পুনর্জন্ম

অঞ্জনা দত্ত

আজ অনেকদিন পর জয়া বাসা থেকে বের হলো। গেইট খুলে রাস্তায় পা রাখতেই কেমন যেন এক অনুভূতি হল মনে। চারদিকে বাড়িঘর নতুন লাগছিল। গাছপালাগুলো সতেজ৷ বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল জয়া। ওর মনে হলো এতদিন ঘরবন্দী আর হাসপাতালে থেকে থেকে ওর ফুসফুস ঠিকমত অক্সিজেন পাচ্ছিল না। উফ্! যেন এক মৃত্যুপুরীতে ছিল গেল একমাস ধরে৷ মৃত্যুপুরীই তো। কী যে বয়ে গেল এই দেশ জুড়ে! শুধু দেশ জুড়ে কেন? সারা পৃথিবীকে ঝাঁকুনি দিয়ে গেল চোখে দেখা যায় না এমন এক অনুজীব। মড়ক লেগেছিল সারা বিশ্বজুড়ে৷ উন্নত বিশ্বে, যেসব দেশে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা কিংবদন্তীতুল্য, তারাও হিমশিম খেল এই রোগটির সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে৷ সহস্রাধিক মানুষ মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ল। ওইসব দেশের অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাও পারল না জীবনের অপর দিক মরণকে ঠেকাতে। সবাই হতভম্ব হয়ে পড়ল। বিজ্ঞানীরা দিনরাত পড়ে রইল গবেষণাগারে৷ কিন্তু কিছুই করে উঠতে পারছিল না৷ আর তাছাড়া এটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার৷ কাজেই প্রতিষেধক বার করো, বার করো বললেই তো আলাদীনের প্রদীপের মত কিছু দিয়ে ওটা জনসমুখে আনা যাবে না! এরজন্য চাই অন্তত দুই বৎসরের মত সময়। ততদিন পর্যন্ত মানুষ মরে যেতেই থাকবে? এ কেমন কথা? প্রকৃতির কাছে মানুষ এত অসহায়? প্রকৃতি কী তাহলে এতদিন পর তার ওপর অত্যাচার অনাচারের প্রতিশোধ নিচ্ছে? দিনের পর দিন পাহাড় কেটে , গাছ কেটে, পুকুর ভরাট করে জমি বানিয়ে তার ওপর সুদৃশ্য অট্টালিকা নির্মাণ করা, বিশ্বের একক বৃহৎ শক্তি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মাঝে মাঝেই কাঁপিয়ে তুলে বিশ্বের কোন কোন দেশকে অস্ত্রের ঝনঝনাতিতে৷ বর্ষণ করে ক্যামিক্যাল বোমা৷ যার থেকে রক্ষা পায় না হাসপাতাল, জনবসতিপূর্ণ এলাকা৷ ট্যাংকের নিচে দুমড়ে মুচড়ে পড়ে বড় বড় অট্টালিকা। জনশূন্য হয়ে পড়ে নগর, বন্দর৷ নিজভূম ছেড়ে প্রাণ বাঁচাতে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশে৷ করে মানবেতর জীবনযাপন। অথচ এত বড় বিশ্বে নেই কোন দেশ যে কি না ঐ প্রবল শক্তিধর দেশকে বারণ করবে তার খামখেয়ালিপনা থেকে বের হয়ে আসতে। আর যেসব দেশ অত্যাচারিত হয় নেই তাদের মধ্যে কোনরকমের একতা। আর সে সুযোগে ক্ষমতালোভীরা থাবার নিচ থেকে নখর বের করেই চলেছে। আজ কী প্রকৃতি সে কারণেই অশান্ত হয়ে উঠেছে? গণহারে সব দেশকে, সেইসব দেশের জনগণকে এক কাতারে নামিয়ে এনে নিচ্ছে তার প্রতিশোধ। জানিয়ে দিচ্ছে পরমাণু বোমা থেকে সেও কম শক্তিশালী নয়! নাকি অকারণে ১৯৪৫ সালে জাপানে পরমাণু বোমা নিক্ষেপের এ একধরণের প্রতিবাদ! যার মধ্যে মিশে আছে প্রতিহিংসা!

