ইন্টারপ্রিটেশন

মনসুর আলম

২০১৮ সালে রোজা ছিলো মে/জুন মাসে। সাউথ আফ্রিকাতে তখন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। এক শুক্রবারে অফ্ ডিউটিতে ছিলাম তাই সকালে কম্বলের নীচে গা এলিয়ে কোলের উপর ল্যাপটপ নিয়ে বই পড়ছিলাম। হঠাৎ করে টিংটিং করে ফোন বেজে উঠলো। সাধারণত এই টাইমে কেউ ফোন দেয় না, চমকে উঠে তাকালাম ফোনের দিকে – অপরিচিত নম্বর। ফোন দিয়েছে লোকাল পুলিশ স্টেশনের এক ক্যাপ্টেন-
মিঃ আলম, তোমার হেল্প দরকার।
– কী করতে পারি তোমার জন্য?
– আমরা একজন বাঙালিকে এ্যারেস্ট করেছি, সে ইংলিশ জানে না ; তুমি প্লীজ দোভাষী হিসেবে আমাদেরকে হেল্প করো।
– কেন এ্যারেস্ট করেছো? কেইসটা কী?
– ইমিগ্রেশন কেইস, ওর কাছে কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই।

আমতা আমতা করে বললাম, “দেখো, রোজার মাস, আমি শুক্রবারে নামাজ মিস্ করতে চাই না। নামাজের আগে শেষ করতে পারবে?

অফিসার বললো, “মিঃ আলম, তুমি যদি হেল্প না করো তাহলে সোমবার পর্যন্ত তাকে পুলিশ হেফাজতে থাকতে হবে। এর আগে আমরা কোনো দোভাষী পাচ্ছি না, তুমি কি চাও তোমার জাতি ভাই পুলিশ স্টেশন থাকুক তিন দিন? প্লীজ আমাদেরকে হেল্প করো, আমরা যদি সন্তুষ্ট হই তাহ‌লে তাকে ছেড়ে দিতেও পারি নাহলে ডিপোর্ট করবো। প্লীজ এলাউ আস্ ট্যু ফেচ্ ইউ। ”

আমি বললাম, “ঠিক আছে গাড়ি পাঠাও কিন্তু, নামাজের আগে অবশ্যই শেষ করতে হবে। ” মনে মনে ভাবলাম আমার সামান্য কষ্টের জন্য একজন বাঙালি ভাই জেলে যাবে – এ আমি হতে দিতে পারিনা।

– তুমি কোনো চিন্তা করো না, আমরা তোমাকে নিয়ে যাবো, কাজ শেষে আবার নামিয়ে দিয়ে আসবো, অবশ্যই নামাজের আগে কাজ শেষ হবে।

ক্যাপ্টেন নিজেই আসলো গাড়ি নিয়ে। জিজ্ঞেস করলাম আমার ফোন নাম্বার কোথায় পেয়েছো? জবাবে বললো একজন এডভোকেট দিয়েছেন এবং বলেছেন তুমি রাজি না হলে উনার রেফারেন্স দিতে। তুমি রাজি হয়েছো এজন্য তোমাকে ধন্যবাদ।

পুলিশ স্টেশন গিয়ে দেখি বেশ জটিল পরিস্থিতি। শুধু ইমিগ্রেশন নয়, আসলে চারটি ডিপার্টমেন্টের জয়েন্ট অপারেশন। রেভিনিউ, এন্টি করাপশন, হিউম্যান রাইটস এবং ইমিগ্রেশনের যৌথ অভিযান। যাকে ধরে নিয়ে এসেছে তাকে আমি চিনি না। লোকটি নতুন এসেছে ২/৩ মাস হলো। অবৈধ পথে বর্ডার জাম্প করেছে, কোনো কাগজপত্র নেই। যার কাছে উঠেছে তাকে আমি চিনি, বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে আমাদের। লোকটি আবার উনার ছোটবেলার বন্ধু।

