“সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে” (আরবের ডায়েরি থেকে)

মাসুদ আলম

আল আইন শহরের হিলটন হোটেলের সামনের রাস্তা ধরে পূর্ব দিকে ওমান সীমান্তের দিকে যাচ্ছি। এলাকাটির নাম খাত্তাম শিকলা (Khatam-Al-Shikla), দুই দিকে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য। রাস্তার দুই ধারে সুপ্রশস্থ পায়ে হাঁটা পথের পরে তারচেয়েও অধিক প্রসস্থের সবুজ ঘাস যত্ন করে লাগানো এবং তারই মাঝে কিছু দূর পরপর আয়তাকার করে লাগানো আছে নানান জাতের নানান রংয়ের শীতকালীন ফুলের গাছ। তারপর একেবারে শেষ প্রান্ত ধরে লাগানো আছে গাঢ় সবুজ ঝাঁকালো বড়ই গাছের সারি। প্রতিটি গাছের শাখা ফলে ফলে নুয়ে পড়ছে। আর খেজুর গাছ গুলোও তরতাজা হয়ে সবুজের সমারোহকে অলংকৃত করে তুলেছে।
কিছু আরব পরিবারের মহিলা ও ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে সেই সবুজ ঘাসের উপর তাবু টানিয়ে মিষ্টি রোদ উপভোগ করছে।
আমি যতোবারই এই পথ ধরে চলেছি ততোবারই আমার কল্পনার জগত আচ্ছন্ন হয়েছে বাংলাদেশের কোন সবুজ গ্রামের মায়াবি রুপে।
প্রায় পনের মিনিট গাড়ি চালিয়ে আমরা পৌছেছি আল আইন উটের দৌড় (Camel race track) খেলার মাঠে কাছাকাছি।
অফিস ছুটির পর এই এলাকায় একটি বৈদ্যুতিক মিটারের খোঁজে এখানে আসা। মিটারটি কাগজপত্রে থাকলেও বাস্তবে খুঁজে পাওয়া যায়না। জিপিএস কোঅর্ডিনেট দেখালো একটি উজবা’র ভিতরে মিটারটির অবস্থান। আমাদের সার্ভে টিম মিটার খুঁজতে ব্যস্ত রয়েছে।
উজবা আরবি শব্দটির অর্থ হলো- পশুর খামার। এদেশে পশুপালন করা হয় আবাসিক এলাকা থেকে কমপক্ষে ১০ কিলোমিটার দূরে। তাই সকল পশুপালন খামার গুলো জনবসতি এলাকা থেকে দূরে কোন মরুভূমির মাঝখানে তৈরি করা হয়েছে। এসব উজবা গুলোতে আধুনিক সভ্যতার কোন ছোঁয়া নেই। বিদ্যুৎ নেই, পানির সংযোগ নেই, স্বাস্থ্য সন্মত শৌচাগার নেই, মাথার উপরের ছাউনিটাও ঠিকমতো থাকেনা। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারী এই চার মাস ব্যতিত প্রচন্ড সূর্যতাপের নিচে এখানেই পশুপালনকারীদের বসবাস করতে হয়।
সপ্তাহে একদিন তাদের আরবীয় মালিক খাদ্য সামগ্রী এবং পানির ট্যাঙ্কারে করে পানি পাঠিয়ে দেয়। কখনো কখনো তারা নিজেরাও তাদের খামার পরিদর্শনে চলে আসেন পরিবার পরিজন নিয়ে। এসব এলাকা গুলো একেবারেই জনবিরল। কদাচিৎ কোন গাড়ী প্রচন্ড ধূলো উড়িয়ে কাছ দিয়ে চলে যায়। আর যখনি কোন আগন্তুক এসকল পশুপালকদের কাছে গিয়ে সালাম বলে হাত এগিয়ে দেয় তখন সবার আগে তাদের মুখে একখানি অকৃত্রিম হাসি ফুটে উঠে। এমনও হয় যে মাস কেটে যায় তবুও বাহিরের কোন মানুষের সাথে তাদের দেখা হয়না। কখনো অতি প্রয়োজনে বাকালা’য় (মুদি দোকান) কিংবা মুস্তাসফা’য় (হাসপাতাল) যেতে হলে কয়েক ঘন্টা পায়ে হেঁটে কোন প্রধান সড়কে গিয়ে গাড়িতে উঠতে হয় আর নয়তো মরুভূমিতে আসা কোন গাড়িতে অনুরোধে চড়ার জন্য কয়েক ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