জয়া ফেব্রুয়ারী মাসের প্রথম দিকে কোরিয়ায় গিয়েছিল অফিসয়াল ট্যুরে৷ যে চাকরিতে আছে সে মাঝে মাঝেই তাকে বিভিন্ন দেশে যেতে হয়৷ কখনও কোন নীতি নির্ধারনী বৈঠকে। কখনো বা কোন সেমিনারে৷ ঐ সময়টায় চীনের Wuhan শহরে COVID–19 নামে একটি ভাইরাস সংক্রমণ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল৷ ইতিমধ্যে মৃত্যু হয়েছে ঐ শহরের দুই সহস্রাধিক লোকের৷ চীনে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছিল৷ আবার কিছুদিনের মধ্যে নিয়ন্ত্রণও করা গিয়েছিল। তবে ২০০২ সালে সার্স ভাইরাসে প্রাণ হারিয়েছিল বেশ কিছু মানুষ৷ জয়াদের সেমিনারের ফাঁকে ফাঁকে নিজেদের মধ্যে যে এই নিয়ে আলোচনা হয়নি তা নয়। তবে সবাই ভাবল অতীতেও এমন হয়েছিল। চীন ১৪০ — ১৫০ কোটি জনসংখ্যার দেশ। সেখানে দুই হাজার লোকের মৃত্যু এমন বড় কোন ব্যাপার নয়। চীন ঠিক আয়ত্তে নিয়ে আসবে৷ চীনের প্রতিনিধিদের কপালেও দুশ্চিন্তার বলিরেখা দেখা যায়নি৷ অবশ্য তাদের স্কিন এমন যে সাদা চোখে কিছুই বোঝার উপায় থাকে না৷

দিন পাঁচেক পরে জয়া দেশে ফিরে এল৷ একাই থাকে ফ্ল্যাটে৷ সঙ্গে আছে আজ বহু বছর যাবত সুষমা মাসী৷ সেই তার সব দেখে শুনে রাখে৷ বাবা মাকে হারিয়েছিল একরকম ছোট বয়েসে। বড় হয়েছিল ভারতেশ্বরী হোমসে৷ সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। হাতখরচের জন্য কয়েকটা টিউশনি করত৷ বাকি সময়টা কাটত ক্লাসে না হয় লাইব্রেরিতে। সখ আহলাদ কিছুই ছিল না তার। ছোট বয়েসেই চিনে গিয়েছিল পৃথিবীটাকে যেদিন হঠাৎ এক সড়ক দুর্ঘটনা তার জীবনকে ওলটপালট করে দিয়েছিল। এক মাসী নিয়ে এল ভারতেশ্বরী হোমসে। ভর্তির টাকা হয়তো বা তিনিই দিয়েছিলেন বা বাবার অফিস থেকে পাওয়া কোনটা সেটি বোঝার বয়স জয়ার হয়নি। পড়াশোনায় ভালো ছিল। তাই নিয়মিত বৃত্তি পেত৷ আর তাতেই তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে কোন অসুবিধে হয়নি। কারও দ্বারস্থ হতে হয়নি। দিদিমনিরা খুব স্নেহ করতেন৷ পড়ার বাইরে জয়ার গানের গলা ছিল অপূর্ব। ওর মাও চমৎকার গাইতেন। খেলাধূলায়ও ছিল সবার আগে৷ শুধু ছিল না মা বাবার স্নেহের পরশ৷ তার কাকু পিসীরা কোনদিন খবর নেয়নি। ধীরে ধীরে জয়া মানিয়ে নিয়েছিল পরিবেশের সঙ্গে। মনে কোন আক্ষেপ না রেখে।

