জাপানে ইসলাম ও দ্বীনের মেহনত

সাইফুল ইসলাম খান 

১.
জাপানে বিভিন্ন জায়গায় কিছু মসল্লা রয়েছে। এটি কেমন? ছোট পরিসরে কোন জাপানি মালিকানা বাড়িতে নীচ তলা ভাড়া নিয়ে এটিকেই মসজিদের মতো করে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কোন উচ্চবাচ্য করা যাবেনা, গলা ছেড়ে আযান দেয়া যাবেনা।এখানে বলে রাখি, আমাদের ভার্সিটির পাশেই এরকম একটি মসল্লা রয়েছে। মাসিক ভাড়া পঁয়ষট্টি হাজার ইয়েন।এক ব্যবসায়ী পাকিস্তানি ভাই একাই দেন ভাড়ার অনেকটা। বাকীটা ছাত্ররা বহন করে।এরপরেও কিন্তু আল্লাহ চালাচ্ছে অত্যন্ত সুন্দরভাবে।
শান্তিতে নামাজ পড়তে পারছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসলিম ছাত্রগণ।
২.
আসমান আজ বড্ড আন্ধার। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।তিন দিন একটানা। টাইফুন আসছে তাই। এর মধ্যেই মসল্লা থেকে ভোরের নামাজ পড়ে রওনা হলাম।
উদ্দেশ্য ফুজি মসজিদ।একদিনের তাবলীগ জামাত।ছয়জনের একটা ছোট দল।গাড়ি চলছে বেগে ঘোর লাগা বৃষ্টির ভিতরেই। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আমরা।
৩.
মসজিদ দেখে অভিভূত হলাম। এই ভিন দেশে মাঝারি দু’তলা মসজিদ। জাপানি প্রযুক্তিতে তৈরী, রয়েছে সবধরনের সুযোগ সুবিধা।তবে হঠাৎ করে বুঝা যাবেনা এটি মসজিদ।কারণ সাধারণ জাপানী বাড়ির আদলেই তৈরী।এ পর্যন্ত আমি চারটি মসজিদ দেখেছি।দেখতে মোটামুটি একই রকম।পাকিস্তানি ধনকুবেরগণ জমি কিনে এই মসজিদটি বানিয়েছেন।বিদেশের মাটিতে যেখানে নিজের জীবন নিয়ে সর্বদা ব্যস্ত থাকতে হয়, পরিবারকে দেয়ার মতো সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে, সেখানে সময় ও অর্থ দুটোই আল্লাহর পথে কুরবান করে তারা অত্যন্ত যত্ন নিয়ে এটি তৈরী করেছেন। রেখেছেন ইসলামী উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত ও দক্ষ একজন সুদর্শন ইমাম। অনেকেই সন্তানদেরও দিচ্ছেন দ্বীনি ও এলেম শিক্ষা।
৪.
দ্বীনের প্রতি একাগ্রতা ও ইসলামী মূল্যবোধ অত্যন্ত শক্ত বলেই এটি নির্মাণ সম্ভব ও সহজ হয়েছে। ৫০/৬০ কি.মি. এর মধ্যে আর কোন মসজিদ নেই।অনেকেই ৩/৪ কিমি দূর থেকে এসে নামাজ পড়ছে মসজিদে।এটি উল্লেখ করলাম এজন্য যে, আমরা যারা নানা অজুহাত দেখিয়ে নামাজকে এড়িয়ে যেতে চাই, তাদের জন্য। যেখানে ঠোঁটের উপর একটি মানুষের নষ্ট হওয়ার সমস্ত উপকরণ অতি সহজলভ্য হওয়া সত্ত্বেও নিয়মিত নামাজ কায়েম করছেন সবাই।
৫.
আগেই বললাম মাইকে আযান এখানে নিষেধ।। পাঁচ ওয়াক্ত জামাত হয়।শনি, রবি দুদিন ছুটি থাকায় জামাত বড় হয়।প্রতি শনিবারে এখানে আয়োজন করে বড়খানা।দেড়- দু’শো মুসল্লী একসাথে বসে খায়।জাপানের মতো অত্যন্ত ব্যয়বহুল দেশে এত মানুষের খাবারের আয়োজন ছোটখাট বিস্ময় বলা যায়! কেউ যদি চায় মাসের প্রতিটি শনিবারে এখানে এসে ফ্রি রাতের খাবার খাবে, নিশ্চিন্ত মনে খেতে পারবে। আমাদেরকেও রাতে রান্না করতে হলনা। দাওয়াত দিয়ে রাখলেন রাতে খাওয়ার। বয়ান শেষ হলে খুব তৃপ্তি ভরে খেলাম সবাই।
৬.
বেশীর ভাগ ভাই উচ্চ শিক্ষিত কিন্তু কে কতো সেবা করতে পারবে যেন প্রতিযোগিতা।খাবার পরিবেশন থেকে শুরু করে পরিচ্ছন্ন কাজে কোনটাতেই অহংবোধ বা বিন্দু পরিমাণ দ্বিধা দেখলাম না।সত্যি অপূর্ব, অমায়িক এক মিলনমেলা।
৭.
আল্লাহ পৃথিবীটা কে এমন সুন্দরভাবে সাজিয়েছেন —যেখানে আল্লাহর জমিন আছে, সেখানেই মানুষের সিজদা পড়ছে অবিরত। আমাদেরকে আল্লাহ তার গোলাম হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

লেখকঃ পিএইচডি গবেষক,শিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

আরও পড়ুন