ধর্মের রং সাদা

পিনাকী রঞ্জন বিশ্বাস

বিশাল এ জীবন সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে একদিন আটকে গেলাম পড়ে থাকা এক সাগরিকায়, বাঁধলাম ঘর । ভাসমান সেই জীবন ফিরে পেলো প্রাণ কিন্ত পায়ের তলায় লেগে থাকা অসংখ্য নুড়ি সর্ষের দানার মতো গড়াতে শুরু করলো, শুরু হলো দেশ থেকে দেশান্তরে ছোটা । সুখের সে নীড় রইলো পড়ে ।
ঘুরতে ঘুরতে এক সময় হাজির হলাম তৃতীয় বিশ্বের ছোট্ট একটি দেশে । এ দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ আত্মা বিশ্বাস করেন কিন্ত জন্মান্তর বিশ্বাস করেন না, অথচ অদ্ভুতভাবে দেশটার মৃত্যু হয়েছে, হয়েছে নুতন জন্ম । জন্মান্তরে সে ফিরে পেয়েছে নুতন জীবন, নুতন নাম |

একদিন রাজনৈতিক লড়াই আর ধর্মের যূপকাষ্ঠে পড়ে যা ভাগ হয়ে গিয়েছিলো তাই আবার অনেক বছর পরে নিজের অস্তিত্বকে বাঁচাতে পৃথিবীর বুকে জন্ম দিলো আরো একটি দেশ, বাংলাদেশ । এ দেশের মাটিতে কেন জানি মনে হয় প্রাণ আছে । এ দেশের মাটিতেই একদিন জন্ম গ্রহণ করেছিলেন আমাদের পূর্ব পুরুষ । তাঁদের পায়ের পবিত্র ধূলিকনা আজও ছড়িয়ে রয়েছে গ্রাম বাংলার মাঠে ঘাটে পথপ্রান্তরে ।

এখানেই পেলাম শিশিরের দেখা । এ শিশির হেমন্তের ভোরে ঘাসের ডগায় এক খন্ড হীরের দ্যুতি নয়, নয় এ শিশির শীতের ভোরে ঘন কুয়াশায় হাঁটতে বেরিয়ে চোখের পাতায় জমে ওঠা জলের কণা, এ শিশিরের জল যায় না পান করা, হয়না শরীর ডুবিয়ে অবগাহন, তবুও এ শিশির পাশে থাকলে সিক্ত হয়ে ওঠে মন, এ শিশির যেন শুষ্ক মরুভূমিতে বিশাল এক জলাধার ।
সেদিনটাও ছিল আজকের মতো ২২শে মার্চ ।

প্রাতঃরাশ সম্পন্ন করে চায়ের কাপে শেষ চুমুকের সাথে সাথে চলমান দূরভাষে খবর এলো একদিন যিনি নিদারুণ কষ্ট সয়ে আমায় এ সুন্দর পৃথিবীর আলো দেখিয়ে ছিলেন, তিনিই আজ হাসতে হাসতে এক নিদারুণ কষ্টের মাঝে আমায় ফেলে পাড়ি দিয়েছেন অন্য ভুবনে । সে ব্যথায় প্রলেপ লাগলো এক শিশিরের ছোঁয়ায় | সামনে দাঁড়িয়ে বুঝে নিলেন ব্যথার আঘাত, বুকের মাঝে টেনে নিলেন ভাই শামসুদ্দিন শিশির ।
তারপর —?

রচনা হলো এক অন্য ইতিহাস । এ ইতিহাস রামজন্মভূমির ইতিহাস নয়, এ ইতিহাস বাবরি মসজিদ ধ্বংসের নয়, এ ইতিহাস এক ভ্রাতিত্বের । পৃথিবী জুড়ে করোনা অতিমারীতে আটকে গিয়েছিলাম বাংলাদেশ নামক দেশটির চট্টগ্রাম শহরে । অবিভক্ত ভারতের এই শহর একদিন দেখিয়ে ছিলো বাঙ্গালীর রক্তের তেজ আর আমি সেদিন দেখেছিলাম সেই মাটিতে বাঙ্গালী ভাইয়ের ভালোবাসার গভীরতা । এক বিধর্মীকে ভালোবাসার জালে আবদ্ধ করে রাখলেন তিনটে মাস । ভুলিয়ে দিলেন মাতৃ বিয়োগের শোক ।

ফুলের বাগানে শিশিরের ছোঁয়ায় ফুটে উঠল কত ফুল । সর্বক্ষণ যাঁরা আমায় বুকে আঁকড়ে ভুলিয়ে দিয়েছিলেন মাতৃ বিয়োগের শোক । সর্ব প্রথমেই যার নাম মনে পরে তিনি মহসিন ভাই । যার পরিচর্যায় শোকের মাঝেও এ শীর্ণকায় চেহারায় সুন্দর মেদের সঞ্চার ঘটেছিলো । পেয়েছিলাম রহিম ভাইকে, পেয়েছিলাম আব্দুল খালেক ভাইকে, সুমন ভাইকে, চট্টগ্রাম গভঃ টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সব অধ্যাপক, অধ্যাপিকা এবং অগুনতি (শিক্ষক) ছাত্রদের, যাঁরা সামনে আসতে পারেন নি তাঁদের মধ্যে চলমান দূরভাষে প্রতিনিয়ত খবর রেখে চলেছিলেন ডঃ আজাদ বুলবুল ভাই, ডঃ ওবাইদুল করিম ভাই, ডঃ মুজিবর রহমান ভাই । এছাড়া আরো কতজন যে প্রতিনিয়ত খবর রেখেছিলেন তা বলে শেষ করতে পারবো না । কাকে ছেড়ে কার কথা বলি? নাম মনে পড়ে না, শুধুই মনে হয় যার নাম উল্লেখ করতে ভুল করলাম তিনি ব্যাথিত হলেন নাতো! “মালিকা পরিলে গলে প্রতি ফুল কে বা মনে রাখে”।

সমগ্র উপমহাদেশ জুড়ে যেখানে আজও ধর্মের হানাহানি, ইউটিউব জুড়ে ধর্মের আস্ফালন সেখানে এই বাংলাদেশের মাটিতেই খুঁজে পেলাম আমার দ্বিতীয় ঘর ।

বিশাল ফুলের বাগানে দৃষ্টি এড়িয়ে দুচারটে আগাছা জন্মাতেই পারে, দৃষ্টি সতর্ক থাকলে তাও জন্মাবে না| আমি সৌন্দর্যের পূজারী শুধুই সুন্দর গ্রহণ করতে শিখেছি ।

আবহমান কাল ধরে ফিরে আসবে ২২ শে মার্চ, ফিরবেন না মা । ভুলতে পারবো না আমৃত্যু আমার বাংলাদেশের সেই ভাইদের, সনাতণীদের চোখে যাঁরা বিধর্মী ।

লেখকঃ ভারতীয় বাঙালী সাহিত্যিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন