ঋণ

মঞ্জুর চৌধুরী

মানুষের কয়টা জন্ম হতে পারে? এটা জবাব দিতে ভাবনা চিন্তা করতে হয় না, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, জ্ঞানী-মূর্খ সবাই জানে এর জবাব। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ ভাগ্যবান হয়। তাঁদের পুনর্জন্ম হয়!

আমি সাধারণ এক চাকরিজীবি মানুষ। বেতন যা পাই, তা দিয়ে ঢাকা শহরে কোন রকমে মাথা বাঁচিয়ে ভেসে আছি বলা যায়! আমার স্ত্রী নীলা, আমি আদর করে যাকে নীলু ডাকি, সংসারে সাহায্য করতে একটা স্কুলে টিচারের চাকরি নিয়েছে। ঢাকা শহরে অলিতে গলিতে ছত্রাকের মত গজিয়ে উঠা স্কুলগুলির এই এক সুবিধা, নীলুর মত গৃহিনীরা সেখানে কাজ করে সংসারে আয় বৃদ্ধি করতে পারছে।

আমাদের সংসার বাগানে একটাই মাত্র ফুল। আমার চোখের মণি তানিশা! মনে হয় এই তো সেদিন আমার আঙ্গুল ধরে হাঁটা শিখেছে, অথচ এখন কিনা সে ক্লাস থ্রীতে পড়ে! সন্ধ্যায় মাথা দুলিয়ে রবি ঠাকুরের কবিতা মুখস্ত করে, “তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে…”

মানুষ বলে সময় নাকি গড়িয়ে গড়িয়ে চলে। সেটা হয়তো আদি যুগের কথা। এখন সময় প্লেনের মতই উড়াল মারে!

মধ্যবিত্তের সংসারে কারো অসুখ হলে তা উপেক্ষা করতে হয়। যেন কিছুই হয়নি এমন ভান করতে হয়। অসুখ হলেই তো ডাক্তার, ওষুধ, আর ভাগ্য খারাপ হলে টেস্ট ফেস্ট ইত্যাদি! শুধু শুধু পয়সার অপচয়! শরীর নিজে নিজে যা পারে ব্যবস্থা একটা করে। বেশির ভাগ সময়েই রোগ আপনাতেই সারে।

আমারও তাই প্রথম প্রথম যখন জ্বর আসতো, তখন ভাবতাম সামান্য জ্বরই তো, সেরে যাবে দ্রুত। ওষুধ খেয়ে ফেলতাম। প্যারাসিটামল। একটায় কাজ না হলে দুটা। জোর করে জ্বর নামাতাম। তারপরে যখন দেখলাম দূর্বল দূর্বল লাগতো, ক্লান্ত লাগতো খুব, ভাবতাম খুব বেশি পরিশ্রম হচ্ছে বলেই এমন হচ্ছে। একটা ভাল ঘুম দিলেই শরীর ঝরঝরে হয়ে যাবে! কিন্তু দিনের পর দিন এমন চলতে থাকায় একদিন বাধ্য হয়েই গেলাম ডাক্তার দেখাতে।

ডাক্তার বেশ কিছু টেস্ট করতে দিয়ে দিল। শুধু শুধু এতগুলো টাকা খরচ গেল! হিসাবের টাকা! এইবার মাসিক সঞ্চয়ে টান পড়বে!

গরীবের যে রোগ হতে নেই, আমার সেই রোগ হল। রিপোর্ট দেখে ডাক্তার খুব গম্ভীর মুখ করে বলল, “আপনার সাথে কি কেউ আছেন? উনার সাথে একটু কথা বলতাম!”

ডাক্তারের বলার ভঙ্গি দেখেই আমি বুঝে গেলাম যে আমি বড় সড় বিপদ ঘটিয়েছি। শুকনো গলায় বললাম, “আপনি আমাকে বলতে পারেন স্যার, আমার কি কোন বড় আসুখ হয়েছে?”

ডাক্তার বললেন, “না, মানে এখনও তেমন কিছু না, তবে…আচ্ছা, আপনার ভাই বা বন্ধু কেউই নেই আপনার সাথে?”

আমি অধৈর্য্য হয়ে পড়লাম। বললাম, “স্ত্রী আছে, কিন্তু বড় কোন রোগের কথা শুনলে ঝামেলা কমার থেকে বাড়বে বেশি। আপনি আমাকে বলতে পারেন। আমি ভয় পাবো না। যা করার, খুব ঠান্ডা মাথায় করতে পারবো।”

ডাক্তার কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন, “সহজ ভাষায় বললে, আপনার শরীরে একটা টিউমার ধরা পড়েছে। যা ক্যানসারে রূপ নিয়েছে। আপনি যদি আরও আগে আসতেন, তাহলে আমরা অপারেশন করে টিউমার ফেলে দিতে পারতাম। এখন ক্যানসার হওয়ায় ব্যপারটা একটু জটিল হয়ে গেছে।”

আমি যেন এটাই আশংকা করেছিলাম। তাই খবরটা শোনার পর সাথে সাথে ভেঙ্গে পড়লাম না। খুব শান্ত গলায় বললাম, “আমার হাতে আর কতদিন সময় আছে স্যার?”

