রক্ত

মনসুর আলম

ছাত্রজীবনে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে কিছুদিন রিসেপশনিস্ট কাম্ ম্যানাজার হিসেবে পার্ট টাইম জব করেছি। ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ছিলেন আমার পূর্ব পরিচিত তাই সুবিধামতো সময়ে আমার শিফটিং নিতে পেরেছি অন্যথায় চাকরিটি করা সম্ভব হতোনা, ৮/৯ মাস পরেই পরীক্ষার প্রেশারে চাকরিটি ছেড়ে দেই। পরিচালনা পরিষদে পাঁচজন ডাক্তার ছিলেন; তাঁদের একজনকে আমি কখনো দেখিনি, শুধু ফোনে কথা হয়েছে। বাকী চারজনের প্রত্যেকেই সজ্জন, নিপাট ভদ্রলোক। সবাই সদালাপী এবং ফ্রেন্ডলি ছিলেন। সাধারণত প্রাইভেট ক্লিনিকে যেধরনের নির্মম আচরণের খবর পাওয়া যায় এধরনের কোনোকিছু আমি দেখিনি। আমি নিজেও দায়ীত্ব নিয়ে অনেক রুগীকে বাকীতে ডিসচার্জ করে দিয়েছি, কয়েক মাস পরে সেই টাকা রোগীর বাড়িতে গিয়ে নিয়ে আসতে হয়েছে। কখনোই বিলের টাকার জন্য কাউকে অপদস্থ হতে দেখিনি কিংবা অতিরিক্ত চার্জ করার বাহানাও দেখিনি। কিছু রুগীর বাকী টাকা তখনও উদ্ধার করতে পারিনি।

একদিন সন্ধ্যায় পরিচালকদের একজন এসে হাসতে হাসতে আমাকে বললেন, “মনসুর, তোমার বিরুদ্ধে কমপ্লেইন আছে।”

আমি একটু থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “স্যার, কী কমপ্লেইন? ”

– তোমার ভাবি ফোন দিয়েছিলো (ওনার স্ত্রী, তিনিও ডাক্তার এবং গাইনকোলজিস্ট) গতকাল সন্ধ্যায়, তুমি নাকি ফোনে যথেষ্ট বিনয় দেখাওনি ; তোমার গলার স্বর একটু উঁচু ছিলো এবং তুমি খুব দ্রুত গতিতে কথা বলছিলে।

– স্যার, আমার ঠিক মনে নেই, হতে পারে। গত সন্ধ্যায় আমি একটু উত্তেজিত ছিলাম, উত্তেজনার ঠেলায় যদি আমার অজান্তে কোনো ব্যত্যয় হয়ে থাকে, হতে পারে। আমি ফোন করে ভাবীকে স্যরি বলবো।

– আরে নাহ্! স্যরি বলতে হবেনা, আমি ওকে বুঝিয়ে বলবো। তো উত্তেজিত ছিলে কেনো? কিছু হয়েছে?

– জ্বী স্যার, একটি পারিবারিক ঘটনা আছে। শুনবেন? আগে পাঠকদেরকে বলে আসি।

আমার নানার বাবা (বড় আব্বা), ওনারা ছিলেন দুই ভাই। একজন মানে আমার নানার বাবা ছিলেন কঠোর ব্রিটিশ বিরোধী, ব্রিটিশদের নাম শুনলেই ওনার মাথায় রক্ত ওঠে যেতো। ব্রিটিশরা এশিয়া থেকে কিছু মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার নিবে তাই OP 1 নামে একটি লটারী ছেড়েছে অনেকটা আমেরিকার ডিভি লটারীর মতো। নানার চাচাতো ভাইয়েরা গোপনে সেই লটারীর ফরম পূরন করেছেন। এই খবর জানাজানি হয়ে গেছে। শুরু হলো দুই ভাইয়ের যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত একজন। রাগ করে ওনার ভাগের সকল সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে পরিবার, সন্তানসহ গ্রাম ছেড়ে চলে যান। অনেক দূরে আরেক থানায় গিয়ে নতুন আবাস শুরু করেন। দুই পরিবার সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়, কোনো যোগাযোগ নেই, একেবারে কাট।

