জাপানের খাওয়া দাওয়া

আশির আহমেদ

কুইজ। কইঞ্চেন দেহি-
পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি স্বাদ কোন দেশের খাবার?
খাওয়া দাওয়া তে সবচেয়ে বেশি পয়সা খরচ করে কোন দেশ?
খাবারের ভেরিয়েশন কোন দেশে সবচেয়ে বেশি?
কোন দেশের খাবার সবচেয়ে স্বাস্থ্যসম্মত?
জাপানে আসার আগে আমার ধারণা ছিল জাপানিরা শুধু সাপ ব্যাঙ আর কাঁচা মাছ খায়। এই ধারনা পরিবর্তন হতে যথেষ্ট সময় নিল। জাপানি খাবার পরিচয় করিয়ে দেয়ার মত লোক ও ছিলনা। আর নিজ থেকে আবিষ্কার করবো সেই সুযোগ ও ছিলনা।
যেদিন জানলাম সেদিন বুঝলাম –
রান্না একটা আর্ট,টেকনোলজি;
খাওয়া একটা ম্যানার,সংস্কৃতি;
খাবার একটা শিল্প, ঐতিহ্য।
বলে রাখি ২০১৩ সালে জাপানিজ খাবার ইউনেস্কো হেরিটেজ (ঐতিহ্য সম্পত্তি) এ জায়গা দখল করেছে[১]।

 

জাপানের হোস্টেলের খাওয়া
আন্ডারগ্র্যাডের প্রথম দুটো বছর কাটল একটা জাপানিজ ডরমিটরি তে। হোস্টেলের খাবার নিয়ে অভিযোগ দেশে ও ছিল, এখানে ও আছে। দেশের হোস্টেলের ডালের ঘনত্ব বা মাইক্রস্কোপিক মাংসের সাইজ নিয়ে কথা উঠতো। কিন্তু স্বাদ নিয়ে কোন কথা উঠেনি।
এখানকার অভিযোগ পরিমাণে নয়, স্বাদে।
জাপানের ডরমিটরির এক জাপানিজ বড় ভাই আক্ষেপ করে বলেছিলেন- ওয়ার্স্ট ক্লাসের রান্না করতে ও একটা স্কিল লাগে- আর আমাদের ডরমিটরির বাবুর্চিদের সেই স্কিল আছে।

 

যখন রান্না করতে শিখেছি তখনকার কথা। আমার একটা ক্লাসমেট ছিল নাম কানযাকি। ক্লাসের ফার্স্ট বয়। একটু অটিস্টিক টাইপের। ক্লাসে ওর কোন বন্ধুবান্ধব ছিল না। রবিবার গুলোতে ওর মায়ের পারমিশন নিয়ে আড্ডা দিতে আমার রুমে আসতো। ঠিক জমে উঠতো না। ওয়ান কোয়েশ্চেন ওয়ান আনসার টাইপের আড্ডা।
এক রবিবারে আমি ডাল আর চিকেন রেঁধে দাওয়াত দিলাম। যদ্দুর সম্ভব দেশের একটা গ্রাম্য আবহ তৈরি করলাম। মাদুরের পরিবর্তে টাওয়েল দিয়ে ফ্লোরে বসালাম। হাল্কা আওয়াজে রবীন্দ্র সঙ্গীত ও দিলাম। আসনপিড়ি দিয়ে খেতে বসলাম –
সে চেঁচিয়ে উঠলো। “আমার চপস্টিকস কই” ?
…আমরা তো হাত দিয়ে খাইরে ভাই।
“তোমাদের দেশে চপস্টিকস ও নেই”?
প্রশ্নে “ও” টা থাকা না থাকা আমার জন্য, দেশের জন্য ইজ্জতের ব্যাপার। মেজাজ টা খারাপ হলো। শিয়াল আর সারস পাখির গল্প টা মনে পড়লো।
হাত দিয়ে চিকেন খাওয়ার পর যখন ডাল খেতে যাবে – তখন একসেট চপস্টিকস ধরিয়ে দিলাম। ব্যাটা খা, সাধ্য থাকলে এবার চপস্টিকস দিয়ে ডাল খা। পরে এই আচরণের জন্য ক্ষমা চেয়েছি।

