সালমা, আনিতার ভালবাসা কিংবা আফগান বিরিয়ানীর গল্প

মাসুদুল হাসান রনি 

মেয়ে দু’টোর সাথে আমার পরিচয় খুব বেশীদিনের নয়। মাস তিনেক আমরা একসাথে কাজ করি। প্রতিদিন যে খুব একটা কথা হয় তাও না। হাই হ্যালো, কেমন আছি, উইকএন্ড কেমন কাটলো, এসব মামুলি কথাবার্তাই হতো।কিন্তু গত দুই সাপ্তাহ যাবত মেয়ে দু’টোর সাথে লাঞ্চব্রেকে ক্যাফেটেরিয়ায় টুকটাক কথা হতে হতে আমাদের মাঝে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সেই সুত্রে জানতে পারি মেয়ে দু’টো আপন বোন। বড়জনের নাম সালমা আবেদী ও ছোটজনের নাম আনিতা আবেদী। সালমা আমার সমবয়েসী হবে। আনিতা মাত্রই গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছে। ওরা এসেছে আফগানিস্থানের কান্দাহার প্রদেশ থেকে।

কান্দাহার শুনে আমি আবেগাপ্লুত হই। ১৯৮৭ সালে কান্দাহার নিয়ে একটি ছড়া লিখেছিলাম। দৈনিক খবরের শাপলা দোয়েলের পাতায় আলী ইমামভাই ছেপেছিলেন। পরে এটি আমার ছড়ার বই চাপাবাজীতে স্থান পেয়েছে। ছড়াটি যখন লিখেছিলাম, তখন আফগানিস্থান যুদ্ধ বিগ্রহে বিধ্বস্ত। কাবুলের পর কান্দাহার প্রদেশ ছিল সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ। বারবাক কারমালের শাসনামলে এখানে গেরিলা যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ মারা পড়েছিল । সেই সময় ছড়াটি লিখেছিলাম যুদ্ধ থেকে না ফেরা সন্তানের পথচেয়ে থাকা কোন এক মাকে নিয়ে।

সালমা ও আনিতাকে ছড়াটি প্রথমে বাংলায় শুনিয়ে পরে গুগল ট্রান্সলেট থেকে ইংরেজী অনুবাদ শোনালে তারা দারুন আনন্দিত হয়। ওদের বাবা আবেদী ছিলেন উদারচিন্তার মানুষ। কান্দাহারের একটি সেকেন্ডারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। নারী শিক্ষায় ছিল তার প্রবল আগ্রহ ও উৎসাহ। তাই তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেছে উগ্র মৌলবাদী তালিবানরা। স্বামীর মৃত্যুর পর ১০ ছেলে মেয়ে নিয়ে সালমার মা ভয়ে কান্দাহার ছেড়ে পাশ্ববর্তী রাস্ট্র পাকিস্তানের পেশোয়ারে পালিয়ে আসেন। দীর্ঘ দুই বছর সেখানে অমানবিক, দুঃসহ জীবনের অবসান ঘটিয়ে ২০১৪ সালে চলে আসেন কানাডায়।

সালমারা মন্ট্রিয়েলের পাশের শহর লাভালে থাকে। পাঁচ ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে সালমাই সবার বড়। বোনদের মধ্যে আনিতা সবার ছোট। ওদের মা কঠোর পরিশ্রম করে সন্তানদের মুখে শুধু আহারই জোটায়নি, ছেলেমেয়েদের পড়াশুনোর জন্য কঠোর নজরদারি করেছেন।সব ছেলেমেয়েই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। এখনো তিন ছেলেমেয়ে পড়াশুনো করছে।

ওদের সাথে পরিচয়ের পর আমাদের ঘনিষ্টতা বেড়েছে আমার কৌতুহলের কারনে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমি আফগানিস্তানের জীবন মান, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিধিনিষেধ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও খেলাধুলা নিয়ে নানান প্রশ্ন করে করে কত কিছুই জানতে চাইতাম।আমার প্রশ্ন শুনে দুইবোন কখনোই বিরক্ত হয়নি। বেশীরভাগ সময় আনিতা উত্তর দিয়ে আমার জানার আগ্রহের ক্ষুধা নিবারন করে।

ক’দিন আগে কথা হয়েছে আফগানদের প্রাত্যহিক ও ঐতিহ্যবাহি খাবার নিয়ে। সেই সময় দু’বোনই জেনে যায় বাংলাদেশের মানুষের খাবার দাবার ও আমার প্রিয় খাবার কি কি।
লং উইকএন্ড শেষে সোমবার সকাল থেকে আমরা একসাথে কাজ করি। কিন্তু ঘুর্নাক্ষরেও বুঝতে পারিনি লাঞ্চব্রেকে আমার জন্য কি সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে!
লাঞ্চব্রেকে আমি যখন ক্যাফেটেরিয়ার কিচেনের মাইক্রোওভেনে খাবার গরম করতে যাচ্ছি, তখন সালমা পথ আগলে দাঁড়ায়।
– লিসেন, কিপ ইয়োর লাঞ্চবক্স ইনসাইড দ্যা ব্যাগ।জাস্ট ওয়েট, আনিতা ইজ কামিং হেয়ার।
আমি জানতে চাই, বাট হোয়াই? এনি প্রোবলেম?
– ইয়েস। ইউ মেড এ বিগ প্রোবলেম।
সালমা হাসতে থাকে। মাস্কের জন্য তার হাসি দেখা যায় না। চোখ মুখে দুস্টুমি খেলা করে।
আমি কিছু না বুঝে এদিক ওদিক তাকাই। হলওয়ে ধরে আনিতা আমাদের দিকে আসছে। হাতে তিনটে লাঞ্চবক্স। সোশ্যাল ডিস্টেন্স রেখে আনিতা দাঁড়ায়।ওর হাত থেকে একটি বক্স নিয়ে সালমা আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়।
– টেক ইট এন্ড এনজয় ইয়োর লাঞ্চ। প্লিজ ওপেন এন্ড লেট সি, হোয়াট ইজ ইনসাইড দ্যা বক্স।
আমি দ্বিধা নিয়ে বক্সটি খুলতে আফগান বিরিয়ানির মৌ মৌ গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

বিরিয়ানি যে আমার অসম্ভব প্রিয় খাবার, এটা ওরা দুইবোনই জেনেছে কয়েকদিন আগে। কিন্তু আজকের লাঞ্চে ওরা ল্যাম্ব সহযোগে আফগান কাচ্চি নিয়ে আসবে কল্পনায়ও ছিল না।বিরিয়ানির বক্স হাতে নিয়ে আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ি। বহুবার মানুষের অসামান্য ভালোবাসায় আমার চোখ ভিজেছে।বিদেশের মাটিতে এরকম চোখে পানি আসবে কখনো ভাবিনি।

বাংলাদেশের বাহিরে ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্কের বিরিয়ানী খাওয়া হয়েছে।কিন্তু এই প্রথম আফগান বিরিয়ানির স্বাদ পেলাম কিসমিস,পেস্তা,খুরমা,বাদাম, আখরোট সহযোগে ল্যাম্ব বিরিয়ানি আসলেই অসাধারন ছিল।

২২.০২.২০২১
পুনশ্চঃ কর্মস্থলে ছবি তোলা নিষিদ্ধ বলেই দু’বোনের ছবি তোলা হয়নি।
২. ছড়াটি দিলাম বই থেকে ছবি তুলে।

লেখকঃ প্রবাসী লেখক ও সাহিত্যিক,মন্ট্রিয়েল, কানডা

আরও পড়ুন