ঢাবি তে পড়ার সময় হঠাৎ একদিন পরিচয় হয়েছিল সমরেশের সঙ্গে। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। পড়াশোনার চেয়ে ছাত্র রাজনীতিতে আগ্রহ ছিল প্রবল৷ তুখোড় বক্তা৷ প্রচন্ড জনপ্রিয় ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে। জয়াই শুধু দূরে থাকত৷ তবে বেশিদিন পারেনি। একদিন জয়া লাইব্রেরিতে বসে পড়ছিল৷ হঠাৎ দেখল সমরেশ একটা চেয়ার টেনে ওর পাশে বসে পড়ে কোন ভনিতা না করেই বলে উঠল

> ম্যাডাম আপনার নোটগুলো আমায় ধার দেবেন?

জয়া অবাক হয়ে তাকাল। যেন কতদিনের চেনা।

> এভাবে তাকাবেন না। আপনার চাউনিতে কী যেন আছে৷ বুকের ভেতরটায় কেমন করে উঠে বুঝাতে পারব না।

জয়া চুপ।

> নোটস না পেলে পরীক্ষায় নির্ঘাত ফেল করব। আপনি তো বই ছাড়া আর কিছু চেনেন না।
> আপনি বই এড়িয়ে চলেন কেন? নিজে পড়তে পারেন না? এতক্ষণে জয়া মুখ খুলল।

> যাক্। আপনি কথা বলতে পারেন তাহলে? আমি তো ভেবেছিলাম আপনার ভোকাল কর্ডে কোন সমস্যা

রয়েছে। এমনভাবে বলল জয়া হেসে ফেলল। পরক্ষণেই গম্ভীর হয়ে গেল।

> ওঃ! আপনি হাসতেও পারেন! কী সুন্দর হাসি। ওটাতেই আপনাকে বেশি ভালো লাগছিল। জোর করে গম্ভীর হয়ে থাকার দরকার কী?

> নোটগুলো পাচ্ছি তো?

জয়া মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিল। এইভাবে দুজনের মধ্যে একধরনের বুঝাপড়া হতে থাকল৷ খুব আবেগ যেমন ছিল না, তেমনি পরস্পরের ভালোমন্দের প্রতি কৌতূহল থাকত৷ জয়া আগের চেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে শুরু করল। গুনগুন করে অনেক সময় গান করতে৷ প্রতিদিন সমরেশ লাইব্রেরিতে একপাক ঘুরে যেত। গল্প করার মত ওর সময় কোথায়? তখন এরশাদ সরকার বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। সমরেশ সেই আন্দোলনের একজন নেতা৷ এই নিয়ে জয়া কখনও কিছু বলত না। মনে মনে চাইত সমরেশ যেন এগুলোর সঙ্গে জড়িত না থাকে। কিন্তু সে যে কথা শোনার পাত্র নয় তাও বুঝত জয়া৷ আর তাছাড়া জয়ার সঙ্গে ওর পরিচয়ই বা কতদিনের? কোন অধিকারে জয়া ওকে বারণ করবে? তবে এতকিছু হিসাব না করে বারণ করাটাই হয়তো বা উচিত ছিল৷ আজ এত বৎসর পরেও জয়ার আফসোস হয়। হায়! কেন বারণ করলাম না?

১৯৮৭ সাল৷ জয়ার জীবনে আর একটি কালো বৎসর। ২৩শে ফেব্রুয়ারি৷ একটি যন্ত্রণাকাতর বিষাদমাখা দিন ওর জীবনে। সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে ক্লাসে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিল। ওর রুমমেট অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল কোথায় যাচ্ছিস? কেন ক্লাসে। আজ তো ক্লাস হবে না। তুই শুনিসনি কিছু? জয়ার বুকের ভিতর হাতুড়ি পেটানো শুরু হয়ে গেছে। মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কেন যেন সমরেশের কথাই মনে পড়ল সবার আগে। সেই সময়টায় যখন তখন ভার্সিটি ক্যাম্পাসে অস্ত্রের মহড়া চলত। নিভে গিয়েছিল কত মেধাবী ছাত্রের জীবনপ্রদীপ। কোন রকমে শিরীনকে জিজ্ঞেস করল কী হয়েছে? ঠিক জানি না৷ তবে রাতে ক্যাম্পাসে গোলাগুলি হয়েছিল৷ শুনেছি সমরেশদা…

