায়গা হিসাবে সে select করলো। ঘরের জানালা দিয়ে হাসতে হাসতে সব জিনিস ফেলে দিত, ওর দাদি ঘুমিয়ে থাকলে ছোট কাঁচি নিয়ে গিয়ে ভ্রুর চুল কেটে দিত। এগুলো ছিলো তার নিত্যদিনের কাজ।আমরা সবাই ভাবলাম বেশী মেধাবীরা একটু এরকম হয়। ও অনেক মিলিয়ে মিলিয়ে কথা বলতে পারতো। ওর বাবা বাড়িতে আসলে বলতো আমাদের সুখের ঘরে সখের বাহার।
যাই হোক ওর চঞ্চলতার মাত্রা বেড়েই চললো। সবাই আমাকে পরামর্শ দিলো “”ওকে স্কুলে ভর্তি করে দাও ”
বিশেষ করে আমার মা ” নাহিনের নানী ” একজন আত্মপ্রত্যয়ী নারী যিনি ভুল চিকিৎসায় দুচোখ অন্ধ হয়ে যাবার পরও সাড়ে চার বছর রাজশাহী কলেজের দর্শন বিভাগের চেয়ারম্যান হিসাবে অত্যন্ত দক্ষতা ও নিয়মানুবর্তিতার সাথে তাঁর চাকুরী জীবন শেষ করেছিলেন। আমার সেই মমতাময়ী মা সবসময় নাহিনকে পরিচালনার ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন “” নাহিনকে স্কুলে ভর্তি করে দাও “।আমরা সেই পর্যন্ত নাহিনের কনো সমস্যা ধরতে পারি নাই। আমি তাকে ভর্তি করার জন্য নিয়ে গেলাম এক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে।সেখানে নাহিনকে একদিন observe করার পর সেই স্কুলের একজন রাশিয়ান মিস যিনি একজন MBBS doctor
আমাকে পরামর্শ দিলেন বা জানালেন ” তেমার বাচ্চাটা আর দশটা বাচ্চা থেকে আলাদা। ওকে আমরা আলাদা ক্লাশ রুমে রেখে one= one পদ্ধতিতে পড়াবো কিন্তু আমার পছন্দ হলোনা। আমার চিন্তা আমি ছেলেকে এনেছি সামাজিক করতে কেন উনারা আলাদা করবে। আমি তাকে নিয়ে আসলাম আর এক স্কুলে যেখানে আমার মেয়েরা পড়তো। সেখানে তো সে লংকা কান্ড বাধিয়ে বসলো। যখন তখন স্কুলে ঘন্টা বাজিয়ে দেয়। এ্যাসেম্বলী থেকে টিচারের দিকে দৌড় দেয়। স্যারের কোলে উঠে পড়ে। এরপর আমার একছোটবোন ডাঃ শাপলা আমাকে পরামর্শ দিলো “আপা নাহিনকে আপনি ঢাকা পেডিয়াট্রিক্স নিউরোলজিস্ট আনিসা জাহান ম্যাডামকে দেখান ” ডাঃ আনিসা জাহান ম্যাডামই ডায়াগনোসিস করলেন নাহিন স্পেশাল চাইল্ড। যে সাইকোলজিস্ট নাহিনের এসেসমেন্ট টিমে ছিলেন উনি আমাকে বললেন
“””” নাহিন আপনার নিয়ামত
দুনিয়াতে আপনার কোন কিছুর অভাব নাই
অতএব আল্লাহর কথা স্মরন করার জন্য নাহিনই
যথেষ্ট।”””নাহিনের মেডিসিন হলো শেষ রাতে আল্লাহর কাছে নাহিনের জন্য আপনার চোখের পানি।”” আসলে এই মেডিসিন এর মধ্যমেই নাহিনকে নিয়ে আমি অনেক পথ পাড়ি দিয়েছি। সেই থেকেই শুরু হলো নাহিনকে নিয়ে আমার পথ চলা। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা জীবন শুরুই হয়েছে আমার বড় বাচ্চাটির হাত ধরে।আমার অনার্স প্রথম বর্ষর পরীক্ষা দিয়েছি বড় বাবুকে ৭মাস বয়সের নিয়ে।অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার সময় আমার কোলে আমার দুই মেয়ে। মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছি নাহিনকে তিন মাসের নিয়ে। ওরা আমার এই দূর্গম পথ পাড়ি দেবার সবসময়ের সাথী। এই পথ চলার ক্ষেত্রে সবসময় সাহস যুগিয়েছেন তিনজন সাহসী মানুষ আমার মা বাবা আর আমার সুখে দঃখের সাথী ডাঃ জাহাংগীর। আর আমার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন আমার শাশুড়ী ও ননদ।ইনাদের সহযোগীতা না পেলে এই অমসৃন পথ চলার ক্ষেত্রে অনেক কিছুই হয়ত আমার বাধা হয়ে দাঁড়াতো।স্বভাবসুলভ আচরন থেকে আমি সবসময়ই কিছু সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলাম।মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েই আমি একটি কলেজে ইংরেজিতে অধ্যাপনার সুযোগ পাই। সমাজ কিন্তু আমার দিকে আংগুল তুলতে একদম পিছপা হয়নি।নাহিনকে যখনই বলা হলো সে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু তখনই সবাই আমার দিকে আংগুল উঠালো যে মায়ের ব্যাস্ততায় এর জন্য দায়ী। কিন্তু আমি আমার স্বকীয়তা ও আত্মপ্রত্যয়ের উপর ভর করে সৃষ্টিকর্তার সাহায্য চেযে এই দূর্গম পথ পাড়ি দিতে শুরু করলাম। আমিও মনকে বললাম —-
“”” তুমিতো সুন্দর স্বাভাবিক ও মেধাবী দুটি শিশুর মা, এবার একটু বিশেষ একটা শিশুর মা হও না। এটাকে enjoy করো উপভোগ করো। তুমি এমন এক শিশুর মা যে কখনো তোমাকে এবং সমাজকে প্রতারিত করবেনা, কখনো মিথ্যা বলবে না, কখনো সে ঘুষ সুদের কারবার করবে না।তুমিতো সৃষ্টি কর্তাকে যেয়ে বলতে পারবে আমি তোমার বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন আমানতের আমানতদারিতা করেছি। ”
প্রতিরাতে নাহিনকে ঘুম পাড়াতাম আর ঘুমিয়ে গেলে ওর সুন্দর মুখটার দিকে তাকিয়ে বলতাম আল্লাহ তুমি আমাকে এত সুন্দর একটা সন্তানদিয়েছ আর আমার আনন্দ অশ্রু দুই গাল বেয়ে পড়তো।
নাহিনকেভর্তি করলাম একটা কিন্ডার গার্টেন স্কুলে যেখানে সব স্বাভাবিক বাচ্চারাই পড়াশুনা করতো। শিশু বিকাশ কেন্দ্র থেকে বলা হয়েছিলো নাহিন ক্লাশ সেভেন অথবা এইট পর্যন্ত লিখাপড়া করতে পারবে তবে অনেক ধর্য্যের প্রয়োজন আমাদের দেশের মায়েরা এরকম ধৈর্য্য ধরতে পারে না। কিন্তু আমার প্রত্যয় ধৈর্য্য আমাকে ধরতেই হবে। আমি নাহিনের সাথে স্কুলে যেতাম ওর সাথে সীটে বসতাম কেজি নার্সারির বাচ্চাদের সাথে খেলতাম। টীফিনের সময় ওদের সাথে টিফিন খেতাম। সবসময় নাহিনের সাথে বাচ্চাদের gapটি আমি পুরনের চেষ্টা করতাম। এই স্কুল টি চালাতেন আমার মায়ের কিছু রিটায়ার্ড কলিগ বৃন্দ। উনারা আমাকে বিশেষভাবে সহযোগীতা করেছেন। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ কিন্তু নাহিনকে আমি সেখানে দেড় বছরের বেশী রাখতে পারলালম না। কারন তখনও আমাদের দেশে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর একিভূত শিক্ষার ধারনার স্বচ্ছ দিকনির্দেশনা আসেনি।