নিষিদ্ধ নূপুরের ছন্দ ( দ্বিতীয় পর্ব )

হাসনাতুল জাহান

ডরথিকে আজকে আরও আকর্ষনীয় ভাবে সাজতে বলা হয়েছে ; তাকে আজ সঙ্গ দিতে হবে ভিআপি লেভেলের একজনকে , যাকে তুষ্ট করতে পারলে স্কট্ ব্যাবসার রাস্তা অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যাবে l

ডরথি ভাল উচ্চতার, ছিপছিপে গড়নের মেয়ে এবং গায়ের রং চাঁপা ফুলের মত, তার সাথে রয়েছে তার বিখ্যাত সেই মায়াবী ডাগর কালো আাঁখি l পেশায় এয়ারহোস্টেজ; থাকে একা নিকেতনে তার নিজস্ব টিপটপ ফ্ল্যাটে l সুন্দর বচনভঙ্গি ও আধুনিক শিক্ষিত; তাই উচু লেভেলের চাঁমেলী পিয়াসীদের কাছে একটা আলাদা চাহিদা রয়েছে l সে অবিবাহীত, তবে এক সহকরর্মীর সাথে বেশ ঘনিষ্ট সম্পর্কে পৌঁছানোর পরেও তা শেষ পর্যন্ত আর টেকেনি ; সেই থেকে একা থাকে, আর বিয়ের কোন ইচ্ছাও নেই l
বয়স্ক বাবা – মা থাকে গ্রামের বাড়িতে ; তবে তাঁদের ভরণ – পোষনের জন্য প্রতি মাসে মোটা অংকের একটা অংশ সময় মত পাঠায়, সে ভাইয়ের কাছে l

সমস্ত ঘর জুড়ে আজ ছড়িয়ে পরেছে রজনীগন্ধার মোহনীয় টাটকা সুবাস আর তাদেরকে সঙ্গ দিচ্ছ অতি মূল্যবান নীল রংয়ের অর্কিড গুচ্ছ l টেবিলে রাখা হয়েছে দামী মানের শুরা- সাকী ,ভারি ধরনের খাবার; তবে পাশাপাশি স্ন্যাকস্ এর ব্যাবস্থাও রয়েছে l
ডরথি আজ পরেছে তার প্রিয় লেমন রঙের শাড়ি, টগর খোপায় শোভা পাচ্ছে একগুচ্ছ লাল জারবেরা, শাড়ির সাথে ম্যাচিং করে পরেছে স্লিভলেস্ ব্লাউজ , পায়ে অতি সাধের দুবাই থেকে কেনা মূল্যবান পাথর বসানো পায়েল্ , ডান হাতে রয়েছে ডায়মন্ডের ব্রেসলেট আর গা থেকে বের হচ্ছে ক্যামেলিয়ার হালকা সুবাস l

নূপুরের রিম্ ঝিম্ শব্দ ওর ভীষন প্রিয় ; এরই মধ্যে একটা ফোন সে রিসিভ করে l
ডরথি : হ্যালো ছ্ন্দা দিদি বল ?
ছন্দা: কীরে সব ঠিকঠাক আছে ? কী অবস্থা বল?
ডরথি : সব ব্যাবস্থা সুন্দর মত করেছি ; তুমি চিন্তা করোনা l

ডরথি : তোর উপর আমার ভরসা আছে; তুই তো আর এই লাইনে নতুন না l

এরই মধ্যে কলিং বেলের শব্দ শুনা যাচ্ছে; ডরথি: ছন্দা দিদী মনে হয় এসে গেছে বলেই বিদায় নিয়ে ফোনটা রেখে দেয় l

দরজা খুলতেই চোখে পরে স্টাইলিস্ গোছের একজন পরিনত বয়সের লোককে ; যার পোষাক ও চেহারায়
আভিজ্যাতের ছাপ স্পস্ট ফুটে উঠেছে l

হাই, আমি এবি চৌধুরী পুরা নাম আতিকুল বারী; বিখ্যাত ইনডাসট্রীয়ালিস্ট ও এবিগ্রুপের চেয়্যারমেন l

ডরথি : প্লিজ্ , স্যার ভিতরে আসুন l
এবি চৌধুরী ; সোফাতে হ্যালান দিয়েই এক পেগ মদ নিয়ে আয়েশী ভংগিতে চুমুক দিতে দিতে বলতে থাকে তার বর্তমান অবস্থার কথা l

ডরথি : বাড়িতে কে কে আছে আপনার ?

