আমার ভারত

পিনাকী রঞ্জন বিশ্বাস

রাজস্থানের বারান জেলায় প্রত্যন্ত এক গ্রাম, নাম মামনি | সামান্য কিছু লোকের বাস | প্রধান মন্ত্রীর সড়ক যোজনায় এ গ্রামের ওপর দিয়ে ২০০৬ সালে তৈরী হচ্ছে রাজস্থান থেকে গোয়ালিয়রে যাতায়াতের জন্য বিশাল হাইওয়ে | বসেছে BSNL টাওয়ার, তৈরী হচ্ছে থানা, স্বাস্থ্য কেন্দ্র | কর্ম জীবনের প্রচন্ড ব্যস্ততায় কোন দিন খোঁজ করার প্রয়োজন বোধ করিনি কেন এবং কিসের জন্য এ গ্রামটির উন্নয়ন করা হচ্ছে | এখানেই জরুরী ভিত্তিতে BSNL এর একটি BTS SHELTER install করতে হবে | ডাক পরল আমার | ছিলাম রাজস্থানের রাজধানী জয়পুর শহরে | হঠাৎ খবর পেয়ে রাতেই বাসে করে রওয়ানা হলাম কোটা শহরে | ভোর বেলা কোটায় পৌঁছে বাস বদল করে দুপুর একটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম মামনিতে | বাতাসে আগুনের হালকা, মনে হচ্ছে ধুলোর কুয়াশা চারিদিকে | সাইট পর্যবেক্ষণ, মাপজোক এবং কর্মচারী যারা আসবে তারা কিভাবে কোথায় থাকবে তা দেখে ফিরে যাবো আবার কোটায় সেখান থেকে জয়পুর |

সব ঠিকই চলছিল বিপদ ঘনাল অন্য জায়গায় | এখানেই সাইট থেকে কিছুটা দূরে রাজস্থান সরকার গুর্জর আদিবাসীদের জন্য জমি দিয়েছেন | আমি যখন ড্রয়িং অনুযায়ী জমি পর্যবেক্ষণ করছিলাম তখন সেই গুর্জদের একটি বাচ্চা ছেলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেটা দেখছিল | গ্রামের নিষ্পাপ শিশু দেখে বড় মায়া হলো | সঙ্গে রাখা এক প্যাকেট বিস্কুট, অর্ধেক খাওয়া কেকের প্যাকেট আর একটা ছোট ক্যাডবেরি চকলেট ছেলেটির হাতে দিলাম | সে খুব খুশি হয়ে সব হাতে নিয়ে দৌড়ে চলে গেলো | আমি আমার কাজ গুছিয়ে তৈরী হচ্ছি ফেরার বাস ধরব বলে | এমন সময় সেই গুর্জর জনজাতির সর্দার গোছের কিছু লোক আমার কাছে এসে তাদের ভাঙ্গা হিন্দি মেশানো ভাষায় অনুরোধ করলো সরকার থেকে তাদের যে জমিটা দেওয়া হয়েছে তা একবার মেপে দিতে | বুজলাম সেই শিশুটি ফিরে গিয়ে আমার আমার কর্ম কান্ড নিয়ে কিছু বলেছে | এক প্রকার জোর করেই ধরে নিয়ে গেলো তাদের সদ্য পাওয়া জায়গায় |

কোন রকম ডালপালা কাপড় আর পলিথিন সিট দিয়ে তৈরী তাদের মাথা গোঁজার স্থান | তাদের সন্তুষ্ট করে ফিরে এলাম বাস স্ট্যান্ডে | ছোট্ট একটা বন্ধ চায়ের দোকান নাকি রাস্তার ধারে হটাৎ গজিয়ে ওঠা হোটেল কে জানে তার সামনে পাথরের একটা বেঞ্চের মতো ছিলো তাতেই বসে অপেক্ষা করছি বাসের জন্য, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে কখন বাস আসবে জানি না, পশ্চিমের এই রাজ্যে সন্ধ্যা মানে তো রাত আটটা | সন্ধ্যায় সেই দোকানদার এসে দোকান খুললেন | অপরিচিত পরদেশী আমায় বসে থাকতে দেখে জানতে চাইলেন কেন বসে আছি | তাকে সব ঘটনা বললাম, তিনি শুনে এক রকম মাথায় হাত দিয়ে বসলেন | আমি ফিরে আসার একটু আগেই আজকের শেষ বাস চলে গেছে | পরের বাস কাল সকালে | প্রমাদ গুণলাম |

মাঝ বয়েসি সেই দোকানদার আমায় ভরসা দিলেন | বললেন বাবু, আমি রাতে আপনার জন্য রুটি সব্জী করে দিচ্ছি আপনি খেয়ে আমার দোকানের ভেতর একটা বিছানা আছে তাতে শুয়ে পড়ুন | কি আর করা! উপায়ন্তর নেই দেখে রাজি হয়ে গেলাম | আমাকে সে তার বিছানাটি ছেড়ে দিয়ে নিজে মেঝেতে গমের খড়ের ওপর একটা চট পেতে শুয়ে পড়ল | বিছানা আর বালিশের বর্ণনা দিলাম না, দিলে হয়তো অনেকেরই দুপুরের বা রাতের খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে | গত রাত জাগা, দীর্ঘ বাস জার্নি, ক্লান্ত শরীর বিছানায় পরা মাত্রই চোখে ঘুম নেমে এলো | খুব ভোরে উঠে প্রাতের কাজ সম্পন্ন করে এসে দেখি সেই দোকানদার আমার জন্য চা বানিয়ে রেখেছেন | খুশি মনে তা গ্রহণ করে তার হিসাব মেটাতে চাইলাম | তিনি গত রাত্রের রুটির দাম বা সকালের চায়ের দাম কিছুতেই নিলেন না | দু হাত দিয়ে নিজের কান ধরছেন আর শুধু বলে চলেছেন আপনি বিপদে পড়েছেন আপনি পরদেশী অতিথি আপনার কাছ থেকে আমি কিছুই নিতে পারবো না | বাস এসে গেছে নিজে বাস দাঁড় করিয়ে তার স্থানীয় ভাষায় কন্ডাক্টরকে বলে দিলেন আমায় যেন একটা ভালো সিটে বসিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় |
তাকে মুখে ধন্যবাদ আর মনে মনে প্রণাম জানালাম, বাস আমায় নিয়ে এগিয়ে চলল আমার গন্তব্যে | চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে উঠলো আমার সত্যিকারের ভারতবর্ষের চিত্র |

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক, কলকাতা, ভারত 

আরও পড়ুন