বিশেষ শিশুদের শিক্ষক গনেরও তেমন কোন ট্রেনিং চালু হয় নি। এজন্য নাহিনকে এস্কুলে বেশীদিন রাখতে পারলাম না। এটার পর আমি রাজশাহীতে খুজতে লাগলাম বিশেষ শিশুদের শিক্ষালয়।একটি পেলাম কিন্তু তাদের রয়েছিলো অনেক সীমাবদ্ধতা। সেখানেও ছয়মাসের বেশী রাখতে পারলাম না। এরমাঝে নাহিনকে নিয়ে গেলাল ডাঃ লিডি হকের কাছে উনি অনেক পরামর্শ দিলেন তার মাঝে একটি দিলেন যে এ শিশুদের মায়ের গায়ের চামড়াকে গন্ডারের চামড়ার মত শক্ত করতে হবে। কারন আমার প্রতি সমাজের আংগুল তোলা কিন্তু বন্ধ হয়নি। সেখান থেকে ফিরে এসে আমরা কয়েকজন মা চেষ্টা করলাম এই শিশুদের জন্য স্কুলের মত কিছু একটা করা যায় কিনা। সমাজে শিক্ষিত এলিট গোষ্টিকে নিয়ে সেমিনার করলাম কিন্তু কথা শুধু স্টেজেই মাঠ ফাঁকা। আবারও বাড়ির পাশের একটা প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করে দিলাম নাহিনকে। স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাগন আমার ছোট ভাইবোনের মত, তাই তারা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী আমাকে সহযোগীতা করলো।নাহিন অক্ষর লিখা শিখলো শব্দ লিখা শিখলো। ওর মাঝে দেখলাম গান ও ড্রইং এর উপর ঝোক। আমি এদুটোকে base করে প্রতিদিন বুদ্ধি বের করি আর ওকে বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষন দিতে থাকি। এর মাঝে রাবির অধ্যাপক সামাদি স্যার ফোনে জানালেন তরী ফাউন্ডেশন রাজশাহীতে কিছু করতে চায়। এজন্য জুবেরী ভবনে একটি মতবিনিময় সভা হবে। আমি ও নাহিনের বাবা সেখানে উপস্থিত হলাম। তরী ফাউন্ডেশনের কাছে আমি কৃতজ্ঞ তাঁরা রাজশাহীতে স্কুল করে আমাদের মত বাবা মাদের জন্য একটি বিশাল দ্বার খুলে দিলো।তাদের তত্বাবধানে নাহিন অনেক দুর এগুলো।নাহিনকে নিয়ে তারা ATN বাংলায় একটা প্রেগ্রাম করলো। দৃকগ্যালারীতে আর্ট এক্সিবিশনে নাহিন অংশগ্রহণ করলো।চ্যানেল ওয়ানে নাহিনের একটি ছোট সাক্ষাতকার প্রচার হলো নাহিন আর্টে জাতীয়পুরস্কার পেলো সবই কিন্তু তরী ফাউন্ডেশনের কৃতীত্ব। নাহিন এদিকে ব্লক বাটিকের কিছু কাজ শিখতে লাগলো। এরমাঝে হঠাৎ একদিন রবিন ভাই নামে একজন ঢাকা থেকে আমাকে ফোন দিলেন। ফোনের ওপার থেকে বললেন “” আপনি বনি আপা? আপনি নাহিনের আম্মু? আমাদের অনেক কিছু করার আছে। “””এই অনেক কিছু করার আছে আমাকে পেয়ে বসলো। রবিন ভাই রাজশাহী আসলেন একটা মতবিনিময় সভা করলেন।অনেক কিছু করার একটা দিক নির্দেশনা দিলেন। তাঁর কাছেই প্রথম জানতে পারলাম মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের প্যারেন্টস ফোরামের কথা। রবিন ভাইয়ের দাওয়াতে ঢাকায় গেলাম একটি প্রোগ্রামে।যেখানে তৎকালীন জাতিসংঘের মহাসচিব বানকিমুনের স্ত্রী প্রধান অতিথি ছিলেন। সেখানেই পরিচয় হলো আশ্চর্য সম্মোহনী শক্তি মেধা ও অমায়িক ব্যাবহারের অধিকারী ড্যানি আপার সাথে। শুরু হলো রাজশাহীতে প্যারেনটস ফোরামের কাজ। এরই মাঝে ড্যানী আপার দিকনির্দেশনায় এবং ডাঃ জাহাংগীরের সার্বিক সহযোগীতায় রাজশাহীতে স্পীচ থেরাপি র উপর একটি সেমিনার করলাম যেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহীর স্বনামধন্য চিকিৎসক ডাঃ মামুন হুসাইন ভাই ও রাবির ডঃ সুফি স্যার।
নাহিন ইতিমধ্যে বয়োঃসন্ধিকালে পড়েছে। আমার মনে হলো বাচ্চারা যেমন প্রাইমারী শেষ করে হাই স্কুলে যায় সেরকম নাহিনেরও কিছু পরিবর্তন দরকার। পেয়েও গেলাম পরম স্নেহের ছোটবোন লিপির স্কুল প্রয়াস। যেখানে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন কিশোররাও পড়ে। আমি নাহিনকে সেখানে ভর্তি করে দিলাম। নাহিন সেখানে কিশোর বয়সের বন্ধু পেলো। স্যার বা ভাইয়া হিসাবে পেল মতিউর ও পাভেলকে। ছোটবোন লিপির তত্বাবধানে নাহিন অনেক স্টেজ পারফরমেন্স করতে লাগলো।নিয়মিত রেডিওতে গান গাওয়া শুরু করলো।নাহিন সমাপনী পাশ করলো। সব কৃতিত্বই ওয়াহিদা খানম লিপির
এমন সময় ATN NEWs এর সাথে connecting bangladesh নামে একটি প্রোগ্রামের সাথে কাজ করার ব্যাবস্থা করে দিলেন ড্যানী আপা। অল্প সময়ের জন্য কানেক্টিং বাংলাদেশের পুরো টিমের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম।এধরনের সকল কাজে সবসময় অন্তরালে থেকে সহযোগীতা করে গেছেন নাহিনের বাবা ডাঃ জাহাংগীর। আমি আমার দুই মেয়েকে সবসময় বলেছি “তোমরা আমাকে A+ রেজাল্ট দিতে পার কিন্তু নাহিন আমাকে যে যে জায়গায় পরিচিত করেছে তোমরা সেটা পারনি। তোমরা তোমাদের লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাও সব সহযোগীতা আমি দেব কিন্তু নাহিনের ভালোবাসা ও মূল্যায়নই হবে আমাকে পাবার মাধ্যম। ”
নাহিনের বয়োঃস্বন্ধি কাল এরমাঝে পার হয়ে গেছে। নাহিন তারুন্যের স্বাদ গ্রহন করতে শুরু করেছে। নাহিন বেকারীর উপর ট্রেনিং নিতেও শুরু করেছে। সবই চলছে স্বাভাবিক। আমি জীবনের অনেক চড়াই উৎরাই পার করছি। আর নাহিনকে নিয়ে স্বপ্ন বুনে চলেছি।। ইতিমধ্যে আমার দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছি একজন রাজশাহী ইউনিভার্সিটির সাইকোলজি ডিপার্টমেন্ট থেকে গ্রাজুয়েশন ও মাস্টার্স শেষ করেছে আর একজন রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তার হেয়েছে। জামাই একজন সফ্টওয়ার ইন্জিনিয়ার আর একজন ডাক্তার

ওদের দুজনেরই বাবু হয়েছে। আমি নাহিনকে ওদের সংসার জীবন বার বার দেখাতাম আর প্রশ্ন করতাম বিয়ে কি? সংসার কি? সন্তান কি? বউ কি?

