প্রবাস জীবনের গল্পঃ বিবর্ণ (১ম পর্ব)

তাকি নাজিব

এক
হাসেম সাহেব যখন অষ্ট্রিয়াতে এসেছিলেন তখন এখানে বাংলাদেশিরা সংক্ষায় অনেক কম ছিল। তারপর অনেক কষ্টকরে দীর্ঘ আট বছর সময় নিয়ে তিনি অষ্ট্রিয়ায় বৈধ কাগজ-পত্র করেছেন। সবকিছু ঠিক ঠাক হওয়ার পর যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি দেশ থেকে তার পুরে সংসার ভিয়েনায় নিয়ে এসেছেন।
তার দুই ছেলে মেয়ে। বড় মেয়ে মৌসুমি, সে দেশে থাকতে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে বিদেশ আসব আসব করে একবছর ঘড়ে বসে ছিল। আর ছোট ছেলে সামির গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে পঞ্চম শ্রেনীতে পড়তো। কঠিন জীবন সংগ্রামে হাসেম সতহেবে নিজে বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারেন নি। তাই তার ইচ্ছে ছিল ছেলে মেয়েরা ভালকরে লেখাপড়া করুক। এখন ভালয় ভালয় তার পুরো সংসার যখন গ্রাম থেকে এক লাফে ভিয়েনায় উঠে এলো তখন মনে মনে তিনি বেশ তৃপ্তি অনুভব করলেন এবং ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে তৎপর হয়ে উঠলেন।

কিন্তু বিধির বাম, তার বড়মেয়ে মৌসুমি ভাষাগত এবং বয়শের কারনে এখানের শিক্ষা ব্যাবস্থার সাথে ঠিক খাপখাওয়াতে পারলনা, কিন্তু ছোট ছেলে শফির বয়শ কম থাকায় তাকে মোটামোটি একটা ব্যাবস্থা করা গেছে।

এবার হাসেম সাহেবের কাছে আরেকটি বড়প্রশ্ন দেখাদিল, তা হল তার অর্থনৈতিক সমস্যা। আগেতো একলা ছিলেন, গায়ে বেশ হাওয়া লাগিয়ে কাটিয়ে দিতেন। কিন্তু এখন কাধে সংসারের ঘানি এসেপড়ায় সবকিছু যেন কেমন সাদাকলো হয়ে উঠলো।
মৌসুমিও বুঝতে পারল বর্তমান পরিস্থিতি। তাই সে জার্মান শেখার কোর্সে ভর্তি হয়ে আল্পবিস্তর জার্মান শিখে কাজের ধান্দায় লেগেগেল। কিছুদিন এদিক সেদিক খোজাখুজি করে অবশেষে ম্যাকডোনাল্ডে কাজ পেয়েগেল মৌসুমি। ভিয়েনায় সে নতুন, আর নতুন দের জন্য বিশেষ করে মেয়েদের কাজের জন্য ম্যকডোনাল্ড খারাপ না।

বাসা থেকে অবশ্য মৌসুমির কাজের ব্যাপারে বাবা মা তেমন কোন আপত্তি করল না , বরং খুশিই হলো। হাশেম সাহেব একা কুলিয়ে উঠছিলেন না,মেয়ে সহযোগী হওয়ায় তিনি বেশ ভরসা পেলেন। মৌসুমিও বেশ খুশি, কারন সে দেখেছে তার বাবা তাদের পুরো পরিবারটিকে এপর্যন্ত টেনে আনতে কি আমানুষিক পরিশ্রম করেছেন,সে দিক থেকে বাবার সহযোগী হতে পেরে তার হীনমন্যতার মেঘ অনেকটাই কেটে গেল। তাই কাজের জায়গা থেকে যখন তার ব্যাংকএকাউন্ট চাওয়া হলো হলো তখন সে তার বাবার একাউন্টটিই কোম্পানিকে দিল তাঁর বেতনের টাকা পাঠানোর জন্য।