 

আমাদের এক সিনিয়র বাংলাদেশি ভাই। টোকিওর সশিগায়া ছাত্রাবাসে থাকতেন। ওনাদের কমন কিচেন। নিয়মিত রান্না করেন। ছাত্রাবাসের অন্যান্য বিদেশি ছেলেমেয়েরা রান্না করে ১০ মিনিটে। আর ওনার লাগে ঘন্টাখানেক। গোছানো লোক। মসল্লা রাখেন পিতল/কাঁসার তৈরি ছোট ছোট কৌটার মধ্যে। ট্রে তে করে এই কৌটাগুলো নিয়ে অনেকটা পূজা দেয়ার স্টাইলে রান্না ঘরে ঢুকেন।
এক কৌতূহলী অস্ট্রোলিয়ান ছেলে ওনাকে অব্জার্ভ করলো।
তরকারি বাগার দেয়ার দৃশ্যটা কল্পনা করুন। গরম তেলে পিয়াজ রসুন দিলেন। তারপর এই কৌটা ঐ কৌটা থেকে চামচ দিয়ে মেপে মেপে লাল, হলুদ, রঙ-বেরঙের মসল্লা দিলেন। পানি ঢালতেই ছ্যাঁত করে একটা আওয়াজ হলো। ভয়ে অস্ট্রোলিয়ানটা দুরে সরে গিয়ে বলল, হেই ম্যান, আর ইউ ডুইং এনি এক্সপেরিমেন্ট?

 

জাপানের রেস্টুরেন্টে খাওয়া
যেদিন থেকে আমি জাপানি খাবারের সুপার-ফ্যান হয়ে গেলাম সেদিনের ঘটনা বলি।
আমার এক সিনিয়র বন্ধু। নাম ইয়েনাগা। পেশায় ডাক্তার, দেখতে ছোট খাট কিন্তু ভীষণ ভোজন রসিক। খাওয়া দাওয়া নিয়ে ওনার গভীর পড়াশুনা। আমার গ্রাজুয়েশন উপলক্ষে আমাকে দাওয়াত দিলেন ওনার বেপ্পুর বাড়িতে। দুই দিন থাকতে হবে। লাঞ্চ খাওয়াবেন। বাড়িতে নয়- জাপানি ট্র্যাডিশনাল এক রেস্টুরেন্টে। বুকিং দিলেন, খেতে যাব পরদিন দুপুরে। জানিয়ে দিলেন তার বন্ধু আশিরু সান বাংলাদেশ থেকে আগত। পর্ক (শুকর), এলকোহল খাবেনা। বাকি মেন্যু আপনাদের ওপর। রেস্টুরেন্ট ওয়ালা এক এক করে প্রশ্ন করলেন – আমার কোন এলার্জি আছে কিনা, ফ্যামিলি তে ডায়েবেটিস আছে কিনা। এ সমস্ত ঢং দেখে মেজাজ খারাপ হচ্ছিল- আমার খাবার আমি খাব- আপনার এতো প্রশ্ন কেন?

 

পরদিন রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। স্বাগতম জানালেন কিমোনো পরিহিতা এক ভদ্র মহিলা। এস্কোর্ট করে নিয়ে গেলেন একটা বিশাল রুমে। মাঝখানে একটা টেবিল। ৩ টা চেয়ার। রুমের এক পাশে ইকেবানা সাজানো। একটু পরেই বুঝলাম এই রুম পুরোটাই আমাদের ৩ জনের জন্য। সামনে বনসাই গাছ, পাথর, পানি দিয়ে সাজানো ছোট্ট একটা সামুরাই বাগান।
মেন্যু নিয়ে আসলেন। এটা তো মেন্যু নয়, দেখে মনে হচ্ছে অনুষ্ঠান সূচি। কয়টার সময় কোন খাবার আসবে তার তালিকা।

 