জয়া আর্তচিৎকার করে উঠল।

সেই থেকে শুরু হলো জয়ার নিঃসঙ্গ জীবন৷ বেশ কিছুদিন একরকম মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় ছিল৷ বান্ধবীরা পাশে এসে দাঁড়াল৷ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেত৷ ওকে একা থাকতে দিত না কখনো৷ কেউ না কেউ পাশে থাকতোই৷ ধীরে ধীরে জয়া স্বাভাবিক হল। বান্ধবীদের কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ রইল না। তবে নিজে থেকেই আরও গুটিয়ে নিল। ওর ধারণাই হয়ে গেছে ও যাকে আঁকড়ে ধরবে সে তাকে ফেলে চলে যাবে৷ তার চেয়ে এইই ভালো৷ একা থাকা৷ পরীক্ষা শেষে বি সি এস দিয়ে সরকারি চাকরিতে ঢুকল। একসময় ইউ এন জব নিয়ে চলে গেল দেশের বাইরে। বর্তমানে পোস্টিং ম্যানিলাতে। তবে একটা কাজে এসেছে বাংলাদেশের কক্সবাজারে। জীবনের অন্য দিকটার কথা মাথায় আনল না৷ কীভাবে যেন পেয়ে গেল সুষমা মাসীকে।

কোরিয়া থেকে ফিরে আসার দিন দশেক পরে এক সন্ধ্যায় জয়ার কেমন যেন জ্বরজ্বর বোধ হল৷ গলা খুশখুশ করছিল। সামান্য সর্দিও ছিল৷ জয়া ভাবল সিজন চেঞ্জের সময়৷ তাই এমন লাগছে। ফ্লু হতে পারে৷ গরমজল খেল। স্যালাইন গার্গল করল। নাঃ! তেমন উন্নতি বোঝা যাচ্ছে না৷ বরং গলার ব্যথা যেন বেড়ে গেল। শুরু হল একটু একটু করে শ্বাসকষ্ট। জয়ার অবাক লাগল। শ্বাসকষ্ট কেন হবে? ওর তো শ্বাসকষ্টের কোন সমস্যা ছিল না আগে! হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মত ওর মাথায় খেলে গেল COVID –19 নয়তো? এখন তো দক্ষিণ কোরিয়ায় এটি মহামারীর মত ছড়িয়ে পড়েছে। জয়ার মন খারাপ হয়ে গেল। এত হালকাভাবে কেন নিল ব্যাপারটা? ওর তো উচিত ছিল হোম কোয়ারেনটাইনে থাকা৷ মানুষের থেকে দূরে থাকা৷ কতজনের শরীরে ওর থেকে এই রোগ ছড়াল কে জানে? আর সুষমা মাসী? যার কেউ নেই ওর মত তিন কুলে? কী করবে এখন যদি টেস্ট পজিটিভ হয়? কোথায় করাবে টেস্ট? পজিটিভ শুনলে তো কেউ ধারেকাছে আসতে চাইবে না। এই প্রথম জয়ার নিজেকে খুব অসহায় মনে হল। আর শরীরের এই অবস্থায় জয়া নিজদেশেই রয়ে গেল। ম্যানিলায় জানিয়ে দিল৷ এখানকার মিশন ওর সঙ্গে যোগাযোগ করল৷ তারা তখনও বলল হেড কোয়ার্টার সুইজারল্যান্ডে চলে যেতে। কিন্তু জয়া অনড়৷ এই অবস্থায় মুভ করলে ওর থেকে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। ও সেটা করতে পারে না। একদিকে ভালোই হলো৷ নিজ জন্মভূমিতে আছে৷ ” আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি।”