আর কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে যেতে নিজ আরবার (মালিক) কে ফোন করে গাড়ীর ব্যবস্থা করতে হয়।
তারাও মোবাইল ফোন চালায় তবে চার্জ দেওয়ার জন্য নিজ খরচে সোলার চার্জার কিনে নিতে হয়। আমি এমন অনেক কে দেখেছি যারা শুক্রবারে জুমার নামাজে এসে কোন দোকানে গিয়ে মোবাইল চার্জ দিয়ে বসে আছে। এভাবেই তাদের দিন গুলো কেটে যায়।
সূর্যাস্ত হলে তাদের উজবা ঘরে আঁধার নেমে আসলেও তাদের ক্লান্ত শ্রান্ত নয়ন জুড়ে আলো ঝলমলে হয়ে ফুটে উঠে দূর দেশে থাকা নিজের প্রিয়জনদের মুখটি।
আমরা আজ যে উজবা’য় এসেছি এখানে একই মালিকের তিনজন লোক কাজ করেন। কয়েক’শ দুম্বা, কয়েক’শ ছাগল গরু উট এবং হাঁস মুরগী কবুতর মিলিয়ে বেশ বড়সড় একটি খামার। এদেশের আরবরা একেকটি খামারের জন্য তাদের মোট পশুর সংখ্যার হিসেবে সরকারি ভাতা (প্রণোদনা) পেয়ে থাকে। কেননা তারা পশু খামারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখেন।
সকালের সব কাজ শেষ করে উজবা’র দুজন লোক শহরে গিয়েছেন, বাংলাদেশে টাকা পাঠানোর জন্য আর তৃতীয় জনের সাথে আমি এবং এক বাংলাদেশী ফোরম্যান বসে আলাপ করছি।
হাসি মুখে তিনি আমাদের সাথে কথা বলছেন। কি খাওয়াবেন কোথায় বসাবেন এটা নিয়ে উনি খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
একটি গাফ্ গাছের নিচে একটি বিধ্বস্ত কেদারায় তসরিফ এনেছি। কেদারাটির বয়স নিয়ে আমি কোন প্রশ্ন তুলতে চাইনি কিন্তু আমার অনুসন্ধানী মন বারংবার কেদারাটি কিভাবে এখনো চারপায়ে দাঁড়িয়ে আছে তা জানতে চেয়েছিল! ওহ্, গাফ্ গাছ হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় গাছ। তেঁতুল গাছের মতো আকার আকৃতির এবং তেমনি যৌগিক পত্র বিশিষ্ট গাঢ় সবুজ গাছ। গোলাপ কাঁটার মতো নতুন গজানো শাখায় অল্পবিস্তর কাঁটা দেখা যায়। জুন জুলাই মাসের ৫০° সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ও তপ্ত মরুভূমির বুকে সবুজ পাতা মেলে লুহাওয়ার ছন্দে ছন্দে দুলী আনন্দে এই গাছ গুলো শাখা দোলাতে থাকে। এর মানে হলো এইগাছ গুলো খুবই কষ্ট সহিষ্ণু, আর তাই এটিকেই এদেশের জাতীয় গাছের মর্যাদা দেয়া হয়েছে।
উজবা’র লোকটি প্লাস্টিকের গেলাসে করে এক গেলাস দুধ নিয়ে এসে বললেন- উটের দুধ, কাইন…( উটের দুধ, খান…)
তার অমায়িক আতিথিয়েতা ফিরিয়ে দিতে পারিনি। গেলাসটি সম্ভবত বাংলাদেশের জাতীয় শহীদ মিনারের মতো বছরে একবাই পরিষ্কার মতান্তরে ধোয়া হয় আর তখনই মনে হয় ধোয়া হয় যখন আমাদের মতো কোন আগন্তুক এসে এই গাফ্ গাছটির নিচে হাফ ছেড়ে বসে।
দুধ পান করে বললাম ভাইয়ের নাম কি?
