বাংলাদেশে জাপানি মহিলার অভিজ্ঞতা

আরশাদ উল্লাহ্‌

তিনি একজন জাপানি মহিলা। বয়স যখন ত্রিশ তখন জাইকার কর্মি হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় চার বৎসর কর্মরত ছিলেন।অধিকাংশ জাপানি নারী দেখতে স্লিম এবং সুন্দরী। আমার এই লেখাতে তার মুখে শুনা বাংলাদেশে কর্ম জীবনের অভিজ্ঞতা ও কিছু গল্প শুনেছি। মহিলার নাম কিমুরা। বলিষ্ঠ ও মোটা দেহ। চেহারা মঙ্গোলিয়ান এবং লম্বায় পাঁচ ফিট ছয় ইঞ্চির মত। কিমুরার দেহ বৈশিষ্ঠ অন্যান্য জাপানি নারীদের মত তেমন স্লিম ও মহিলাসুলভ কমনীয় নয়।তাকে দেখতে মনে হয় একজন মহিলা রেস্টলারদের মত শক্তিশালী এবং দীর্ঘাঙ্গী। চেহারা গোলাকৃতি উজ্জ্বল ফর্সা।পরনে জিনস প্যান্ট ও মেয়েদের সার্ট। মোটা হলেও ক্ষিপ্রগতিতে চলাফিরা করেন। আলস্য বলতে যা বুঝায় তা নেই। তিনি একজন বন্ধু বৎসল জাপানি নারী।নব্বইয়ের দশকে দীর্ঘ চার বৎসর জাইকার কর্মি হিসাবে ছিলেন। বাংলাদেশের উপর তার আগ্রহ ও ভালবাসা অকৃত্রিম। তার সাথে কথা বলার পরে যা নাকি আমাকে বিস্মিত করেছে তা হল বাংলাদেশী খাবারের প্রতি তার তীব্র আসক্তি। তিনি বাংলাদেশের খাবার খেতে ভালবাসেন।
জাইকার কাজ সময়ের উপর সীমাবদ্ধ। অনেকে তাদের সরকারী ভলান্টিয়ারও বলেন। অর্থাৎ চার বৎসরের কর্মদায়ীত্ব নিয়ে গিয়ে সময় উত্তির্ণ হলে দেশে ফিরে আসতে হয়। যদি কর্ম মেয়াদ বর্ধিত করা না হয় তাহলে বেকার জীবন । জাইকার মেম্বার হওয়া সহজ নয়। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী থাকতে হবে এবং বাংলাদেশে যেতে হলে বাংলাভাষা শিখে যেতে হবে। ভাগ্য প্রসন্ন হলে প্রজেক্টের কাজ যখন বর্ধিত হয় তখন বাকি চার বৎসর কাজ চালিয়ে যেতে হবে। তাদের মাসিক বেতনও সরকার বর্ধিত হারে দেয়। কিমুরা যখন নব্বইয়ের শেষার্ধে প্রথম গিয়েছিলেন। তখন অন্য একজন জাপানি যুবকের সাথে পরিচয় হয়। সে যুবকটিও জাইকার কর্মি ছিলেন। পরে দুজন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।তাদের একটি কন্যা সন্তান আছে। সে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। মহিলা বর্তমানে জাপানে আছেন। আমার স্ত্রী জাপানি হলেও বাংলাদেশি খাবার রান্না করেন। মহিলা তিন কিলোমিটার দূরে থেকে সে গন্ধ পেয়ে একদিন আমার বাসায় আসেন।পরে বলেছেন, “পাশের শহরে নতুন বাড়ি কিনে এসেছি। এলাকার লোকদের জিজ্ঞাসা করেছি – কাছাকাছি কোন বাংলাদেশি থাকে কি না।”
তারপর কিমুরার সাথে ঘনিষ্টতা বৃদ্ধি পায়। কথায় কথায় একদিন তিনি বাংলাদেশি যুবকদের মন-মানসিকতার উপর মন্তব্য করেন। অনেক কথা হল। তার যে কথাটি মনে দাগ কেটেছে তা হল, “আমি যশোর এলাকাতে ছিলাম। বিভিন্ন কাজে গ্রামে-গঞ্জে বাসে যেতে হত। আমার দীর্ঘ কর্মজীবনে যতবার বাসে উঠেছি, ততবার পুরুষ আমার দেহে হাত লাগিয়েছে!”
তিনি আরো বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ বন্ধুবৎসল বলে আমি তাদের ভালবাসি। কিন্তু কতিপয় যুবকের মানষিকতা আমাকে বিব্রত করেছে – যা জাপানের যুবকদের মধ্যে নেই!”
একথা বলে কিছুক্ষণ হাসলেন মহিলা। কারণ মনে হয় আমার মন হালকা করার সুযোগ দেওয়ার জন্য। আমি তার কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনেছি এবং লজ্জা বোধ করছি।
অন্য একদিন কিমুরা এসে বললেন, আজকে এক নতুন অভিজ্ঞতার কথা বলব। কফি পান করতে করতে বললেন, “বাংলাদেশে চার বৎসর অতিক্রান্ত হওয়ার পর আমি কলকাতা ভ্রমণে গিয়েছিলাম। আমি জানতাম যে ভারতে ধর্ষণের মাত্রা দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কম নয়। কিন্তু পশ্চিম বঙ্গের লোকজন বাঙালি। তাছাড়া এক সময় সমগ্র ব্রীটিশ ইন্ডিয়ার রাজধানী ছিল। সেখানের লোকজন সুসভ্য – এমন ধারণা নিয়ে একদিন কলকাতা গেলাম। প্রস্তুতি বলতে এক প্যাকেট কনডম কিনে নিলাম। কারণ, আমার ভয় যদি ধর্ষকেরা আক্রমণ করে তখন ধর্ষণ প্লাস হত্যা – দুটোই করতে পারে। যদি আক্রান্ত হই – তখন তাদের বাঁধা না দিয়ে কনডম দিব। তাহলে তারা হত্যা করবে না!”
জাপানি নারীপুরুষ ভ্রমণে আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকাতেও যায়। তবে তারা যাবার পূর্বে সে সব দেশগুলির উপর ভালমন্দ ধারণা নিয়ে যায় এবং যথাযত প্রস্তুতি নিয়ে যায়। তবুও যে দুর্ঘটনা বা হত্যা হয়নি তা নয়। শুধু নারী নয়। পুরুষেরাও দুর্ঘটনায় পড়ে। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ছাত্র ষ্টাডি ট্যুরে পেরু গিয়ে ডাকাতের হাতে পড়ে। ডাকাতেরা তাদের হত্যা করে ক্যামেরা ও মূল্যবান দ্রব্যাদি নিয়ে গেছে। এক দশক পূর্বের কথা।
কিমুরা যা বললেন তা শুনে বিস্মিত হলাম। তিনি কলকাতাতে হেঁটেই বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখেছেন। কখনো কখনো রিক্সাতে গিয়েছেন। একদিন এক রিক্সাতে উঠে তার হোটেলের নাম বলে বসলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি বুঝতে পারলেন যে তাকে এক নিরিবিলি রাস্তায় নিয়ে গেছে। তখন সন্ধ্যা হয়েছে।আবছা অন্ধকার। তিনি ভাবলেন নিশ্চয়ই রিক্সাওয়ালা তাকে ধর্ষণ করবে। সে রিক্সাওয়ালায় বয়স ত্রিশের মত।
কিমুরা রিক্সা চালককে বললেন, “এই যে শুন, শুন।আমাকে কেন এখানে নিয়ে এসেছ? কিমুরা হাত ব্যাগ থেকে একটি কনডম বের করে বললেন, “নো, নো, এটা দিয়ে, এটা দিয়ে …!”
তিনি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে জোর গলায় বলতেছেন। কিন্তু রিক্সাওয়ালা তার দিকে ফিরেও তাকাল না। সে রিক্সা ঘুরিয়ে চালাতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে কিমুরা লক্ষ করলেন রিক্সা চালক তার রিক্সাটি কিমুরার হোটেলের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
গ্রাম থেকে বেকার পুরুষ কলকাতায় এসেছে। বেশিদিন হয়নি।কলকাতার রাস্তাঘাট ঠিকমত চিনে না। তাই রাস্তা ভুল করেছিল।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও জাপান প্রবাসী 

আরও পড়ুন