ডাক্তার সাহেব আমার মেন্যু টা নিলেন, ওখানে আমার নাম লেখা। তার মানে আমার জন্য ইউনিক মেন্যু তৈরি হয়েছে। মেন্যুতে ৫ টা সেকশন। এপিটাইজার, স্টারটার, মেইন ডিস, ফ্রেসনার আর শেষে ডেজার্ট। প্রত্যেকটা সেকশনে আবার ২-৪ টা করে খাবারের নাম। সর্বমোট ১৫ টার মতো আইটেম।
যেনসাই (এপিটাইজার) এর মানে বুঝো?
…জ্বি। ক্ষুধা উদ্রেককারী খাবার। এমন ভাবে উত্তর দিলাম যেন গতরাতেই প্রশ্নটা ফাঁস হয়েছে।
দুজন মহিলা ঢুকলেন। একজনের হাতে ট্রে। ৩ টা বড় গ্লাস। গ্লাসের ৪ ভাগের এক ভাগ পানীয় দিয়ে ভর্তি।
নিন ওয়েলকাম ড্রিঙ্কস নিন।
..এটা কি?
“সারুবাত্ত”
..মানে কি?
“এটা তো বাংলা শব্দ”-বলেই কিমোনোর হাতপকেট থেকে একটা বই বের করলেন – ওখানে রোমান হরফে লিখা sura, sarbot। এই মহিলাগুলো সুপার কঠিন জাপানি ভাষায় কথা বলছে, বুঝতে পারছিনা।
ডাক্তার সাহেব ব্যাখ্যা করলেন। তোমাদের দেশে অতিথি আসলে নাকি সরবত দিয়ে স্বাগতম জানানো হয়?
..জ্বি, লেবুর সরবত।
লেবু নেই, সে বানিয়েছে ইয়ুযু ফল দিয়ে। ইয়ুযু এখানকার লোকাল ফল।
আমার মাথা নত হয়ে এলো। কাম্পাই আর বিসমিল্লাহ বলে এক ঢোকে ফিনিশ। কত বছর আগে এখলাসপুরে ফ্রেস লেবুর সরবত খেয়েছি। সেই স্বাদ থেকে একটু আলাদা। কি যেন আছে আবার কি যেন নেই। মনে হলো এই হাল্কা শীতল তরল পদার্থ জিহ্বা, গলনালী হয়ে পাকস্থলী পর্যন্ত প্রত্যেকটা ইন্দ্রিয়তে ছোঁয়া দিয়ে গেল।
ডাক্তার সাহেব বললেন- ইয়ুযুতে সিট্রাস আছে। সিট্রাস আমাদের এনজাইমগুলো কে জাগিয়ে দেয়। এনজাইম বোঝতো ?
জ্বি। পেপসিন, মিউসিন …। ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয় বলেই এর নাম এপিটাইজার।

 

