বাবাদের চোখে জল আসে না

মোঃ রুহুল আমিন

রক্তের দামে ঘামের স্রোতে শরীর ভেজাতে পারে।

বাবা পৃথিবীতে একজন সন্তানের বটবৃক্ষ। সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর। আর মা হলো আদর স্নেহ ভালোবাসার অফুরন্ত কারখানা। মা ভালোবাসা দিয়ে সন্তানের মুখে হাসি ফুটায়।

পক্ষান্তরে বাবা হলো সন্তানের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দ্রষ্টা।
একজন সন্তান জন্মের পর মা পরম মমতায় আদর স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে বুকে জড়িয়ে রাখেন।
বাবা তখনই সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার চিন্তায় গভীর।
সারাদিন বিরামহীন পরিশ্রম করে শরীরের রক্ত ঘামে রূপান্তর করে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে সন্তানের দিকে তাকিয়ে দিনের ক্লান্তি ভুলে যায়।

সন্তান যখন বাবার কোলে উঠে হাসি দেয়,বাবা সমস্ত ব্যথা ভুলে যায় নীরবে।
অথচ বাবা তাদের ভালোবাসা মায়ের মতো করে প্রকাশ করতে পারে না।কারণ বাবাকে সন্তানকে মানুষ করতে শাসন করতে হয়,কখনো কখনো কঠোর হতে হয় সন্তানকে মানুষ করার প্রয়াসে।

কিন্তু ভালোবাসা মায়ের মতো করে বাবা সে ভাবে প্রকাশ করে না। বাবা ভেতরে ভেতরে কখনো কখনো ভেঙে চুরমার হয়ে যায় প্রকাশ করতে পারে না।
বাবা এমনই হয়। পরিশ্রম করে যায় সন্তানের সফলতার জন্যে। নিজের প্রতি খেয়ালই করে না বাবা,শুধু সন্তানের মঙ্গলের স্বপ্নে নিজের কথা ভাববার সময় হয় না।

এই পৃথিবীতে বাবা হচ্ছে সন্তানের জন্যে বটবৃক্ষের ছায়ার মতো,সারাক্ষণ অদৃশ্যের মতো ছায়ার হাত থাকে সন্তানের উপর।

মা জননী সন্তান লালন পালনে ব্যস্ত, বাবা ব্যস্ত সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে।

বাবা সকালে বেরিয়ে পড়েন অফিসে, ফিরেন সন্ধ্যা কিংবা রাতে,সন্তান তখন গভীর ঘুমে।
সব বাবা তো চাকুরিজীবি হয় না। বেশির ভাগ বাবাই কৃষক দিনমজুর। ফজরের নামাজ পড়ে ঘর থেকে বাহির হন জীবিকার অন্বেষণে, ফিরেন সন্ধ্যা কিংবা রাতে। সারাদিন প্রিয় কলিজার টুকরোটাকে দেখা হয়নি,মনটা তার কাছে পড়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা আর সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে বাবা সন্তানের চোখের আড়ালে লুকিয়ে থাকার কষ্টটা নিবৃত্তে সহ্য করে যান।

বাবা এই কষ্টগুলো কখনো প্রকাশ করেন না। হাসিমুখে মেনে নেন সামান্য অবসর সময়ে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে,ভুলে যান সকল অতৃপ্তির বেদনা।
শত কষ্টে ও বাবা চোখ ছলছল করলেও চোখের জল ফেলেন না। শক্ত নির্ভার হয়ে সামলে নেন সব অপূর্ণতার ব্যথা।

পৃথিবীর প্রতিটি বাবাই তার সন্তানটি রাজ পুত্র মনে করে,এতে কারো দ্বিমত নেই,ভিন্নতা শুধু আর্থিক সামর্থ্যের।
সব বাবা-ই স্বপ্ন দেখেন সন্তান মানুষ হবে, কখনো কখনো সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায় বাস্তবতার কঠিন খেলার নিয়মে।

তখন বাবা স্তব্ধ হয়ে যান,অনুশোচনার আগুনে পুড়তে থাকেন নীরবে নিবৃত্তে,অথচ কাউকে বুঝতে দেন না।

