হারিয়ে যাওয়া স্পর্শ

হাসনাতুল জাহান

তোমাকে হারানোর পর থেকে প্রথম প্রথম অনেক কষ্ট হতো, কতো রাত যে ভাল করে ঘুমাতে পারতাম না, আর নিজেকে প্রশ্ন করতাম জীবনের সমীকরণ এত কঠীন হয় কেন ?

আজ থেকে প্রয় সাত বছর আগে কোন এক মে মাসে তুমি বেঁচেছিলে, তোমার ঐ মায়াবী মুখ আর মুক্তা ঝরানো হাসির কথা যখন মনে পড়ে সেই সময় আমি কেমন যেন আনমনা হয়ে যাই l তুমিই আমাকে তোমার তোমার জঠরে ধারন করেছিলে, যেখানে এক বিন্দু থেকে তিলে তিলে বড় করেছো, নিষ্ঠুর প্রসব বেদনা সহ্য করে দুনিয়ার আলো দেখিয়েছ, জান্নাতের পানির মত সুমিষ্ট বুকের দুধ পান করিয়েছ l তুমিয় আমার মামুনী আমার মা l মাঝে মাঝে তোমাকে প্রায়শই স্বপ্নে দেখি তখন তুমি এসে বলো,” আমি মরিনি , কে বলল আমি মারা গেছি ? ” আর তখন ঘুম ভেঙ্গে গেলে মনে হয় , ঘুম আর না ভাংলে বেশ ভালে হত, তুমি আর আমি কতো কাছাকাছি l যে চেনা মুখ ঘুমের ঘোর্ এত কাছাকাছি , বাস্তবে সে এত দূরে – বহুদুরে কেন ?

২৫ শে মার্চ দিনের বেলা যখন তুমি ফোনে কথা বলো
বলেছিলে ,” তুমি ছাদে যাচ্ছ আমার প্রিয় কবুতর গুলোকে খাওয়াতে, আর তোমার সাবধান বানীর মধ্যে ছিলো ,” তুমি মনা কারো সাথে কথা বললে, সাবধানে কথা বলো, কারন তুমি তো সবার সাথে সরল ভাবে কথা বলো l”
তোমার এই শেষ কথায় ছিল আমার সাথে শেষ কথা !
কতো তোমার সাথে অভিমান করে কথা বলিনি তুমিই আমার রাগ ভাংগাতে আর বলতে ,” যেই দিন থাকবনা সেই দিন বুঝবে?” আমি কিন্তুু আর তোমার উপরে অভিমান করিনা, তোমাকে মাঝে মাঝে অনেক ডাকি ,” মামুনী তুমি কেমন আছ ?” এইবার তুমি কিন্তু আমার উপরে চীরঅভিমান করে আছ , কোন উত্তর দাওনা l

তুমি কামিনী আর রঙ্গন ফুল ভালবাসতে , তাই আমি তোমার তোমার রুমের জানালার পাশে, এই গাছ গুলো লাগিয়েছিলাম l রঙ্গন গাছটি তোমার অনুপস্থতি সহ্য করতে না পেরে মারা গেছে ,আর কামিনী অনেক বড় হয়ে গেছে l এখনো শুভ্র কামিনীতে সমস্ত গাছ ভরে আছে, কখনো বুলবুলি বা টুনটুনি বাসা বাধে আর কিচির মিচির ডাকে l আজও প্রতিরাতে নি:শব্দে তোমার তরে কামিনী তার সৌরভ ছড়ায় l

তুমি ছিলে আমার অনেক ভালো বন্ধু এমন কিছু নেই যে আমি তোমার সাথে শেয়ার করতাম না, তোমাকে কোন গল্প না বলতে পারলে আমার পেটের ভাত হজম হত না l আমি যখন প্রথম মা হওয়ার জন্য হসপিটালে ভর্তি হলাম পাশে ছিল তোমারই মত আমার আরেক ভালো বন্ধু, আমার স্বামী ও একজন মিডওয়াইফ l বয়স্কা মহিলা খুবই ভদ্র ও ভালো আমাকে খুব স্নেহ করেছিল l যখন মহিলা জেনেছিল আমার মা নেই আরও স্নেহ করতেছিল l আমরা মুসলিম দেশের হয়েও ওদের মত ভাল ব্যাবহার করতে পারি না l

তোমাকে যারা খুন করেছে ঐ ভয়াল রাতে তাদের কোন বিচার হয়নি আজ পর্যন্ত l সবাই শুধু টাকা আর চায় l শপথ করেছি ঘুষ দিয়ে কোন বিচার নয় l দুনিয়ার আর কোন মানুষের কাছে কোন বিচার চাইনা, সব বিচার আল্লাহ করবেন l
প্রায় তিন মাসের মত তোমাকে আইসিইউতে মরনের সাথে লড়াই করতে হয়েছে , আর আমি যখন বাংলাদেশে গেলাম, তোমার চেহারা পুরা কালো আর সারা শরীরে ভোতা চাপাতির শত শত কষ্ট l আমি যখন তেমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতাম তুমি কথা বলতে পারতে না শুধু দুই চোখ বেয়ে অজস্র অশ্রু ঝরে ঝরে পরত l
কিন্তুু যেই দিন তুমি চিরতরে মরনকে আলিঙ্গন করলে, ডাক্তার আর নার্সরা সব খুলে ফেলতেছিল সবাই অবাক হয়ে গেছিল তোমার অপূ্র্ব চেহারা দেখে !
সবাই অবাক বিষ্ময়ে বলতে লাগল ,” আরে এই রোগীর চেহারা মুহূর্তের মধ্যে এত সুন্দর হয়ে গেল কেমন করে ?” তোমার কপালে সাদা ঘাম মুক্তা বিন্দুর মত চিক্ চিক্ করছিল, আর তোমার মরনের পর যখন তোমার মাথার অংশ, তদন্তের জন্য পুলিশ জোর করে কাটে সেই অংশ দিয়ে পরছিল টক্ টকে তাজা রক্ত যা শহিদী মরনের আলামত বহন করে l

আমার মহান আল্লাহ্ তোমার উপরে জুলুম করার জন্য তোমাকে রোয কিয়ামতের ময়দানে নিশ্চয় উত্তম প্রতিদান দান করবেন, ইনশাআল্লাহ্ l আমি স্বপ্ন দেখি সেই পবিত্র সুন্দর দিনের যেদিন , যেদিন জান্নাতের গালিচায় তোমার মখ্মলের মত নরম হাতের স্পর্শ আমাকে সব বেদনা ভুলে দিবে l

লেখকঃ  প্রবাসী লেখক, অস্ট্রেলিয়া

আরও পড়ুন