প্রথমেই যে কথাটি মাথায় এল তাহল সুষমাকে কয়েক মাসের বেতন দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা কোন অফিস কলিগকে বলে। তার কোন আত্মীয়ের বাড়িতে চলে গেল। পরক্ষণেই মনে হল সুষমা মাসী ওর সঙ্গে ছিল৷ কে জানে! সেও হয়তো বা ইনফেক্টেড৷ বাড়ি গেলে অন্যদের মধ্যে ছড়াবে৷ আর ওখানে ওকে দেখবে কে? তার চেয়ে ওকে আইসোলেশনে রাখাই উচিত হবে৷ ওর যখন কোন সিম্পটম দেখা যাচ্ছে না। একজনকে দায়িত্ব দিল টেলিফোনে যেন ওর খবরাখবর রাখে। সুষমা মাসীকে নিজেও বুঝিয়ে বলল। আর মনে করে দেখা দরকার এই কয়দিনে জয়া কোথায় কোথায় গিয়েছে। বিশেষ কোথায়ও যায় না সে৷ তবে অফিসে তো গিয়েছিল। মাঝে দিন তিনেকের ছুটি নিয়েছিল৷ এখনই ওদের কিছু বলবে? ভয় পেয়ে যাবে না তো? কিন্তু না বললে যে পরে আরও বড় সমস্যায় পড়তে হতে পারে৷ তার আগে ওর আসলে কী হয়েছে সেটি বুঝা দরকার!

প্রথমেই যোগাযোগ করল ইনফেকশাস ডিজিজ হাসপাতালে। ফ্লু বলে উড়িয়ে দিতে যেয়ে ট্র্যাভেল হিস্ট্রির কথা মাথায় রেখে তারা স্পেসিমেন সংগ্রহ করলেন৷ শ্বাসকষ্ট খুব বেশি ছিল না৷ ঐ মুহূর্তে শরীরের তাপমাত্রা নর্মাল ছিল৷ বাড়িতে রেস্ট নেয়ার উপদেশ দিল। এক কথায় হোম কনফাইনমেন্ট৷ রিপোর্ট আসার পর ওরা যোগাযোগ করবে বলল৷ ঘরে ঢুকে প্রথম যে কাজটা করল জয়া তাহল মনে করে করে সহকর্মীদের ফোন করল। যাদের সঙ্গে তার এই কয়দিনে দেখা হয়েছিল। মিটিং করেছিল৷ তাদের ওর কথা জানাল। ওদের বলল আইসোলেশানে যেতে৷ বাচ্চাদের দূরে রাখতে৷ বাসায় বয়স্ক কেউ থাকলে তাদেরও যেন আলাদাভাবে রাখে। ওরা পাত্তাই দিল না৷ কী বলছ? আমাদের কোন অসুবিধে লাগছে নাতো? খামোখা ঘরে বসে থাকব কেন? তোমারও কিছু হয়নি। সামান্য একটু ফ্লুতে এত ঘাবড়ে গেলে? জয়া হাল ছেড়ে দিল।

দিন কয়েকের মধ্যে জয়ার রিপোর্ট এল। পজিটিভ। পজিটিভ হবে সেটা জয়া আন্দাজ করেছিল। গরম জল খাওয়া সত্ত্বেও তার গলা ব্যথা বেড়েই চলছিল৷ জ্বর চড়চড় করে বেড়ে যাচ্ছে। গায়ে ব্যথা প্রচন্ড। শ্বাসকষ্ট আগের চেয়ে অনেকটাই বেড়ে গেছে। হাসপাতাল দেরি না করে এ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে জয়াকে নিয়ে গেল। সেই কোন শৈশবে হারানো বাবা মায়ের কথা মনে পড়ায় জয়ার চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। প্রতিবেশির থেকে খবর পেয়ে সুষমা মাসী হাত পা ছড়িয়ে বসে হাপুসনয়নে কাঁদতে বসল।