আসলে real life এর অনেক ঘটনা যেমন বিয়ে মৃত্যু জন্ম সংসার অনুস্ঠান ভ্রমন সভা সমাবেশ সবকিছুর সাথে ওদের পরিচয় ঘটানো দরকার। আমি প্রতিনয়তই সেই কাজগুলি করতাম। যে মুহূর্তে দেখেছি নাহিন লজ্জা রাগ খুনসুটি বুঝে না তখন আমি তার সাথে সেই অবস্থার অভিনয় করে করে তাকে সেই অবস্থা গুলি সম্পর্কে পরিস্কার ধারনা দেবার চেষ্টা করেছি।
নাহিন যখন ২৩ বছর তখন আমি একটা চ্যালেন্জিং সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম নাহিনকে বিয়ে দেব। হয়তবা সবাই আমাকে মনে করেছিলো “বনির এটা পাগলামি ” যাইহোক শুরু হলো আামর আর এক মিশন। বিহেভিয়ার থেরাপিস্টের সাথে আলোচনা করলাম ফিজিশিয়ানের সাথে আলোচনা করলাম।প্রয়াশের ছোটবোন লিপির পরামর্শ নিলাম। শুরু হলো আমার আরএক অধ্যায়ের সংগ্রাম।সবসময়ই সবক্ষেত্রেই আমার পাশে থেকেছে আমার বাবা ও নাহিনের বাবা।
এইক্ষেত্রে যে ব্যাক্তিটি সর্বাধিক সহযোগীতা করেছে সে আমার ছোটবোন জেনি। তারই পরামর্শে আগ্রহে দিকনির্দেশনায় আমিএগিয়েছি।

নাহিনের সাথে জীবনকে জুড়ে দেবার জন্য এগিয়ে এসেছে এক god gifted নারী। যে একজন স্কুল শিক্ষিকা, রাজনীতি বিজ্ঞানে এম এস এস ডিগ্রীধারী।যখন সে স্ব ইচ্ছায় এগিয়ে এসেছে তখন আমি তার সাথে বার বার কথা বলেছি, আমার অভিজ্ঞ বাবা তার সাথে কথা বলেছেন। আমার আবেগী বোন তার সাথে কথা বলেছে। কিন্তু সেই god gifted নারীর একটায় কথা ” আমি পারব ইশাআাল্লাহ ” আমি তাকে নাহিনের সকল লাইফ স্টাইল দেখিয়েছি। তিন মাস চিন্তা করতে বলেছি। কিন্তু সেই আল্লাহ প্রদত্ত নারীর একটায় কথা “আমি পারব ইনশাআল্লাহ ”
একদিন আমার রাজপুত্র নাহিন রানীর বেশে ঘরে তুলে আনলো আমার সেই রাজকন্যাকে।সে আমার আসলেই রাজ কন্যা।প্রায় দুই বছর হতে চলেছে তাদের সংসার জীবন। আমার নাহিন আজ বউ এর সাথে গল্প করে বেড়াতে যায় হুকুম করে খুনসুটি করে। তার বউকে গান শুনাই ফাজলামুও করে।
আমার নাহিন বাবা হতে চলেছে। এখানেই আমার গল্পের শেষ নই তবে পরে।
প্রত্যেকের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী আমি কিন্তু এখানে কিছু জাহির করার জন্য আমার জীবনের গল্পটি শুনাইনি
শুধু এজন্য যে এই god gifted শিশুগুলির জন্য আল্লাহ অনেক কিছু করার সুযোগ রেখেছেন শুধু দরকার সদিচ্ছা ও ধৈর্য্যের
আসুন আমরা তাদের সম্পদ বানাই

লেখকঃ সাহিত্যিক ও বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ, ইসলামিয়া কলেজ, রাজশাহী

 

আরও পড়ুন