নিষিদ্ধ নূপুরের ছন্দ (প্রথম পর্ব)

হাসনাতুল জাহান

এখন গভীর রাত , ভোরের আলোর পরশ তখনো অনেক অনেক দূরে l মাঝে মাঝে পুলিশের হুইসেল আর কিছু গাড়ির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে l বড় চৌরাস্তার মোড়ের উপর ব্যাস্ত চা দোকানের টুংটাং শব্দ, রং মাখা নিশিকন্যা চম্পা- চামেলীদের আনাগোনা আর তাদের খদ্দেরদের পশরার হাট বসেছে l সব শ্রেনী ও পেশার মানুষরাই তাদের ক্রেতা l কয়েক ঘন্টার জন্য শরীর বেচা – কেনার চুক্তি চলছে l
মাঝে মাঝে পাড়ার ককুরগুলে উচ্চ স্বরে চিতকার করছে l মনে হচ্ছে এই যেন উপযুক্ত সময়, কারো বিরুদ্ধে তাদের বিষাদ উগরানোর l ভাগ্যিস ওরা মানুষের মত কথা বলতে পারে না ! তাহলে তথাকথিত সভ্য সমাজের ভদ্রলোকগুলোর মুখোশ সবার সামনে উম্মোচিত হয়ে যেত l

রাতের আলো ও আঁধারের সব পাপ দিনের উজ্জল আলোয় কিছু সময়ের জন্য চাপা পরে যায় l
দিনের আলো বাড়ার সাথে সাথে হাজারো মন দু:খ – কষ্ট, লজ্জা- ঘেন্না সব ভুলেে নতুন কোন দিনের স্বপ্ন দেখে l আহা যেন, এই ভবেই চলে লোভী সমাজ ও নষ্ট বিবেকের লেন – দেন l
সুস্থ্য আবেগ নষ্ট বিবেকের কাছে আজ পরাজিত, দূষিত মানুষগুলোর হাসি , তামশা এবং ঠাট্টার আড়লে সমস্ত পাপগুলো যেন আরও বড় আকারের পশরা সাজাতে বসে যায় l

সকাল বেলার সূর্যের আলোর ছটা স্যাঁতস্যাঁতে বস্তির টিনের ঘরগুলির জানালা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না l

কীরে ফইজু আর কত ঘুমাবি? ওঠ ওঠ অনেক বেলা হল যে ?
ক্লান্ত ফইজু ট্রাক ড্রইভার বাবা কদম আলীর ডাক
শুনেও উঠতে পারে না l ভাল নাম ফয়জুল কিন্তুু
অনাদর ও অবহেলায় সবাই ডাকে ফইজু নামে l
নিজের মা গত হয়েছে কয়েক বছর আগে, নতুন মা মদিনা, নিজের বোন ঝিলমিলি ও সৎ বোন ফুলিকে নিয়ে বসবাস l সৎমা মদিনা মোটেও ভালো না একটু উনিশ -বিষ হলেই কথা শুনাতে ভোলে না l

মদিনা : ঐ ফয়জু, নবাবের বাচ্চা ওঠ ? কামে না গেলে তোরে খাওন দিব কিডা?
ফইজু অলসতার সাথে বিছানা থেকে উঠে ঘাড়ে গামছা আর তিব্বত কালো নিমের মাজন নিয়ে কল ঘরের দিকে ছোটে , সেইখানে দেখা হয় ঝিলমিলির সাথে l
ঝিলমিলি : বাসন মাজতে মাজতে বলে ভাইজান, আইজকা হপায় হপায় বাড়িত আইস্যো, শেফালী ফুপু আইবোl
শেফালী তাদের দূর সম্পর্কের ফুপু l মানুষের বাডিতে কাজ করে l
তারা : ঐ ঝিলমিলি তোর পিরীতের আলাপ বাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি কাম সার, অফিসে লেট হইব l
ওরা দুইজনে একই গার্মেন্টে কাজ করে l তারা আর ঝিলমিলি প্রায় সমবয়সী , তারা নিজেরাও জানেনা তাদের বয়স কত l ঝিলমিলি সবসময় পায়ে নূপুর পরতে ভলবাসে l ইদানিং ঝিলমিলিকে ফইজুর কেমন যেন লাগে, তার আদরের ছোট বোনটি আর ছোট নেই বেশ বড় হয়েছে আর তার সাথে সাথে বেড়েছে সাজগোজ l তারা দুই বান্ধবী নিজেদের মধ্যে ফিঁস-ফাঁস করে আর কেমন যেন উচ্চ শব্দে খিলখিলিয়ে হাসে l এইটাই বোধয় স্বাভাবিক বয়স বাড়ার সাথে সাথে ছোট্টবেলার বাঁধনগুলো কেমন যেন হালকা হয়ে যেতে থাকে l

বাসি পান্তা ভাত খেয়ে ফইজু বাবার সাথে কাজে বের হয়, আজকে অনেক দূরে ট্রাকের চালান আছে l

ব্যাস্ত পোষাক কারখানাতে যে যার মত কাজে ব্যাস্ত, কেউ সেলাই করছে , কাটিং করছে আবার কেউ ইস্তিরীর কাজ করে যাচ্ছে যেন কারও দিকে কারও পলক ফেলার সময়ই নেই l

এরই মধ্যে ঝিলমিলির পাশে বসা স্যুইং মাস্টার আলম
তাকে বলেে : ঐ ঝিলমিলি, আইজক্যা ছুটির পর আমি তোর জন্য গেটের কছে থাকমুনে , বড়িত যাস না কথা আছে l

তারা: ঐ আলম্যা তোর না ঘরে বৌ আছে ? তুই অর দিকে নজর দেস কেন ?

আলম : কাশেম তোরে ভুল কইছে , আমি বিয়াই করি নাই l
ছুটির পর গেটের কাছ থেকে আলম , তারা আর ঝিলমিলির পিছু নিতে থাকে , নির্জন জায়গা পেয়েই
কাছে এসে তাদের পথ রোধ করে দাঁড়ায় আর একটা কাগজে মোড়ানো প্যাকেট ঝিলমিলিকে দিয়ে বলে, তোর প্রিয় নূপুর আছে এর মধ্যে , কালকে পরে কামে আসিস l

ঝিলমিলি প্যাকেটটা হাতে নেয় কিন্তুু নিশ্চুপ থাকলেও তার চোখেমোখে ফুটে ওঠে এক নিষিদ্ধ ভালোলাগার ছোয়া l

শেফালী পানে চুন ও জর্দা মিশিয়ে, অতি কৌশল করে মুখে দিয়ে অতি উৎসাহে চিবুতে চিবুতে কদম আর মদিনাকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকে : মাইয়া তো ডাঙ্গর
হইচে কঁচি বয়সে বিয়া না দিলে পরে আর কেডা বিয়া করবো?

কদম : তুমি সমন্ধ দেখ বুঝি, তোমার হাতে কি কোন পোলা আছে?

শেফালী : বিয়া দিলে পোলার অভাব হইব ?

মদিনা : তুমি ঘর দেখ কিন্তুু কিছু দেওন থোওন করতে পারমুনা l

শেফালী : আবিয়্যাত্তা পেলা পাইতে হইলে কিছু দিতে না পারস তাও তো বিশ হাজার নগদ ট্যাকা,ঘড়ি আর সাইকেল তো লাগবই l
মদিনা : তুমি বুড়া- ধুরা যা পাও তাই লইয়্যা আস , তাও চলব কিন্তুু ট্যাকা খরচ করতে পারমু না l

তারা আর ঝিলমিলি কাজ থেকে ফেরার পর পাশের রুমে সাথীদের ঘরে টিভিতে নতুন একটা সিরিয়াল “কট্ – কটী রানী ” দেখতে গেছে l ঝিলমিলি নিজেকে নিয়ে সিরিয়ালের মধ্যে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতে থাকে ; নিজেকে ভাবে রাজকন্যা “মালা” আর আলমকে ভাবে “টগর কুমার”l
রাজনকন্যা মালা কটকটি রানীর প্রাসাদে বন্দী ; টহর কুমার প্রাসাদে পৌঁছে তাকে প্রতিশ্রুতি দেয়” যে ভাবেই
হোক রানীর মায়াবী কালো যাদুর অন্ধকার হতে উদ্ধার করে সাত সাগর পাড়ি দিয়ে , নিয়ে যাবে চাঁদের দেশে যেখানে রাজকন্যা মালার থাকবে শত শত
ডানা -কাটা পরী আর দাস ও দাসীl
(চলবে)

 

লেখকঃ সাহিত্যিক ও প্রবাসী বাংলাদেশী, অস্ট্রেলিয়া

আরও পড়ুন