দ্বিতীয় মহিলা ঢুকলেন এক ঝাঁক গরম খাবার নিয়ে। ভাজা জিনিস, ছোট ছোট ১০-১৫টি আইটেম। তেনপুরা জাতীয়। লবন দিয়ে খেতে হবে। সামুদ্রিক লবন নয়, পাহাড়ের পাথর ছেঁচে আনা লবন। সাদা লাল কালো মিশ্রিত কালারের। সাথে রসুন আকৃতির চার পাঁচ টা ভাঁজা শিমের বিচি। এর নাম গিননান। খাবার পরিবেশন করার সময় প্রত্যেক খাবারের একটা ব্যাকগ্রাউনড দিলেন- সবজি এসেছে অমুক গ্রামের অমুক কৃষক থেকে। তেল নিজেদের তৈরি। ফুলের বীচি থেকে বানানো তেল। সেই তেল দিয়ে ভাঁজা। কে রাঁধল, কিভাবে রাঁধল …এসব ধারাবাহিক বর্ণনা।
এসবের মানে কী?
এটা কি ক্লাসরুম?
প্রত্যেকটা খাবারের পরিমাণ এত অল্প যে খাওয়ার পর ক্ষুধা আরো বেড়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের মত। খাওয়া হইয়া ও হইলনা শেষ। এপিটাইজার খেতেই আধা ঘণ্টা গেল।
মেইন ডিশ আসার আগে টেবিল ক্লথ পরিবর্তন হলো, আমাদের কাগজের এপ্রোন পরানো হলো। এক গাদা চামচ, ফর্ক, নাইফ সাজানো হলো। বিফ আসবে। চিংড়ি আসবে। রান্না করার আগে জীবন্ত চিংড়ি দেখালো, বিফ এর টুকরা দেখালো। কোবে বিফ এর নাম শুনেছেন? আমি প্রথম শুনলাম।
কোন হাতে নাইফ, কোন হাতে ফর্ক, কোন সময় ফর্ক নাইফ ক্রস করে রাখতে হয়- এসব যতই মুখস্ত করি ততই ভুলি। টেবিল ম্যানার নিয়ে ডাক্তার সাহেব নিয়ে বিরাট এক বক্তৃতা দিলেন। সারমর্ম দিচ্ছি।
গরুর মাংস, খাসির মাংস এগুলো কে কাউ মিট, গোট মিট না বলে বিফ, মাটন বলে কেন? -কারণ, এগুলো এসেছে ফ্রেঞ্চদের টেবিল ম্যানার থেকে। ফ্রেঞ্চরা খাবারের টেবিলে পশুর নাম নেয়াকে অশোভন মনে করতেন। পরে এই শব্দগুলো ইংরেজিতে ঢুকে পড়ে। বলা হয় পশুর নাম গুলো এসেছে জার্মান থেকে (ইংরেজি ভাষা যেহেতু জার্মান থেকে আসা), আর খাবারের নাম এসেছে ফ্রেঞ্চ থেকে।
কোন ডিশ কোন চামচ দিয়ে খাবেন তা বুঝবেন কি করে?-চামচ সাজানোর একটা রুল আছে। মেন্যু অনুযায়ী। ডান হাতের চামচ ডান দিকে, বাম হাতের গুলো বাম দিকে। শুরু করবেন প্লেটের সবচেয়ে দুরেরটা থেকে। একটা করে মেন্যু যাবে, একসেট করে চামচ কমবে। ডেযার্টের চামচ থাকবে প্লেটের সর্বনিকটে। চপস্টিক্স থাকবে আপনার আর প্লেটের মাঝখানে। যেকোনো ডিশেই ব্যবহার করতে পারবেন।
চপস্টিক্স কখনো ভাতে গেঁথে রাখবেননা। কেবলমাত্র মৃত ব্যাক্তির সামনে খাবার রাখার সময় খাবারে চপস্টিক্স গেঁথে দেয়া হয়।
অধিকাংশ দেশেই খাবার সময় ঢেঁকুর তোলাকে অভদ্র মনে করেন। আমেরিকার এমিস ধর্মের লোকরা খাবার সময় ঢেঁকুর তুললে ধরে নেন আপনি তৃপ্তির সাথে খাচ্ছেন।
নুডলস শোঁ শোঁ আওয়াজ করে খান জাপানিরা। যত সুস্বাদু, তত আওয়াজ।
ডাক্তার সাহেবের বক্তৃতায় আরো অনেক তথ্য ছিল। মনে করতে পারছিনা।

 

মেইনডিশ এর পর আমাদের নিয়ে গেল বারান্দায়। বাকি মেন্যু এখানে হবে। ডাক্তার সাহেব বললেন, ডেযার্ট আসার আগে এটা হলো ইন্টারমিসন। উনি খাওয়াপর্ব টা দেখেন একটা সিনেমা গল্পের মত। স্টারটার দিয়ে ভূমিকা, মেইন ডিশে ক্লাইম্যাক্স, একটা ইন্টারমিশন শেষে ডেযার্টে হ্যাপি এন্ডিং।
হাল্কা টকের একটা গোলাপ ঘ্রাণের আধা কাপ জুস এলো। এটা কুলি করার মত করে খেতে হবে। জাপানিতে একে বলে খুচি-নাওসি। মানে হলো – রিসেট ইয়োর টেস্ট। মুখ এখন ভার্জিন। ডেযার্ট এর সম্পুর্ন স্বাদ টা যেন উপভোগ করতে পারেন, সেজন্যই এই প্রস্তুতি।
লাঞ্চন গল্পে সমারসট মম কতঘণ্টা সময় ব্যয় করেছিলেন জানিনা, আমরা খেলাম সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে।
বিল কত হলো? জানিনা। জানতে দেননি। জানতে চাইনি।
এত্তো খেলাম, তারপর ও মনে হয়েছে আরও খেতে পারবো। এটাই জাপানি খাবার আর অন্যান্য দেশের খাবারের মধ্যে তফাৎ। বাংলা খাবারের পর ঘুম আসে। জাপানি খাবারের পর কাজের স্পৃহা আসে। ইউরোপের অনেক দেশে তো দুপুরে খাবারের পর রেস্ট নেয়ার জন্য ৩ ঘণ্টা ঘুমের ছুটি দেয়া হয়। সিয়েস্তা।