ডাক্তার অভয় দেয়ার চেষ্টা করলেন। বললেন, “এত নার্ভাস হবেন না। ভয় নেই। আজকাল ক্যান্সার সারানো যায়। কেমোথেরাপীতে ক্যানসার দমানো সম্ভব। তারপরে একটা অপারেশন! ওটা নিয়ে চিন্তা করবেন না। তবে আমি সাজেস্ট করবো, আপনি অতি দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। পারলে দেশের বাইরে কোথাও। যত দ্রুত সম্ভব!”

বাসায় আসলাম বাসে চড়ে। প্রচন্ড ভিড় বাসে। গাদাগাদি করে লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। আমিও দাঁড়ানো। হঠাৎই মনে হলো আর কয়েক মাস পরেই আমি থাকবোনা। এই ভিড়ের মধ্য থেকে একজন মানুষ হঠাৎ হারিয়ে যাবে। কেউ কি লক্ষ্য করবে সেটা? না, করবে না। নিজেকে বড়ই সাধারণ মনে হল তখন! বাড়ি আসা পর্যন্ত আমি স্বাভাবিক রইলাম। নীলু জিজ্ঞেস করলো, “ডাক্তার কি বললেন?”

আমি বললাম, “কিছু না। সামান্য দূর্বলতা। হরলিক্স খেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”

সে আর কিছুই জিজ্ঞেস করলো না। বেচারি! এতদিন সংসার করার পরেও আমার ছলনা ধরতে পারলো না।

কিন্তু রাতে তানিশাকে পড়াতে বসেই আমি ভেঙ্গে পড়লাম। এই মেয়ে একদিন ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার হবে। কোন রাজপুত্রের সাথে রাজকন্যা সেজে তার বিয়ে হবে। তার কোল আলো করে পৃথিবীতে আসবে দেবশিশু। সেদিন আমি থাকবো না তার পাশে! এই যে এখন সে অংক শিখছে, বছর শেষের ফাইনাল পরীক্ষায় যখন সে বসবে এবং প্রশ্নপত্রে এই অংক দেখবে, তাঁর কি মনে পড়বে না যে এর সমাধান তাঁকে তাঁর বাবা শিখিয়েছিলেন! যে এখন পৃথিবীতে নেই!

আমি বারান্দায় ছুটে গেলাম। চোখের পানি দেখতে দেয়া যাবেনা। শিশুদের কান্নায় সবাই হাসে, বড়দের কান্নায় সবাই আতংকিত হয়।

আমি টাকা পয়সার হিসেব করতে বসেছিলাম। আমার ব্যাংকে পাঁচ লাখ টাকার মত আছে। যা দিয়ে ক্যানসার সারানো অসম্ভব। আর এই টাকা তুলে ফেললে এই পরিবার একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাবে। আমি তো মরে গিয়ে বেঁচে যাবো, নীলু আর তানিশা পড়বে তখন মাঝ সমুদ্রে। মানুষের কাছে সাহায্য পাবো, সেই আশাও বাদ দিলাম। আজকাল মানুষ আর মানুষের বিপদে এগিয়ে আসে না।

আমি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাই। আশেপাশের বিপণি বিতানগুলো দেখি। এরা সাজসজ্জার পিছনেই কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে। কিংবা কোন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির কথাও চিন্তা করি। কোটিকোটি টাকা সেসবে খরচ হয়। ধর্মীয় ওয়াজ মাহফিল দেখেও হতাশ হই। কত্তগুলো মাইক! সাথে প্যান্ডেল। আলেমদের জন্য কোথাও কোথাও হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা! ওর এতটুকু অংশেই আমার মত অভাগার চিকিৎসা সম্ভব হত! আমার সাথে আরও দুটা প্রাণ বেঁচে যেত!

মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় কবে কোথায় অপচয় করেছি।

কী অদ্ভুত! যখন সুস্থ হয়ে দিব্বি ঘুরে বেড়াতাম, তখন এসব চিন্তা মাথাতেই আসেনি।

আমি চোখে এখন অন্ধকার দেখি। কোথাও কোন সাহায্য পাচ্ছি না। ঘড়ির কাঁটার টিক টিক শব্দে বুক কেঁপে কেঁপে উঠে। এ যেন আমাকেই হুঁশিয়ার করছে। বলছে আমার সময় কতটা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে!

