একদিনের বাবুর্চি

মনসুর আলম

সকালবেলা প্রথম ক্লাসটি শেষ করার সাথে সাথেই স্কুলের দপ্তরী প্রিন্সিপালের চিরকুট নিয়ে আসলো। শীতের সকাল এমনিতেই একটু জড়সড় হয়ে বসি, তারউপর ধূ ধূ প্রান্তর। চতুর্দিকে কমপক্ষে দেড়/ দুই কিলোমিটার খোলা মাঠ, মাঝখানে স্কুল। আশেপাশে বড় কোনো গাছও নেই, ছোটখাটো ঝোপঝাড় ছাড়া ফাঁকে ফাঁকে কয়েকটি কাঁটাযুক্ত বাবলা গাছ রয়েছে যা প্রকৃতির দান। কনকনে শীত, সকালবেলার ঠাণ্ডা বাতাস; বাতাসের তীব্রতা এতটাই বেশী যে আমাদের কালবৈশাখী ঝড়ের সাথে তুলনা করা যায়। প্রচণ্ড এই বৈরী আবহাওয়ায় মাইনাস তাপমাত্রার শীতের সকালে দরজা, জানালা খুলে ক্লাসরুমে বসা অসম্ভব। সব দরজা, জানালা বন্ধ করে সাথে নিয়ে আসা ফ্লাস্ক থেকে এক কাপ কালো কফি নিয়ে আয়েশ করে বসেছি। আমার ক্লাসরুম থেকে আমি চাইলে সারাদিন না বেরুলেও চলে। আমরা শিক্ষকরা নিজ নিজ ক্লাসরুমে থাকি, প্রতিটি ক্লাস শেষ হলে ছাত্রছাত্রীরা অন্য ক্লাসরুমে যায় এবং যাদের সাথে আমার ক্লাস রয়েছে ওরা আমার ক্লাসরুমে আসে। টানা এক ঘন্টা আমার কোনো ক্লাস নেই তাই কফি নিয়ে বসা।
প্রিন্সিপালের চিরকুট পেলাম জরুরী মিটিং। কোনরকমে কাপের কফিটুকু গলায় ঢেলে দৌড় দিলাম কমনরুমের দিকে। বাতাসের ধাক্কায় মনে হচ্ছে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। তীব্র হাওয়ার সাথে যুদ্ধ করে শীতে কাঁপতে কাঁপতে কমনরুমে পৌঁছলাম। মিটিং শুরু হলো একটি দুঃসংবাদ দিয়ে। আমাদের রান্নাঘরের স্টাফ তিনজন যে গাড়িতে যাওয়া আসা করে সেই গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছে। তিনজনই আহত তবে খুব সিরিয়াস কিছু নয়। হাসপাতালে আছে, প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হবে। আজ আর কাজে আসতে পারবেনা। আমাদের সমস্যা হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের দুপুরের খাবার কীভাবে রান্না হবে? গ্রামের বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরাই দরিদ্র, অনেকেই আছে স্কুলে আসে শুধু দুপুরের খাবার পাবার আশায়। সরকার এই নিউট্রিশন স্কিমের পেছনে অনেক টাকা খরচ করে। আমাদেরকে ট্রেনিং ও দিয়েছে। সেবছরের নিউট্রিশন কমিটির তিন জন সদস্যের মাঝে আমিও একজন। এই অনাহূত সমস্যাটি যতটা না পুরো স্কুলের তারচেয়ে অনেক বেশী মাথা ব্যথার কারণ হয়ে গেছে আমাদের জন্য যারা কমিটির সদস্য। পুরো স্কুলে আমিই একমাত্র পুরুষ শিক্ষক, বাকী সবাই নারী এমনকি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভলান্টিয়ার হিসেবে আসা পিস্ কপ্- সেও নারী। প্রশ্ন একটাই – বাচ্চাদের খাবার কীভাবে রান্না হবে?
আমার তো এমনিতেই রান্নাবান্নার অভ্যাস রয়েছে, সেই ছাত্রজীবন থেকেই রান্না করি। প্রবাসজীবনে রান্না না করে কোনো উপায় নেই। নিজের জন্য রান্না করা আর স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য রান্না করা ভিন্ন কথা। আমার ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি সেদিন ২৩২ জন। একেতো কমিটির সদস্য তারউপর স্কুলের একমাত্র পুরুষ শিক্ষক – আমার জন্য বিষয়টি অনেক বেশী চ্যালেঞ্জিং। বাচ্চাদের ক্ষুধার্ত চেহারা সহ্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত নিলাম রান্না করবো। আমার প্রিন্সিপালসহ অন্যান্য সহকর্মীরা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে আমার দিকে থাকালেও সবাই একপায়ে দাঁড়িয়ে গেলো আমাকে সহযোগিতা করার জন্য। দুজন এসিট্যান্ট নিলাম আর প্রত্যেক ক্লাসের ক্যাপ্টেনদেরকে সাথে নিলাম। শুরু হলো যজ্ঞ।