 

জাপানি খাবার
জাপানের খাবারের ভেরাইটি দেখতে হলে জাপানের কোন ইযাকায়া তে ঢুকে পড়েন। ৫০-১০০টা মেন্যু আছে। কম খরচে এর চেয়ে মজার খাবার নেই। আমার-কম-খাওয়া এলবামটি দেখতে পারেন। ৬টি এলবামে ৬৫০ এর অধিক ছবি আছে।
আপনি কলেজ পাশ করে ঢুকেন অথবা ইউনিভারসিটি পাশ করে ঢুকেন, প্রফেশনাল সুশি শেফ হবার জন্য ট্রেনিং পিরিয়ড ৬ বছর। সকালে ৫ টায় উঠে পাহাড়ের উপর থেকে প্রাকৃতিক পানি সংগ্রহ করার মাধ্যমে দিনের কাজ শুরু। দোকানের কঠিন কাজ – দোকান পরিষ্কার, টয়লেট পরিষ্কার, বাসন মাজা ও এই ৬ বছরের ট্রেনিং মধ্যে পড়ে। এটা মানসিক প্রস্তুতির অংশ।
ফুগু নামের একটা মাছ আছে। এই মাছ কাটার জন্য স্পেশাল লাইসেন্স লাগে।
ম্যাকডনাল্ডস, কে এফ সি জাতীয় ফাস্ট ফুড এখানে জাঙ্ক ফুড (সস্তা, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর) হিসেবে বিবেচিত। আপনি এসব খাচ্ছেন মানে হলো আপনার সময়ের অভাব, না হয় টাকার অভাব না হয় জ্ঞানের অভাব।
কোবে বিফ এখানকার সবচেয়ে দামি বিফ। রেস্টুরেন্টে ১০০ গ্রাম কোবে বিফ এর দাম ১৫০ ডলার [৩]। ন্যু-ইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া তে জাপানি কোবে বিফ একটা লাক্সারিয়াস আইটেম।

 