এক‌টি ইন্টারনাল হল রুমে বসেছি, চতুর্দিকে সিসি ক্যামেরা লাগানো। যৌথ বাহিনীর অফিসার ইন্ চার্জ বললো, “সব কথোপকথন রেকর্ড করা হবে, সে যদি আমাদেরকে সন্তুষ্ট করতে পারে তাহলে আমরা ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্টকে অনুরোধ করবো তাকে ছেড়ে দেবার জন্য।”
আমাদের কিছু তথ্য দরকার, সে যার কাছে থাকে তার বিষয়ে আমাদের কাছে ইনফরমেশন আছে- সে মানব পাচার করে, অবৈধ সিগারেট বিক্রি করে এবং হিউম্যান ট্রাফিকিং এর বেশ বড় লাইনের সাথে জড়িত। এই লোক যদি আমাদেরকে সব তথ্য দিতে পারা তাহলে তাকে ছেড়ে দিবো।

শুরু হলো ইন্টারভিউ। যৌথ বাহিনীর প্রশ্ন বাংলায় অনুবাদ করি, আসামীকে জিজ্ঞেস করি আবার আসামীর বক্তব্য অনুবাদ করে তাদেরকে বুঝিয়ে দেই। সবকিছু রেকর্ড হচ্ছে। বাঙালি যাতে করে ভয় না পায়, এবং চিন্তাভাবনা করে উত্তর দেয় – এসম্পর্কে একটু ব্যাখ্যা দিলাম। বললাম সত্যি কথা বলতে।

হঠাৎ এক অফিসার আমাকে বললো, ” মিঃ আলম, প্লীজ ট্রান্সলেট ইট, ডোন্ট ইন্টারপ্রিট। অর্থাৎ ওরা আসামীর বক্তব্য হুবুহু, অপরিবর্তিত দেখতে চায়। আমাকে ইন্টারপ্রিট না করে শুধু ট্রান্সলেইট করে দিতে বলছে। মনেমনে ভাবলাম আমাদের বাঙালিদের তো ইন্টারপ্রিটেশনের আগ্রহ প্রবল। ভালোই করেছে, ওয়ার্নিং না দিলে হয়তো আমিও অনুবাদ না করে ইন্টারপ্রিট করে বসতাম। আমরা তো যে কারো কথা শুনেই ইন্টারপ্রিট করে বসি সত্য মিথ্যা যাচাই না করেই। কখনো জানতে চাই না সে যা বলেছে আর আমরা যা বুঝেছি তা এক কি না? নিজস্ব, মনগড়া ব্যাখ্যা দেবার বদভ্যাস আমাদের সহজাত।

মিটিং এর দৈর্ঘ্য বাড়তেই থাকলো। আমার আর জুমআ’র নামাজে যাওয়া হলো না। দীর্ঘ বৈঠকের পর ওরা সন্তুষ্ট হয়ে আসামীকে পেনাল্টি দিয়ে ১৫ দিনের একটি নোটিশ ধরিয়ে দিলো, পনেরো দিনের মধ্যে বৈধতার প্রমাণ দাখিল করতে হবে। হাফ্ ছেড়ে বাঁচলাম, অন্তঃত ডিপোর্টতো করেনি। গরীব মানুষ, মনে অনেক আশা নিয়ে অবৈধ পথে চলে এসেছে ; ডিপোর্ট করলে পুরো পরিবার হয়তো বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তো! এক ধরনের একটি তৃপ্তি নিয়ে লোকটাকে মুক্ত করে চলে আসলাম।

২/৩ মাস পর হঠাৎ শুনতে পেলাম সেই লোকটি মারা গেছে হার্ট এ্যাটাক করে। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। পুলিশের হাত থেকে যাকে কেড়ে নিয়ে আসলাম প্যাঁচাল পেড়ে আজ মৃত্যু তাকে কেড়ে নিলো আমাকে ইন্টারপ্রিটেশনের জন্য না ডেকেই।

এমনই এক রোজার শুক্রবার ছিলো সেদিন, আজ আরেক রোজার শুক্রবার লোকটির চেহারা বারবার মনের পর্দায় উঁকি দিচ্ছে যদিও জানি মৃত্যুর স্বাদ আমাদের সবাইকেই নিতে হবে।

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং প্রবাসী বাংলাদেশী,  সাউথ আফ্রিকা

 

আরও পড়ুন