বাঙালির বাঙালিয়ানা

মনসুর আলম

বিদেশে থাকি ১৭ বছর এখনও ভাত খাওয়ার অভ্যাসটা ছাড়তে পারিনি। যতকিছুই খাই না কেন ভাত না খেলে মনে হয় খাওয়া অসম্পূর্ণ রয়ে গেলো। অনেকেই আছেন পঁচিশ / তিরিশ বছর যাবত বিদেশে কিন্তু, খাদ্যাভ্যাস সেই বাঙালিয়ানা। পিৎজা, বারিট্টো, পাস্তা কিংবা এনজেরা এমনকি রুটিও সেই স্থান দখল করতে পারেনি। আমেরিকা, ইংল্যান্ড কিংবা সাউথ আফ্রিকা বসেও আমরা পদ্মার ইলিশ চাই। টার্কিমাছ, ছোট চিংড়ি, কৈ, শিং, সরপুঁটি সব আমদানি হয়। সুদূর আফ্রিকা, আমেরিকায় বসেও আমরা শিমের বিচি, কচুর লতা, কাঁঠালবিচি, পটল খেতে চাই এবং খাইও।

বিদেশে উৎপাদিত মসলাগুলো ভেজালমুক্ত তারপরও দেশ থেকে সব মরিচ, হলুদ, ধনিয়া, জিরা, পাঁচফোড়ন, চটপটির মশলা, চাট মসলা সব আসে। রেডিমেড চিংড়ির ভর্তাও আসে। দেশে উৎপাদিত মুড়ি, চানাচুর, টোস্ট বিস্কিট, সেমাই, লাচ্ছা, তেঁতুল সব পাওয়া যায়। লইট্যা শুঁটকি, চ্যাপা শুঁটকি, গুড়, নানাজাতের আচার কিছুই বাদ নেই।

ইংল্যান্ড এ বসবাসরত প্রতিটি বাঙালি পরিবারে (বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে যাদের অরিজিন) ভর্তা খাওয়ার জন্য শিলপাটা, বটি সব পাবেন। পিঠা বানানোর জন্য বিশেষ পাত্র, চিতই পিঠা, পুলি পিঠা, ভাপা পিঠা কিছুই আমরা ভুলতে পারিনি, ভুলতে চাইও না। মাটির হাড়ি পাতিলও দেখেছি কয়েকজনের কাছে।

দেশি স্যান্ডো গেঞ্জি, লুঙ্গি, গামছা সব আমরা আমদানি করি। লুঙ্গি ব্যক্তিগতভাবে আমিও ব্যবহার করি। গোছল এবং ঘুমানোর সময় লুঙ্গির কোনো বিকল্প নেই। কেউ কেউ বিছানার চাদর, বালিশ, কাঁথা সবই পেতে চান দেশ থেকে। শাড়ি, ত্রিপিস ওগুলোর কথা বলারই প্রয়োজন নেই। নারিকেল তেল, সরিষার তেল, কদুর তেল,ভ্যাসেলিন, তিব্বত পমেড এগুলো সবই আছে আমাদের আমদানির তালিকায়।

এই যে এত কিছুর কথা বললাম, এগুলো ছাড়া কি জীবন থেমে থাকবে? বিদেশের মানুষ কি খাবার খায় না? পোশাক-পরিচ্ছদ, ক্রোকারিজ, মশলা সবই তো আছে। কসমেটিকস, তেল এগুলোর তো কোনো অভাব নেই কোনো দেশেই বরং উন্নতমানের, ভেজালমুক্ত পাওয়া যায়। দামের দিক থেকে দেশেরগুলোর চেয়ে অনেক সস্তা। এরপরও আমাদের চাহিদা হচ্ছে দেশীয় পণ্য। এখানে দেশপ্রেম থিওরি কতটা যুক্তিযুক্ত সেই বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ না করেও আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য ধরে রাখার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে কেউ কেউ প্রতীয়মান করতে চান। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনটিরই বিপক্ষে নই কিন্তু, আমাদের ঐতিহ্য কেবল খানাপিনা আর হান্ডি বাসন দিয়ে প্রকাশ করার চেষ্টাকে স্বাগত জানাতে পারি না। আমাদের রসনা বিলাস মেটানোর জন্য আমরা যতকিছু আমদানি করি তার কোনটিই অপরিহার্য নয়। এগুলো না হলে আমাদের সাংস্কৃতিক, সামাজিক কোনো সমস্যা হবে না। এরপরও যদি কেউ নিজস্ব খাদ্যাভ্যাস ধরে রাখতে চান, নিজেদের সংস্কৃতি কিছুটা হলেও ধারণ করতে চান আমি তাদেরকে সাধুবাদ জানাই।