ব্রিটিশ লটারীর রেজাল্ট হলো, ওনারা সবাই টিকে গেলেন। সপরিবারে ইংল্যান্ড চলে গেলেন গোষ্ঠীভুক্ত সবাই। দুই পরিবারের দুরত্ব আরও বেড়ে গেলো, শত্রুতার কাছাকা‌ছি। কোনো যোগাযোগ নেই। একটি পরিবার ব্রিটেইনে থেকে শিক্ষা দীক্ষায় উন্নত হতে থাকলো পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ঈর্ষণীয়। এদিকে নানারা কৃষি সম্পত্তি নিয়ে গ্রামেই পরে রইলেন পুরোনো অহমবোধ নিয়ে। লেখা-পড়ার প্রতি একধরনের বিতৃষ্ণা, বংশ মর্যাদার ধাপটের অহংকার নিয়ে ধীরে ধীরে অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে যাচ্ছে বংশের এই অংশটি। একসময় ওনাদের বাবা/ চাচারা মারা গেলে নানার চাচাতো ভাইয়েরা চেষ্টা করেছেন এই অংশের সাথে ছেলেমেয়ের বিয়ের সম্পর্ক করে এদেরকেও ইংল্যান্ড নিয়ে যেতে কিন্তু, এদের মিথ্যা দম্ভ আর ব্রিটিশ বিরোধিতার কারণে সেই প্রচেষ্টাও বিফলে গেছে। তারও পরে আমাদের মা / খালাদের জেনারেশনে এসে সামান্য কিছু যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দুই পক্ষের মধ্যে। প্রবাসী পরিবারের কেউ ঘটনাচক্রে দেশে আসলে এই পরিবারের সাথে দেখা করতে যেতেন। হালকা একটু বন্ধন পুনরায় জোড়া লাগতে শুরু করেছে। ততোদিনে আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে বিশাল পার্থক্য দেখা দিয়েছে। আমার বয়স যখন ৫/৬ বছর তখন আম্মার এক চাচাতো বোন মানে আমার খালা দেশে এসেছিলেন, আমাকে অনেক আদর করতেন – পরে শুনেছি আম্মার কাছ থেকে এসব কথা।

ক্লিনিকের ম্যানাজার হিসেবে সবসময় চেষ্টা করতাম রোগীদেরকে সর্বোচ্চ সেবা দিতে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমি রুগীদের কেবিনে এবং ওয়ার্ডে ভিজিটে যেতাম তাঁদের খোঁজখবর নিতে, বিশেষ করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, সাপোর্টিং স্টাফ, আয়া / বয়দের কাজে কর্মে কারো কোনো অভিযোগ আছে কি না ইত্যাদি খোঁজখবর নিতাম। সদ্য প্রসূতি হওয়া কোনো মা, অপারেশনের রোগী – এদেরকে একটি ফ্রেশ ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে আমি পছন্দ করতাম। নিজের টাকায় ফুল কিনে নিতাম।

ব্যক্তিগত কারণে একদিন ছুটি নিয়েছি, ক্লিনিকে যাইনি। পরেরদিন সন্ধ্যায় ডিউটিতে গিয়ে জানতে পারলাম গতকাল একটি ইমার্জেন্সি রোগী এসেছে কেবিন নং ১১, কিডনিতে পাথরের সমস্যা নিয়ে। হাই ব্লাড প্রেশার, ডায়াবেটিস তারউপর প্রশ্রাব বন্ধ ; তাড়াহুড়া করে অপারেশন করা হয়েছে। হাই ব্লাড প্রেশারের কারণে এনেসথেশিয়ায় সমস্যা দেখা দিয়েছিলো, এখন ঠিক আছে। আমার ডিউটির অংশ হিসেবে এমনিতেই যেতাম সব রোগীদের কাছে কিন্তু, আমার সহকর্মী বললো কেবিন নং ১১ তে নাকি সুন্দরী ললনাদের আনাগোনা অনেক বেশি আর ইংলিশের খই ফোটে সবার মুখে। বিদেশ থেকে আসা ফোনকল ট্রান্সফার করতে করতে নাকি সে টায়ার্ড হয়ে গেছে। সিদ্ধান্ত নিলাম যা আছে কপালে, ললনাদের ভীড়ে কেবিন ১১ তেই আগে যাবো।