ঃ ইব্রাহিম মোহামেদু
ইব্রাহিম মাহমুদ?
ঃ হ্, ঐ রকম ই….
বাড়িতে পরিবার পরিজন সবাই ভালো তো?
ঃ জি, ভালোই….
বাড়ী কোথায়?
ঃ নায়িমা (অথবা নাইমা হবে…)
কোন জেলায়, কোন থানায়, আমি তো সিলেটের সব এলাকা চিনিনা?
ঃ খইলাম তো… নায়িমা….(বলেই মুচকি মুচকি হাসছেন)
না ভাই, বাংলাদেশে এমন কোন জেলা বা থানার নাম আমি শুনিনি…!
ইব্রাহিম ভাই এবার খিল খিল করে হেসে উঠে সিলেটের খাঁটি আঞ্চলিক ভাষায় বললেন- কুস্তা খইরা শুনবাইন আমার বাড়ি ত সিলেট না, আমার বাড়ি তো অইল মৌরিতানিয়া, নায়িমা ডিস্ট্রিক্ট! (সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা আমার জানা নেই)
এবার আমি বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ হেরে যাওয়া অধিনায়কের মতো ঠোঁটের কোণায় হাসি টেনে বললাম- ইব্রাহিম মোহামেদু ভাই বাংলা ভাষা শিখলেন কিভাবে?
বললো- সাত বছর ধরে দুই সিলেটি ভাইয়ের সাথে থেকে থেকে শিখে ফেলেছি….
… আপনার মুখে বাংলা ভাষা শুনে খুবই ভালো লাগলো… একদিন বাংলাদেশে বেড়াতে যাবেন।
ঃ ঐ দুজন আমাকে বলেছে তাদের দেশে আমারে নিয়া যাইবো…
হঠাৎ খবর এলো মিটারটি পাওয়া গেছে। প্রায় সাড়ে তিন ফুট বালুর নিচে পড়ে আছে থ্রি ফেইজ এলিস্টার মিটারটি। এখানে বিদ্যুৎ নেই, কিন্তু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মিটার স্থাপন করা হয়েছে।
কাজ শেষে আমরা ফিরে চললাম। ইব্রাহিম মোহামেদু দুই হাতে দুটি লাউ আর কোমল পানির খালি বোতলে করে উটের তাজা দুধ নিয়ে এসে গাড়ির সামনে দাড়ালো, বললো নিয়া জান….
সাদরে তার উপহার গ্রহণ করে কিছু নগদ টাকা তার পকেটে ঢুকিয়ে দিলাম।
আমরা ফিরে চলেছি, অনেকটা দূর এসেও পিছনে তাকিয়ে দেখলাম ইব্রাহিম মোহামেদু সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। অনেক দূর হতেও তার উসকোখুসকো চুল আর হলুদ দাঁতের হাসি দেখা যাচ্ছিলো। এক হাত উঁচু করে আটলান্টিকের বাতিঘরের মতো দাঁড়িয়ে আছে ইব্রাহিম মোহামেদু। হয়তো তার চোখে তখন ভাসছে মহাদেশ পেরিয়ে আসা নিজ গায়ের কোন প্রিয়জনের বিদায়ের দৃশ্য।
ধূলা উড়িয়ে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলছে পশ্চিম দিকে, আর পিছনে দাঁড়িয়ে আছে পড়ন্ত সূর্যের আলোয় ঝলমল করা ওমানের সোনালী পাহাড় গুলো….আর হয়তো সিলেটি মৌরিতানিয়ান…..
ধন্যবাদ

লেখকঃ কলামিস্ট  ও প্রবাসী বাংলাদেশী, আল আইন, ইউএই

আরও পড়ুন