অসম বিয়ে

মনসুর আলম

প্রবাসীদের খুবই জটিল একটি ব্যক্তিগত সমস্যা রয়েছে। সমস্যা অনেক, তবে এটিকেই আমি সবচেয়ে জটিল সমস্যা মনে করি। সেটি হলো সময়মতো বিয়ে করতে না পারা। একবার বিদেশে চলে আসলে বিয়ে করতে দেরী হয়েই যায়। সবকিছু গোছগাছ করে, মোটামুটি একটু স্যাটেল হতে বেশ কিছুটা সময় চলে যায়। এরপর যখন দেশে যান বিয়ে করতে বয়স চল্লিশোর্ধ্ব। আমি অনেককে দেখেছি ৪৫+ বয়সে বিয়ে করতে। বেশি বয়সে বিয়ে করার একটি জটিলতা তো আছেই। তারচেয়ে আরো ভয়াবহ সমস্যা হচ্ছে কম বয়সের মেয়েদেরকে বিয়ে করা। অসংখ্য, অসংখ্য বিপর্যয় দেখেছি আমার জীবনে শুধু অসম বয়সের বিয়ের কারণে। কিছুকিছু বিপর্যয় দেখেছি খুবই লজ্জাজনক, অনৈতিক। অনৈতিক বিষয়গুলোকে পাশ কাটিয়ে শুধু সমস্যার তীব্রতা বুঝাতে যেটুকু প্রয়োজন সেটুকুই লিখবো। অনেকগুলো বিয়ে দেখেছি তাসের ঘরের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে গেলো। কয়েকটি ছেলে অপমান সহ্য করতে না পেরে মানসিক রোগী হয়ে গেলো চোখের সামনে।

খুবই কাছ থেকে দেখা দুটি ঘটনার কথা বলি:

এক – একজন পুরুষ ডিগ্রী পাশ করে জীবন সংগ্রামে চলে গেলেন মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে। সেখানে আঠারো বছর কাটিয়ে উনি দেশে গিয়ে বিয়ে করার সুযোগ পেলেন। ৪০/৪২ বছর বয়সে বিয়ে করলেন অর্ধেকের চেয়েও কম বয়সের ইন্টার পড়ুয়া এক মেয়েকে। উনার তো তাড়া আছে তাই বিয়ের এক মাসের মাথায়ই বউ প্রেগন্যান্ট হলো। এত বছর বিদেশে থেকে দেশে গিয়ে কিছু করার নেই। তাই প্রেগন্যান্ট বউকে রেখেই আবার পারি জমালেন সাউথ আফ্রিকায়। কিছুদিন পর কন্যা সন্তানের বাবা হলেন। মেয়ে বড় হয়ে হাঁটাচলা শিখে ফেলেছে কিন্তু, উনি দেশে যেতে পারছেন না। প্রতি মিনিটে স্থানীয় মূদ্রায় ৫/৬ টাকা খরচ করে টেলিফোন করতে হয়। সপ্তাহে দুদিন তিন থেকে চার মিনিট করে দেশে কথা বলেন। এরচেয়ে বেশি সময় কথা বলার আর্থিক সক্ষমতা নেই। আজ থেকে বারো বছর আগের কথা বলছি। বেশিরভাগ সময়ই মেয়ে কী করে, মেয়ের মুখ থেকে দুই একবার আব্বু ডাক শুনতে শুনতেই কার্ড শেষ। কিশোরী বউয়ের কি এতে মন ভরে?

আমি বললাম- ভাই, আপনি মুকুলের গায়ে হাত বুলাতে গিয়েতো গাছ মেরে ফেলছেন। আপনি সারাক্ষণ মেয়ের খোঁজ খবর নিতে গিয়েই আপনার কার্ড শেষ হয়ে যায়। সেই মেয়ে ধরলো যে গাছে সেই গাছের তো কোনো খবর আপনি নিচ্ছেন না। তার অনুভূতি প্রকাশের কোনো সুযোগই আপনি দিচ্ছেননা। দুই একটা সুখ দুঃখের আলাপ করবেন, তার মনের খবর নিবেন, রোমান্টিক কথা বলবেন সে সুযোগই আপনার নেই। কিশোরী একটা মেয়ে কীসের আশায় বসে থাকবে?