ইন্টারকমে অনুমতি নিলাম, ফুল হাতে নিয়ে পৌঁছে গেলাম দরজায়। নক্ করতেই সত্যি সত্যি এক অপরুপা হাই হীলের টক্ টক্ আওয়াজ তোলে দরজা খুলে দিলো। পরিচয় পর্ব শেষ হতেই মনযোগ দিলাম বিছানায় শুয়ে থাকা রোগীর দিকে। মধ্য বয়স্কা, ধবধবে ফর্সা, খুবই মায়াবী চেহারার এক নারীমূর্তি শুয়ে আছেন বিছানায়, শুধু একটু ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। আমার রুটিন কাজ করে, হাতের ফুলটি দিয়ে বিদায় নিয়ে চলে আসলাম। মনে হচ্ছিলো কী যেনো একটা কিছু পেছনে ফেলে যাচ্ছি। না, সুন্দরী ললনার দিকে আমার কোনোই আগ্রহ নেই, আমি বিভোর হয়ে আছি রোগীর ভাবনায়।

একাউন্টসের কিছু কাজ ছিলো কিন্তু, মন বসাতে পারছিনা। কেমন একটি অস্বস্তি লাগছে। হঠাৎ দেখি সেই সুন্দরী এসেছে রিসেপশনে:

– ভাইয়া, আপনি যদি কিছু মনে না করেন আমার আম্মু আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাচ্ছেন।

মনের উসখুস ভাব ঝেড়ে ফেলে প্রায় দৌড়ে গেলাম কেবিন ১১ তে।

– বাবা, যদি কিছু মনে না করো তোমাকে ‘তুমি ‘ করে বলি? তুমি আমার ছেলের বয়সী।

– অবশ্যই আন্টি। কী যে বলেন! আপনি নির্দ্বিধায় আমাকে ‘তুমি’ করে বলুন প্লীজ।

– তোমাকে দেখে আমার হার্টবিট বেড়ে গেছে, আমার রক্তের মধ্যে একধরনের তোলপাড় শুরু হয়েছে। কথা বলে খোলাসা নাহলে শান্তি পাচ্ছিনা। তোমার ব্যক্তিগত বিষয়ে জানতে চাইলে তুমি কি রাগ করবে?

– জ্বী না আন্টি, আপনি যা ইচ্ছা জিজ্ঞেস করুন।

– তোমাকে দেখেই আমার অনেক আপনজন মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে তুমি আমার রক্তের সাথে মিশে আছো। জানিনা কেন মনে হচ্ছে তুমি আমারই বংশধর।
তোমার নাম কি মনসুর?
– জ্বী।
– তোমার আম্মার নাম কি ওমুক?
– জ্বী।
– তোমার বাড়ি কি অমুক জায়গায়?
– জ্বী।

এরপরের দৃশ্য বর্ণনা করার ভাষা আমার জানা নেই। উনি ওনার মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন- বলছিলাম না, এ আমার রক্ত না হয়েই যায়না। তুই তো ওকে ডাকতে যেতে চাইলিনা, দেখেছিস? আমার রক্ত ঠিকই আমাকে জানান দিয়েছে।

আমাকে কাছে ডেকে জড়িয়ে ধরে বললেন – আমি তোমার খালা, লণ্ডন থাকি। তুমি যখন খুব ছোটো ছিলে হয়তো ৪/৫ বছরের ছিলে তখন তোমাকে দেখেছি। এরপর আর দেশে আসা হয়নি। তোমার আম্মাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। কতবছর আমার বোনকে দেখিনা। কী ভাগ্যগুণে এই ক্লিনিকে এসেছিলাম নাহলে কি আমার বংশ খুঁজে পেতাম! দেখতো বাবা, আমার শরীরে তোমার মায়ের গন্ধ পাও কি না?

এরকম এক‌টি সন্ধ্যায় আমি যদি উত্তেজিত হয়ে থাকি, আমাকে ক্ষমা করা যাবে কি?

লেখকঃ সাহিত্যিক ও প্রবাসী বাংলাদেশী, সাউথ আফ্রিকা

 

আরও পড়ুন