পরেরদিন সুষমামাসীরও পরীক্ষা করা হল। কড়াভাবে বলা হল যেন এই চারদেয়ালের বাইরে না যায়৷ আর ওর ম্যামকে ওখানে ডাক্তাররা দেখছে। দিনদিন জয়ার অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছে। প্রচন্ড জ্বর। সাথে শ্বাসকষ্ট। ওর অবস্থা দেখলে মনে হবে এই রুমটাতে কোন অক্সিজেন নেই। পুকুর থেকে মাছ ডাঙ্গায় তুললে সে যেমন খাবি খায়, জয়ারও তেমন অবস্থা। এক পর্যায়ে ডাক্তাররা আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিল। তবু শেষ চেষ্টা হিসাবে লাইফ সাপোর্টে নিয়ে যাওয়া হল জয়াকে। চিকিৎসকদের অক্লান্ত চেষ্টায় অপরিমেয় জীবনী শক্তির জয়ার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল৷ স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারছে৷ জ্বর নেই। কথা বলছে জয়া। COVID –19 কে জয় করে। চিকিৎসকরা আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন৷ জয়া চিরকৃতজ্ঞ হশে রইল নিজ দেশের চিকিৎসকদের নিকট।

সুস্থ হয়ে জয়া ফিরে এল নিজের কর্মস্থলে দুইদিন হয়। আজ অফিসে যাচ্ছে। ড্রাইভার ইঞ্জিনে স্টার্ট দিয়ে বসেছিল গাড়িতে। জয়া সামনে এগিয়ে যেতেই গেইট খুলে দিল ফিলিপিনো গেইট কীপার৷ জয়া মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে চাইল৷ ওর মনে হল এমন বিশুদ্ধ বাতাসে ও অনেকদিন শ্বাস নেয়নি। ম্যানিলায় পলিউশন একেবারে কম নয়। তবে ওরা যেখানে থাকে সেটির পরিবেশ অন্যরকম৷ এখানে পলিউশন বলতে গেলে নেই৷ তবে এমন একটা মরণ ব্যাধিকে জয় করে, যার অন্যতম সমস্যা হলো শ্বাসকষ্ট, চোখ যেন কোটর থেকে বের হয়ে আসতে চাইত একেক সময়, সে অবস্থা থেকে ফিরে আসতে পেরে জয়ার মনে হল তার আবার নতুন করে জন্ম হল। ঢাকায় থাকতেই শুনেছিল তার কোন কোন সহকর্মীর অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা। যাদের সে সাবধান করেছিল। কিন্তু ওরা শোনেনি। জয়ার আর কোন সন্দেহ রইল না COVID –19 এর প্রথম চিকিৎসা হলো কোয়ারেনটাইনে থাকা৷ গরমজলের সাথে লেবু খাওয়া। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া৷ পুষ্টিকর খাবার খাওয়া শরীরে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য৷ বারেবারে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। সোশ্যাল ডিসটেন্স রক্ষা করে চলা। তাহলে করোনা ভাইরাস আক্রান্তের শরীরে ফ্লু এর মত আঁচড় রেখে চলে যাবে। এই জিনিসগুলো মানুষের মগজে গেঁথে দিতে হবে। তার নিজদেশে জনগণের মধ্যে এই বিষয়ে সচেতনতার বড় অভাব দেখে দুঃখ পেয়েছিল। সরকারের প্রচার সত্ত্বেও একশ্রেণির মানুষজন এখনও এই মারণ ভাইরাসের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারছে না। তা নাহলে আরও কতদেশ নিউইয়র্ক, ইতালি, স্পেনের পথ ধরবে কে জানে?

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

 

আরও পড়ুন