জাপানের অনেক কোয়ালিটি রেস্টুরেন্টে বিলের সাথে সাথে কত ক্যালরি ভক্ষণ করলেন তার একটা হিসাব ও ধরিয়ে দেন।
Ooops!! কুইজগুলোর উত্তর দেয়া হয়নি। কিছু হিন্টস হয়তো পেয়েছেন। ৪ টা কুইজের ৪ নম্বরটি ছাড়া সব গুলোই সাব্জেক্টিভ। সি,এন,এন এর একটা সার্ভে আছে [২]। ওখানে উত্তর আছে। কোথাও বাংলাদেশের স্থান নেই।
ওনাদের সার্ভে টিম কি বাংলাদেশের গ্রামে গিয়েছিলেন? গ্রামের খাবারের স্বাদ কি বইয়ে লেখা আছে যে লিটারেচার সার্ভে করে স্বাদ বুঝে যাবেন? গ্রামের আতিথেয়তা দেখেছেন? আমাদের গ্রামের রহিম ভাই, সখিনা খালাদের হাতে ১০ টাকা থাকলে আপনাকে আপ্যায়ন করতে ১১ টাকা খরচ করবে – সব উজাড় করে দিবে।
সি,এন,এন ওয়ালারা খাবারের আপেক্ষিক খরচ কোন মাপকাঠি দিয়ে মেপেছেন?
সরি, সিএনএন সাহেব, আপনাদের উত্তরগুলো নিতে পারছিনা।
আমার কাছে কুইজের ৪ নম্বরটি ছাড়া সবগুলোর উত্তরই হচ্ছে বাংলাদেশ। স্পেসিফিক্যালি বললে আমার গ্রাম মতলবের এখলাসপুর।
কয়েক বছর পর পর যখন গ্রামে যাই, তখন কি ঘটে জানেন?
এপিটাইজার শুরু হয় প্রতিবেশী থেকে আসা ডাব দিয়ে। ডাবের পানিতে সিট্রাস নেই। স্বস্তি আছে। প্রি-এপিটাইজার বলতে পারেন।
গ্রামের মানুষ ২-৩ বছরের ঘটে যাওয়া আপডেট দিতে থাকেন। গল্প শুনতে শুনতে আসতে থাকে সিজনাল ফলের ভর্তা। কলার থোরার মধ্যে তেঁতুল, পোড়া মরিচের গুড়া, ধনিয়া পাতা ঢুকিয়ে লাঠি দিয়ে গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে থোরের ভিতরের অংশ মেশানো হয়। ঐ লাঠি দিয়েই বের করা হয় ভর্তা। শুনলেই তো পেপসিন, মিউসিন বের হয়ে আসার কথা। এই এপিটাইজারের কথা আমাদের কোন রেস্টুরেন্ট জানেনা।
এপিটাইজার পর্বটা হয় উঠানে।
কত ধরনের শাক, কত ধরনের ভর্তা। মেইন ডিশ হিসাবে থাকে মেঘনার মাছ, বাড়ির আঙ্গিনায় বড় হওয়া মোরগ, কবুতরের বাচ্চা। গ্রামে আমার বাল্যবন্ধু থাকে। মাছ আসে তার দীঘি থেকে ও । ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতি বছর গ্রামের ৪ টা প্রাইমারি স্কুল আর একটা হাই স্কুলের গড়ে ৫০ জন ছাত্র ছাত্রীদের বৃত্তি দিয়ে আসছি। ছাত্রাবস্থায় নিজের বৃত্তির টাকা দিয়ে শুরু করেছি এই কার্যক্রম। ২৫ বছরে বৃত্তি দেয়া মোট ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা ১৫০০ এর উপরে। এদের বাড়ি থেকে আসে ডেযার্ট। এরা আয়ের ৯০ শতাংশ ব্যবহার করে খাবারের জন্য। মেহমান আসলে তো কথা নেই। এই খাবারের পেছনে ও অনেক গল্প আছে, ক্লাইম্যাক্স আছে, হ্যাপি এন্ডিং আছে।
যত খাবার এসে উপস্থিত হয়, তাতে সাড়ে তিন ঘণ্টা নয়, সাড়ে তিন দিনের একটা কোর্স চালানো যাবে। ইস, ইয়েনাগা সান যদি এই বয়সে প্লেনে চড়তে পারতেন!
এ পর্যন্ত ৩৯০ জনের ও বেশি জাপানি আমাদের গ্রাম এখলাসপুরে গেছেন। অধিকাংশই আবার এখলাসপুরে যেতে চান। কারণ দুটো- এখলাসপুরের খাবার আর এখলাসপুরের মানুষ।

 

যতদিন পর্যন্ত আপনি/সিএনএন স্বীকার না করবেন, এখলাসপুর ইজ দ্যা বেস্ট ফর ফুড, ততদিন পর্যন্ত আমি বলে যাব আপনার মাপকাঠিতে সমস্যা আছে। এই তালগাছ টি একান্তই আমার- আমার গ্রাম, আমার গর্ব [৪]।
সূত্র :
[১] ইউনেস্কো হেরিটেজে জাপানী খাবার http://www.unesco.org/culture/ich/RL/00869
[২] বিশ্বের সবচেয়ে স্বাদের খাবারের দেশ http://travel.cnn.com/…/worlds-best-food-cultures-453528
[৩] কোবে বিফ এর দাম http://www.kobebeefstore.com/
[৪] গ্রাম ওয়েব http://gramweb.net
লেখকঃ কলামিস্ট ও  সহযোগী অধ্যাপক, কিয়ুশু বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান 
আরও পড়ুন