দুই
এদিকে সময় গড়িয়ে চলেছে দ্রুত গতিতে। অপরিচিত ভিয়েনা এখন আর মৌসুমির কাছে অতো অপরিচিত নয়। আগে তার ফেলেআসা গ্রামের জন্য মন কেমন করতো আর এখন সে বেশ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে ঘড়ির কাটার সাথে পথচলতে। জার্মান ভাষায়ও সে এখন ক্রমশ দক্ষ হয়ে উঠেছে।তার স্কুল পড়়ুয়া
ভাই শফির সাথে বাসায় এখন সে বেশিরভাগ জার্মান ভাষাতেই কথা বলে । তাদের মা বেশ অবাক হয়ে শুনে ছেলে-মেয়েদের কথোপকথন। মায়ের অবাক চোখে হটাৎ সতর্কতার ঝলকানি দেখাদেয়। তার সেদিনের মেয়ে মৌসুমিতো বেশ বড়হয়ে গেছে। সাধারন আর দশটা বাঙালী মায়ের মতোই শাহিদা বেগম চিন্তিত হয়ে উঠলেন মেয়ের বিয়ে নিয়ে।

হাসেম সাহেব পোড় খাওয়া লোক। জীবনে তার আনেক চড়াই উৎড়াই পেড়িয়ে এখানটাতে উঠে আসতে হয়েছে। শাহিদা যখন গতরাতে মৌসুমির বিয়ের কথা বলেছিল তিনি অবশ্য তার আগে থেকেই মেয়েকে পাত্রস্থকরা নিয়ে ভাবছিলেন। মৌসুমি দেখতে শুনতে খারাপ না,হাসেম সাহেবের মনের ইচ্ছা এখানেই একটা ভাল শিক্ষিত কর্মঠ ছেলেদেখে মেয়ের বিয়ে দিবেন।
এবিষয়ে তিনি অবশ্য তার পরিচিত বিশ্বস্থ দু’একজন বন্ধুর সাথে আলোচনা করে রেখেছিলেন। তার অনেকদিনের পুরনো বন্ধু ইউসুফ তাকে একটি ছেলের কথাও বলেছিল। ছেলেটি ইউসুফের সাথে একই জায়গায় কাজ করে, নাম রহিম। ছেলেটি মোটামুটি শিক্ষিত,দেখতে শুনতেও নাকি খারাপ নয়, আবার কোন বাজে নেশা নেই, বেশ কর্মঠ।

রহিম অনেকদিন যাবৎ অষ্ট্রিয়াতে থাকলেও সম্প্রতি তাঁর বৈধ কাগজপত্র হয়েছে। ইউসুফ অবশ্য হাসেমকে বলেছিল সে নাকি রহিমকে চেনে,দুএকবার নাকি সে রহিমকে দেখেছে ইউসুফের কাজের জায়গায় কিন্তু হাসেম সাহেব মনেকরতে পারছিলেন না।তাই তিনি মনেমনে সিদ্ধান্ত নিলেন রহিমকে ডেকে সামনা সামনি একদিন আলাপ করবেন। মনেরকথা তিনি জানালেন বন্ধুকে।
রহিমকে হাসেম সাহেবের পছন্দ হয়েছে। সে বাবা মায়ের বড় ছেলে। দেশে বৃদ্ধ পিতামাতা ছাড়া আর দুই ভাইবোন আছে, সে বিএ পাশ,আদব তমিজও বেশ ভাল। তাছাড়া ইউসুফের কাছে তিনি খবর নিয়ে জেনেছেন রহিম কাজে কর্মেও বেশ চালু। তাই তিনি স্ত্রী ও কন্যার সাথে আলাপ করে রহিমকে একদিন বাসায় আসতে বললেন। সকলের সম্মতি ক্রমে খুব শিঘ্রই পারিবারিক ভাবে রহিম ও মৌসুমির বিয়ে হয়ে গেল।
(চলবে……)

[ প্রবাস জীবনের প্রেক্ষাপট নিয়ে রচিত গল্প ,চরিত্র ও ঘটনা সম্পূর্ন কাল্পনিক ]

লেখক তাকি নাজিব

লেখকঃ অস্ট্রিয়া প্রবাসী লেখক 

আরও পড়ুন