এবি চৌধুরী : আছে এক গেঁয়ো মার্কা স্ত্রী, মা আর দশ বছেরের একটা ছেলে l
ডরথি: গেঁয়ো মানে ?
এবি চৌধুরী : এই তোমার মত এত সুন্দর ও স্মাট না ; মায়ের চাপে পড়ে বিয়ে করেছি ; প্রথম প্রথম একটু ভাল লাগত এখন আর ভাল লাগে না l

ডরথি : ও তাই খুব দু:খজনক ; নাম কী উনার?

এবি চৌধুরী : সেঁজুতী ইসলাম ; মায়ের এক পরিচিত বান্ধবীর মেয়ে l

নূপুরের রিমঝিম শব্দ, রজনীগন্ধার সুবাস , শুরা- সাকীর মাদকতা এ যেন এক অন্য রকম পরিবেশ ;
এই রোমান্টিক আবহাওতে কয়েকবার করে বেজে ওঠে এক অপ্রত্যাশিত বেসুরে আওয়াজ l ও সরি, সাইলেন্ট করতে ভুলে গেছি; এবি চৌধুরী নেশার ঘোরে ফোন রিসিভ করে l

এবি চৌধুরী: কেন বার বার ফোন করে ডিসর্টাব করছ ? আমি তো বলেছি কোনদিন বাসায় ফিরতে না পারলেও ফোন করবে না l

সেঁজুতী : মা তোমার কথা বার বার বলতেছিল; আর আমিও খাবার নিয়ে অপেনিষিদ করছি l

এবি চৌধুরী : আমি ডিনার সেরে ফেলেছি ; তোমাকে বলতে ভুলে গেছি , আজকে রতে আমার বিদেশী
ডেলিগেটদের সাথে অফিসে মিটিং আছে ;ফোন রেখে দাও l

সেঁজুতিকে, আতিক কখনোই বিয়ের পর থেকে নূন্যতম সম্মানই দেখায়নি ; যে সময়টুকু বাসায় থাকে খুব মেজাজ দেখায় বা অনেক সময় এড়িয়ে চলে;

কিন্তুু আজকের কন্ঠে তাচ্ছিল্যের ভাব যেন আরও প্রকট ছিল ; আতিককে কখনো সে, সন্দেহের চোখে দেখেনি কিন্তুু আজ কেমন যেন মনের মধ্যে উল্টা –পাল্টা চিন্তা আর অবিশ্বাস – সন্দেহের দানা দলা পাকাচ্ছে l
সেঁজুতি, শিক্ষিত ও খুব শান্ত স্বভাবের মেয়ে ; বিয়ের পর পর চাকুরী করার ইচ্ছা ছিল ; শশুর বাড়ির ঐতিয্য মেনে আর সেই পথে পা বাড়ানো হয়নি l

আজ যেন এলোমেলো ভাবনার মাঝে ঘুম যেন তার
দুইচোখ থেকে চির বিদায় নিয়ে নিয়েছে ; ওয়াল ঘড়িতে জানান দিচ্ছে , রাত প্রায় চারটা বাজে l নির্ঘুম এই রাতের বেলায়, তার প্রিয় বারান্দায় এক কাপ
ব্ল্যাক কফি আর দূর আকাশের তারা গুলো তাকে সংগ দিচ্ছে l
পাশের রুমে দাদী সালেহার কাছে ঘুমাচ্ছে একমাত্র ছেলে টুটুন; আতিকের ঘুমের অসুবিধা হত বলে
ছোটবেলা থেকেই ও দাদীর রুমে ঘুমানের অভ্যাস হয়ে গেছে l এর মাঝেই মসজিদ থেকে ভেসে আসে সুমধুর আজানের বাণী : আল্লাহু আকবার , আল্লাহু আকবার ;

সালেহা বেগম নামাজের জন্য উঠে পড়েছে ; দরজায় টোকা দিয়ে জানতে চায় “,বৌমা খোকা কি ফিরেছে?”
ডরথি : না মা l

সালেহা: ও তাই নাকি? ফিরবে কখন ?

সেঁজুতি: জানিনা, কখন ফিরবে বলে নি l
( চলবে)

আগের পর্বটি পড়তে চাইলে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন-

নিষিদ্ধ নূপুরের ছন্দ- প্রথম পর্ব

 

লেখকঃ অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী লেখক 

আরও পড়ুন