শেষ পর্যন্ত উনি বাধ্য হয়ে স্ত্রী, কন্যাকে সাউথ আফ্রিকা নিয়ে আসলেন। প্রতিটি মুহুর্তে ঝগড়া ঝাঁটি লেগে আছে। বেশিরভাগই অবিশ্বাস থেকে শুরু। সেই নারী প্রতি মুহুর্তে স্বামীকে মনে করিয়ে দেন, ” তুমি বুড়া, আমি দয়া করে তোমাকে বিয়ে করেছি। আমার মতো সুন্দরী মেয়ে তোমার মতো বুড়াকে বিয়ে করেছি কেন? আমার কথামত চলবে নাহলে তোমার ইজ্জতের বারোটা বাজিয়ে দিবো। মা/ বাবার এহেন কর্মকাণ্ডে বাচ্চা মেয়েটি দিশেহারা হয়ে আমাদের কাছে এসে আশ্রয় নেয়। এটি খুবই নিয়মিত ঘটে।

দুই – আরেকজন ৪৪ বছর বয়সে বিয়ে করেছেন ১৬ বছরের এক মেয়েকে। দুই সন্তানের জন্ম দেবার পরও স্বামীর বয়স যখন ৫২ স্ত্রীর বয়স তখন মাত্র চব্বিশ। তিনি আবার সুন্দরীও। তিনি প্রকাশ্যে বলেন বুড়া ব্যাটাকে বিয়ে করেছি পায়ের উপর পা তুলে বসে খাবার জন্য। আমার ইচ্ছে মতো চলতে হবে নাহলে এখনও অনেক পুরুষ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন আমার জন্য। এইসব কথাগুলো তিনি ক্যাজুয়াল আলাপে নিয়মিত বলেন, আমাদের সামনেই বলেন। ভেতরের সমস্যা আরো কত জটিল সে সম্পর্কে ধারণা থাকলেও প্রকাশ করতে পারছিনা।

উভয় ক্ষেত্রেই যতটা সম্ভব ভদ্রতা বজায় রেখে ঘটনার বর্ননা করেছি। বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ।

আমার অবজার্ভেশন হচ্ছে: এই বিপর্যয়ের পেছনে আসলে মেয়েদের ভূমিকা খুবই নগন্য। ওদেরকে আমি খুব অল্প পরিমাণে দায়ী করি।

প্রথম দায়ভার হচ্ছে গার্ডিয়ানদের। মেয়েকে বিয়ে দেবার আগে তার মতামতের কোনো তোয়াক্কা না করেই বিয়েকে চাপিয়ে দিয়ে প্রথম আঘাতটা মা/বাবাই করেন। স্বামীর সাথে বয়সের এই বিশাল তফাৎ- এটি যে কত মারাত্মক সে সম্মন্ধে কোনো চিন্তাই নেই উনাদের মানসে। কোনরকমে ঝেড়ে ফেলে দিতে পারলেই হাফ ছেড়ে বাঁচেন, বোঝা হালকা হলো। উনারা কি মেয়েদেরকে কম ভালোবাসেন? মোটেই না। উনারা অনিশ্চয়তায় ভুগেন এবং পরিণতি সঠিকভাবে বুঝতে পারেন না।

দ্বিতীয় দায়ভার হচ্ছে স্বামী নামক পুরুষটির। আপনি জেনেশুনে একটি বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করলেন কিন্তু, তাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করলেন না। একটি কলিকে ঠিকমতো ফোটার আগেই তারের জাল দিয়ে বেঁধে ফেললেন। এরপর বললেন সৌরভ ছড়াও, আমার পুরো পরিবারকে আলোকিত করে ফেলো। হাস্যকর! বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করার সময় লজ্জা পেলেন না কিন্তু, তার সাথে লুতুপুতো করতে লজ্জা লাগে! সে একটু রোমাঞ্চকর সময় চায়, হাত ধরে ঘুরতে চায়। এক‌টি আইসক্রিম খেতে বাইরে যেতে চায়। মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে বেড়াতে চায়। তার সময়টিই এরকম। এই চঞ্চলতা স্বাভাবিক এবং ন্যাচারাল। আপনিও এই বয়সে এমনটা ছিলেন। তার কোনো অনুভূতিকে গুরুত্ব দিলেননা, বিয়ের পরদিন থেকেই সন্তান উৎপাদনের মেশিন হিসেবে ট্রিট করা শুরু করলেন! নিজের মা/বাবার কাছ থেকে আঘাত খেয়ে এসে আপনার কাছে সহানুভূতি না পেয়ে উল্টো ঠোকর খেলো। কিশোরী একটি বালিকা টোটাল কনফিউজড হয়ে ক্ষতবিক্ষত, বিধ্বস্ত হয়ে সব চেপে গেলো। অল্প দিনের মধ্যেই আপনি উড়াল দিলেন কিংবা বিদেশে নিয়ে আসলেন। সে একা হোক কিংবা আপনাকে একা পেয়ে তার অবচেতন মনে সেই ক্রোধ কয়েকগুণ বর্ধিত হয়ে বিস্ফোরন ঘটায়। আপনাকে সামাজিক, মানসিক হেনস্তা করে একটি শোধ নেবার প্রচেষ্টা সে চালিয়ে যায়। তার ভেতরে এই ক্রোধ আপনি তৈরী করে দিয়েছেন।

বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলেছি, স্বামী/ স্ত্রীর সম্পর্ক সুন্দর, স্বাভাবিক করে দেবার চেষ্টা করেছি। যতটা সম্ভব মোটিভেইট করার চেষ্টা করেছি। কিছু ক্ষেত্রে সফল হয়েছি আবার ব্যার্থতাও আছে অনেক। ৫৫+ একজন মানুষ এসে পা ধরে বসে গেছেন এই বলে যে, “প্লিজ আমাকে রক্ষা করো, আমার সংসারটিকে বাঁচিয়ে দাও, আমার মেয়েটার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে।” উনার কিন্তু টাকাপয়সার কোনো অভাব ছিলোনা বরং প্রয়োজনের চেয়ে বেশিই ছিলো। শেষ পর্যন্ত পারিনি শেষ রক্ষা করতে। এই কষ্ট বর্ননাতীত। চোখের সামনে একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়া, বিশেষ করে বাচ্চাদের উপর যে মানসিক টর্চার হয় সেটি নিজ চোখে দেখে সহ্য করা খুবই কষ্টকর। নিজেকে অসহায় লাগে।

কয়েকজন নারীর অনুভূতি জানার চেষ্টা করেছি। উনাদের ভাষ্য অনুযায়ী উন্মুক্ত বিশ্বের সব খবরাখবর উনাদের জানা। মিডিয়ার কল্যাণে উনারা অনেক কিছুই জানেন, নাটক, সিনেমা দেখেন। সমাজে যখন দ্বিগুণের চেয়ে বেশি বয়সের কাউকে স্বামী হিসেবে পরিচয় দিতে হয়, উনারা হীনমন্যতায় ভুগেন। কেউ কেউ লজ্জা পান। অন্য কোনো সমবয়সী, রোমান্টিক জুটি দেখলে নিজের সাথে তুলনা করা শুরু করে দেন। তার উপর মধ্যবয়সী লোকটি যখন প্রয়োজন মতো সাড়া না দেয়, যথেষ্ট পরিমাণ মনযোগ না দেয় তখন উনারা অপমানিত বোধ করেন। নিজের অজান্তেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে যায়। আরেকটি মারাত্মক বিষয় উন্মোচিত হয়েছে। অন্তঃত চারজন নারী আমাকে বলেছেন যে, সমাজের সামনে আসলেই তাদের মনে হয় মা/বাবা ভাতের অভাবে তাদেরকে বুড়া ব্যাটার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন। সেই অপমান ঢাকতেই উনারা স্বামীকে অপমান করেন। দেখাতে চান স্বামী বেচারা অনেক অসহায় উনাদের যৌবনের সামনে, রুপের সামনে। প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করে গঠনমূলক বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা অর্জন করার আগেই সর্বনাশ যা হওয়ার তা হয়ে যায়।

অনেক ঘটনা দেখেছি, এখনো দেখছি ; পুরো পরিবার তছনছ হয়ে যেতে দেখেছি একেকটি ভুল বিবাহ সম্পর্কের কারণে। অনেকেই দেশে যায়, বলে যায় দেশে যাচ্ছে বিয়ে করবে। কেউ কেউ টিকেট কেনার ব্যাপারে সহযোগিতা চায়, কেউ কেউ বিয়ের পরে বউকে নিয়ে আসার প্রসেসিং নিয়ে জানতে চায়। নানাবিধ কারণে মানুষের সাথে যোগাযোগ হয়। ভাবের আদান প্রদান হয়। অনেকে আবার নিরাপদ মনে করে দুঃখ প্রকাশ করে নিজেকে হালকা করতে চায়।