আমাদের ঐতিহ্য কি কেবল এই খানাপিনাই? আর কি কোন ঐতিহ্য আমাদের নেই। সেগুলো ধরে রাখার জন্য আমরা কে, কী করছি?

আমাদের সমাজে সুন্দর একটি ভ্রাতৃত্ববোধ, সহমর্মিতা ছিল। সেগুলো কোথায় গেলো? আমি গ্রামের ছেলে, গ্রামেই জন্ম, বেড়ে ওঠা। ছোটবেলায় মাছ ধরতে যেতাম, গ্রামের অনেক মানুষই যেতেন। আসার সময় অনেক অপরিচিত মানুষ বলতেন দেখি তুমি কেমন মাছ ধরেছো? যদি দেখতেন মাছ কম কিংবা ভালো জাতের কোনো মাছ ধরতে পারিনি কোনো কথা না বলে উনার সেরা মাছটি দিয়ে আমার মাছের খলই ভরে দিতেন। কতদিন এমন হয়েছে বাড়ির সামনে মাঠে বসে আছি, কেউ একজন পাশ দিয়ে যাচ্ছেন হাওর থেকে মাছ ধরে এসেছেন। কেবল দেখতে চেয়েছি কী মাছ? মাছ দেখার খুবই আগ্রহ ছিলো আমার। উনার সবচেয়ে বড় মাছটি হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেছেন অথচ আমি উনাকে চিনি না। এমনকি উনার নামও বলে যাননি যাতে আমার মা/ বাবা চিনতে পারেন।

আমি আমার চাচার সাথে মাছ ধরতে যেতাম। আমরা একইসাথে দুইটি কাজ করতাম। একদিকে মাছ ধরতাম আর আরেকদিকে পুঁটিমাছ দিয়ে বড়শি ফেলে রাখতাম বক পাখি ধরার জন্য। প্রচুর বক পাখি পাওয়া যেতো আমাদের এলাকায়। একসাথে দশ / বারোটা নিয়ে বাড়ি আসতেছি যেকেউ রাস্তায় চাইলে দুই/চারটা দিয়ে চলে আসতাম। কারো জমি শুকিয়ে যাচ্ছে, জনবলের অভাবে সময়মতো জমিতে ধান রোপন করতে পারছে না। পাড়ার সবাই মিলে একসাথে সেই জমিতে ধান রোপন করে দিয়ে এসেছে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই শুধু একবেলা সবাই মিলে খানাপিনা করতেন। বন্যার সম্ভাবনা দেখা দিলে দলবেঁধে পাড়ার সব মানুষ জমিতে নেমে ধান কেটেছে, কার জমি, কে কাটছে কোনো হিসাব নেই – লক্ষ্য একটাই নিরাপদে শষ্য বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া।

বৈশাখ মাসে সবার বাড়ির সামনে ধান মাড়াই করার জন্য মাঠ (স্থানীয়ভাবে খলা নামে পরিচিত) প্রস্তুত করা হতো। গ্রামের প্রতিটি বাড়ির সামনে শতশত মন ধান পড়ে থাকতো। কখনও ধান চুরি হতে দেখিনি। হ্যাঁ কিছু চুরি হতো যদি সেই পরিবারে কোনো ইয়ং ছেলে থাকে, নিজেদের ধান নিজেই চুরি করতো। ফুটবল খেলার জার্সি, বুট, যাত্রাপালার চাঁদা, মেলায় যাবার জন্য পকেট খরচ ইত্যাদি ইস্যুতে কিছুকিছু ছেলেরা বাপের ধান চুরি করতো তবে মা থাকতেন সেই চুরির প্রধান সাহায্যকারী। আমার ছোট চাচাও আমাদের ধান চুরি করতেন তবে আম্মাকে আগেই বলে রাখতেন কখন অপারেশন হবে? কী পরিমাণ নিবেন?