আমি আমার বাবাকে কখনো কাঁদতে দেখিনি,যখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি প্রবাসে পাড়ি দিবো,সবকিছুর পর যেদিন আমার ফ্লাইট ছিলো বাবাকে নিয়ে এয়ারপোর্টে পৌঁছালাম। বাবা বারবার জিজ্ঞেস করছে পাসপোর্ট টিকেট সবকিছু কিভাবে সামলে রাখবো। আরো নানা পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছিলেন অবিরত।
যখন আমার ইমিগ্রেশনে প্রবেশ করার সময় ঘনিয়ে এসেছে, হকারগুলো প্রাণ মেঙ্গোজুস বিক্রি করছিলো,শেষ বারের মতো জুস কিনে দিয়ে বলল খেয়ে নে তুই। আমি রিয়াল কিনে দিচ্ছি। যদিও আমি বারণ করেছিলাম।বাবা কোন কথাই শুনলেন না। জুস পান করা শেষে সবকিছু বুঝে নিয়ে বিদায় নেওয়ার সময় বাবা আমাকে বুকে জড়িয়ে হু হু করে কেঁদে উঠেছিলেন।
বিশ্বাস করুন এর আগপর্যন্ত আমার তেমন কোন কষ্টের অনুভূতি ছিল না। যেটুকু ছিলো শুধু দেশ ছেড়ে আপনজন ছেড়ে যাওয়ার কষ্টটা ছিলো।
বাবা কেঁদে উঠার পর আমার বুকটা যেনো ভারী হয়ে গেলো,আমি কিছু বলতে পারছিলাম না। আমার বুকে যেনো কষ্টের পাহাড় চেপে ধরে ছিলো।ইচ্ছে করছিলো আমি প্রবাসে যাবো না। অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়ে গেলো।আমি ইমিগ্রেশনে প্রবেশ করার পর কয়েক ঘণ্টা বাহিরে অপেক্ষা করেছিলেন বাবা।
ইমিগ্রেশনের সকল ফর্মালিটি সম্পন্ন করে যখন ওয়েটিং জুনে গিয়ে বসে ফোন করেছিলাম,তারপর বাবা বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে ছিলেন।
আমি সেই দিন অনুভব করেছিলাম বাবার ভালোবাসার গভীরতা। আমার বাবা খুবই রাগী মানুষ। বয়সের সাথে সাথে তার রাগে আজ ভাঁটা পড়ে গেছে।
কোনদিন বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলা হয়নি বাবা তোমায় ভালোবাসি।
যখন আমি প্রথম সন্তানের বাবা হলাম,তখন কিছুটা অনুভব করতে পেরেছিলাম বাবা হওয়ার অনুভূতি কেমন।একজন বাবা কি চান?
যখন কিশোর ছিলাম বাবার প্রতি অভিমান বেশ ভারী হয়ে জমেছিল।
যখন বাবা হলাম,সেই পাহাড় সরে গেছে।যখন প্রথম সন্তানকে জন্মের পর কোলে নিয়ে আদর করতে পারিনি,সে অপূর্ণতার কষ্টটা বাবা হিসেবে আমাকে এখনো পোড়ায়।
আমার মতো হাজারো প্রবাসী বাবাদের এই অপূর্ণতার কষ্টটা বয়ে যেতে হয় নীরবে নির্জনে একাকী।
আমরা সবাই মায়ের কোমলতায় ঘেরা ভালোবাসায় হারিয়ে গিয়ে যেন বাবার ভালোবাসা ভুলে না যাই।
বাবাকে সরাসরি কোনদিন বলা হয়নি ভালোবাসি বাবা, আজ পুরো পৃথিবীকে সাক্ষী করে বলে দিলাম,ভালোবাসি ভালোবাসি বাবা তোমায়,প্রচণ্ড ভালোবাসি।
ভালো থাকুক পৃথিবীর প্রতিটি বাবা সন্তানের আশ্রয়ের ছায়া হয়ে।

২৭/০৯/২০২০ইং

লেখকঃ কলামিস্ট ও প্রবাসী বাংলাদেশী, সৌদি আরব

 

আরও পড়ুন