পুষ্টি বিষয়ক ওয়ার্কশপে আমাদেরকে শেখানো হয়েছে কীভাবে সুষম খাবার দিতে হবে। সপ্তাহের কোন দিন কোন ধরনের খাবার দেয়া হবে তার একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। প্রতিদিন অনলাইনে গিয়ে নির্দিষ্ট প্রতিবেদন দাখিল করতে হয়। সবজির রঙ মিক্স করা যাবেনা। যেদিন সবুজ সবজি রান্না হবে সেদিন লাল কিংবা অন্য কোনো রঙের সবজি দেয়া যাবেনা কিংবা যেদিন হলুদ সবজি রান্না হবে সেদিন সবুজ কিছু দেয়া যাবেনা ইত্যাদি। একটানা দুদিন পাউরুটি দেয়া যাবেনা কিংবা টানা দুদিন ভাত দেয়া যাবেনা। আগেরদিন ভাত দেয়া হয়েছিল তাই সেদিন আমি পাউরুটি দিতে পারবো। রান্না করলাম বাঁধাকপি ভাজি আর বরবটি দিয়ে টিনজাত মাছ সাথে আছে ব্রাউন ব্রেড। প্রিন্সিপাল এসে বললেন, “আজকের দিনে কি আমাদের জন্য নিয়ম ভাঙা হবে?”
নিউট্রিশন স্কিমের খাবার শুধুমাত্র ছাত্রছাত্রীদের জন্য। শিক্ষক কিংবা অন্য স্টাফ মেম্বাররা এই খাবার খেতে পারবেননা। প্রিন্সিপাল এসে বললেন খাবারের ঘ্রাণে কমনরুমে বসে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আজকের দিনে বিশেষ বিবেচনায় নিয়ম ভঙ্গ করে তাদেরকে খাবার দেবার জন্য অনুরোধ করলেন যদি আমার আপত্তি না থাকে। আমি ধরে নিলাম আমাকে খুশী করার জন্য এই বিনয় দেখানো হচ্ছে। আমি প্রিন্সিপালকে বললাম, “অবশ্যই আপনাদেরকে খাবার দেয়া হবে, তবে আমাকে খুশী করার জন্য মিছেমিছি খাবারের ঘ্রাণের প্রশংসা করার দরকার নেই। এটি আমার দায়িত্ব – আমি উপস্থিত থাকা অবস্থায় আমার বাচ্চারা খালি পেট নিয়ে ক্লাসরুমে ঝিমুতে পারেনা। এই দৃশ্য সহ্য করার শক্তি আমার নেই।” রান্না জীবনে অনেক করেছি কিন্তু, সেদিনের মতো শান্তি আর কোনদিন পাইনি। বাচ্চাদের এই চেটেপুটে খাওয়া দেখে মনে হচ্ছিল শিক্ষকতা ছেড়ে বাবুর্চির চাকরি নেই – প্রতিটি বাচ্চার চেহারায় কৃতজ্ঞতার ছাপ। আহা কী প্রশান্তি!
পরের সপ্তাহে গভর্নিং কমিটির মিটিং এ আমাকে ডেকে বিশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হলো। তাদের বক্তব্য হচ্ছে একজন পুরুষ, একজন বিদেশি তাদের বাচ্চাদেরকে স্কুলে রান্না করে খাওয়াবে এটি ওনারা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ধুম পরে গেলো।
আমার জন্য বিশেষ চমক অপেক্ষা করছিল বছরের শেষ কোয়ার্টারে। স্কুলের award ceremony এর দিন। এদিন আমরা ছাত্রছাত্রীদেরকে বিভিন্ন ধরনের সার্টিফিকেট, ক্রেস্ট, পুরস্কার প্রদান করে থাকি। একাডেমিক ফলাফল ছাড়াও ডিসিপ্লিন, উপস্থিতি, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতাসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার প্রদান করা হয়। হঠাৎ করে প্রিন্সিপাল ঘোষণা করলেন, “এই বছর থেকে আমরা নতুন একটি পদক চালু করতে যাচ্ছি – দ্যা মোস্ট প্রমিন্যান্ট টিচার এন্ড The award goes to Mr Alam।”
আমার আর বুঝতে বাকী রইলো না এই পুরস্কারের কারণ ‘একদিনের বাবুর্চি’!

লেখকঃ সাহিত্যিক ও সাউথ আফ্রিকা প্রবাসী 

আরও পড়ুন