গ্রামের কোনো বয়স্ক মানুষ অসুস্থ হলে সেই বাড়িতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষের লাইন থাকতো রোগীর খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য, কেউ খালি হাতে, কেউ আঙ্গুর, আপেল, কমলা, জেলী, শরবত যে, যা পারতেন নিয়ে যেতেন। গ্রামের কেউ মারা গেলে কবর খোঁড়া, দাফন কাফন, জানাজা সব দায়িত্ব পাড়া পড়শি নিজ দায়িত্বে করতেন। আমরা পাঁচদিন সেই পরিবারের সবাইকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাবার দিতাম, সংঙ্গ দিতাম।

গ্রামের কারো যেকোনো ফলের গাছে সবার অধিকার ছিলো সমান। আম, জাম, বরই, পেয়ারা কখনো আমাদেরকে চিন্তা করতে হয়নি কার গাছ? কী ভাববে? সামনে পেলেই নিজের মনে করে…। দেখা যেতো যার গাছ সে আরো একটু লবণ, বসার জন্য পিঁড়িটা এগিয়ে দিতো।

একবার ফাল্গুন মাসে আমাদের হাওড়ের সব জমি শুকিয়ে গেছে। অনেকদিন কোনো বৃষ্টিপাত হয় না প্রচন্ড খরার ফলে সব ফসল পুড়ে যাবার মত অবস্থা। আশেপাশে খালবিল সব শুকিয়ে গেছে। হঠাৎ একদিন মাঝরাতে আকাশ কালো করে বৃষ্টি এসেছে। আমার চাচা ঘুম থেকে ডেকে তুলে বললেন সবাই চলো হাওরে যাবো। সব জমি যাতে বৃষ্টির পানি পায় এবং ধরে রাখতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। কোথাও আইল বাঁধতে হবে, কোথাও আবার কেটে দিতে হবে; মোটকথা একফোঁটা পানিও যাতে জমির বাইরে না যায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা কোদাল, টর্চলাইট নিয়ে হাওরে ছুটলাম। গিয়ে দেখি পাড়ার অনেক মানুষ আমাদের আগেই পৌঁছে গেছেন। আমাদের সবগুলো জমিতে যা যা করার দরকার তার বেশিরভাগই উনারা করে ফেলেছেন। আমরা সবাই মিলে যতটা সম্ভব পুরো হাওরবাসী যাতে উপকৃত হয় সেই ব্যবস্থা করে তারপর কাকভেজা হয়ে ভোর রাতে বাড়ি ফিরেছি।

এই ভ্রাতৃত্ববোধ, অহিংসা, মমতা, সামাজিক বন্ধন, উদারতা সব গোল্লায় ভাসিয়ে দিলাম। আত্মীয়তার, আতিথেয়তার মানসিকতা ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। ‘আমাদের’ এই কনসেপ্টটিকে গলা টিপে হত্যা করে ‘আমার’, সবকিছুই আমার এই ভ্রম প্রতিষ্ঠা করলাম। বাঙালিয়ানার যত মধুর অহংকার ছিলো, যত গর্বের ঐতিহ্য ছিলো সব বিকিয়ে দিয়ে চরম স্বার্থপরতা আর দুর্নীতি আত্মস্থ করলাম।

এখন শুধু খাবারদাবার আর একখান লুঙ্গি কিনেই বাঙালিয়ানার ঢেকুর তুলি সেই ঢেকুরের সাথে আবার কীসের যেনো গন্ধ ভেসে উঠে!

লেখকঃ প্রবাসী সাহিত্যিক ও কলামিস্ট, সাউথ আফ্রিকা

 

আরও পড়ুন