আমার পরিচিত মহলে সবসময় আমি একটি কথা বলি- ভাইয়েরা,বাবারা তোমরা বয়সের বেশি পার্থক্য হয় এমন কাউকে বিয়ে করোনা প্লিজ। যতটা সম্ভব কাছাকাছি বয়সের কাউকে বিয়ে করো। উনারা অবশ্য ভিন্ন একটি সমস্যার কথা বলেন এবং সত্যি সত্যিই সেটি আরো প্রকট সমস্যা। চল্লিশোর্ধ্ব একজন প্রবাসী যখন বিয়ে করার জন্য দেশে যায় তখন তার কাছাকাছি বয়সের কাউকে অবিবাহিত পাওয়া যায়না। দেশে মেয়েরা এত বয়স নিয়ে অবিবাহিত থাকেনা। দুই একজন যাদেরকে পাওয়া যায় তারা উচ্চ শিক্ষীত এবং প্রবাসী দেখলে নাক ছিটকায়। সেই নাক ছিটকানোর ও যথেষ্ট গ্রহনযোগ্য কারণ রয়েছে। ফলাফল অর্ধেকের চেয়েও কম বয়সের কোনো মেয়েকে বিয়ে করে বসে। ১৮/২০ বছর বয়সের একটি মেয়েকে বিয়ে করে তার আবেগ অনুভূতি বুঝতে পারেনা, অনেকেই আবার বুঝার চেষ্টাও করেনা। একবারও ভাবেনা নিজের বিশ বছর বয়সে তার অনুভূতি কেমন ছিলো? ভালোলাগার বিষয়গুলো কোন ধরনের ছিলো। কতটা সংবেদনশীল ছিলো তার অনুভূতি? কেমন ব্যবহার আশা করতো মানুষের কাছে? পরিপক্ক বয়সে একটি কিশোরী মেয়েকে বিয়ে করে এনে তার কাছ থেকে পরিপক্ক আচরণ দাবি করা অত্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। দুই একটা ব্যতিক্রম ছাড়া বেশিরভাগই মানিয়ে নিতে অনেক সমস্যা হয়। তাছাড়া মরার উপর খরার ঘা হিসেবে পারিবারিক জটিলতা তো আছেই। অনেকেই আবার মাস দেড়মাসের মাথায় সদ্য বিবাহিত কিশোরী বউকে একা ফেলে আবার পাড়ি জমায় বিদেশে। ফলাফল যা হবার তা’ই হয়। পারিবারিক অশান্তি, বিশৃংখলা, পরকীয়ার মতো ঘটনা ঘটে অহরহ।

পুরুষদের মধ্যেও যথেষ্ট স্বার্থপরতা কাজ করে। অনেকে ইচ্ছে করে কম বয়সী মেয়ে বিয়ে করে। কোনো এক বিচিত্র কারণে আমাদের সমাজের পুরুষরা তালাকপ্রাপ্তা, বিধবা নারীদেরকে বিয়ে করতে চায়না। এদেরকে অচ্যুত মনে করে। নিজে তালাকপ্রাপ্ত কিংবা বিপত্নীক হয়েও বিয়ে করার জন্য কুমারী মেয়ে খোঁজে। এক্ষেত্রে পুরুষদের এই হিপোক্রেটিস এটিটিউডের সাথে অজ্ঞতাও দায়ী বলে মনে করি। খুবই দুর্বল মানসিক সংস্কার আমাদের পুরুষ সমাজকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এই যদি হয় আমাদের মানসিকতা একবার ভাবুনতো- আমার বোন কিংবা মেয়ে যদি কোনো কারণে তালাকপ্রাপ্তা অথবা বিধবা হয় তাকে দ্বিতীয় বিয়ে দেবার জন্য আমি মানানসই পাত্র কোথায় পাবো? ভাবতে থাকুন, প্রতিটি পুরুষ নিজেকে এই প্রশ্ন করুন।

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও প্রবাসী বাংলাদেশী,  সাউথ আফ্রিকা।

আরও পড়ুন