ধর্ম চিন্তাও আমাকে পেয়ে বসলো। উপরে গেলে যখন আল্লাহ্ জিজ্ঞেস করবেন কী করেছি জীবনে, কী জবাব দিব? ভাল কিছুইতো করতে পারিনি জীবনে!

ধর্মকর্মে মন দিলাম। ফজরের সময়ে উঠে নামাজ পড়তে লাগলাম। রাতে ঘুম আসে না, তাই তাহাজ্জুদও পড়ি। মেয়ের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর কাছে শুধু এটাই প্রার্থনা করি, আমার লাগানো চারা গাছে যেন ফুল ফুটতে দেখে যেতে পারি!

নীলু একদিন ফাইলপত্র ঘাঁটতে গিয়ে বের করে ফেলল আসল খবর। সে অনেক কান্না করলো। অত্যন্ত দুঃসময় যাচ্ছে আমাদের। তানিশাকে বুঝতে দিচ্ছিনা। বেশি বেশি করে সময় কাঁটাতে লাগলাম সংসারের মানুষদের সাথে। তানিশাকে জড়িয়ে ধরে হঠাৎ হঠাৎ কেঁদে উঠি। মেয়ে আমার বুঝতে পারেনা তার বাবা কেন এমন করে। একদিন প্রশ্নই করে ফেলল যে আমি কি মারা যাচ্ছি নাকি। চমকে উঠে বললাম, “এমন প্রশ্ন কেন আসলো তাঁর মনে?”

বলল, “তুমি কাঁদো, আম্মু কাঁদে। তাই।”

আমি নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করি। নীলু পারেনা, সে এখনও লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে। আমি আকাশের দিকে মাথা তুলে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাই। যিনি পুরো বিশ্ব জগৎ নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁর কী সময় আছে আমার মতন তুচ্ছ প্রাণীর দিকে তাকাবার? আমার আঁকুতি শোনার? দুয়ারে মৃত্যু টোকা দিচ্ছে। আর কত সময় তাকে বাইরে আটকে রাখতে পারবো?

এক সকালে আমার বাসার কলিং বেল বেজে উঠলো। দরজা খুলে দেখি আমার বাবা একটা স্যুটকেস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মা মারা যাবার পরে বাবা গ্রামের বাড়িতে থাকেন। একা। আমি তাঁর একমাত্র সন্তান। একসময় নিয়মিত চিঠিতে যোগাযোগ হত। অনেকদিন আমি কোন চিঠি লিখিনা। তিনি প্রায়ই লিখতেন। গ্রামের খবর দিতেন।

“সরকার বাড়ির ছোট মেয়ের বিবাহ সম্পন্ন হইয়াছে। পাত্র বিদেশে থাকে।”

কিংবা “আমাদের গাঁই একটা ফুটফুটে বকনার জন্ম দিয়াছে।”

আমি কখনও সেইসব চিঠি পড়েছি, কখনও খাম শুদ্ধ টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিয়েছি। পড়া হয়নি। আজ অনেকদিন পর বাবাকে দেখে মনে হাহাকার জেগে উঠলো! আহারে! তাঁর সাথে কী অবিচারটাই না করেছি! বৃদ্ধ বয়সে একা একা কিভাবে আছেন, একমাত্র সন্তান হবার পরেও জানার তাগিদটাও অনুভব করিনি! একসময় গ্রামের বাড়িতে যেতাম ঈদ করতে। গত পাঁচ বছর ধরে ঈদগুলোও ঢাকাতেই করছি। বাবার সাথে শেষ দেখাও তো সেই পাঁচ বছর আগেই!

বাবা এসে সাধারণ খোঁজখবর নিলেন। তানিশাকে নিয়ে কিছুক্ষণ খেললেন। নামাজ পড়লেন। তারপর এক ফাঁকে আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন যে, নীলু তাঁকে সব চিঠিতে জানিয়েছে। তিনি দেশের বাড়ির সব সম্পত্তি বিক্রি করে ফেলেছেন। নিজের ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট খালি করে টাকা নিয়ে এসেছেন। এতে যে টাকা হবে তাতে আমার চিকিৎসা হয়ে যাবার কথা। বাকি ভরসা আল্লাহ্ পাক!

আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলাম! বাবা আমার চিকিৎসার টাকার ব্যবস্থা করে ফেলেছেন! আমি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকার সুযোগ পাচ্ছি! আনন্দে দিশেহারা হয়ে আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম! বাবা বললেন, “বাপ বেঁচে থাকতে তুই কেন চিন্তা করিসরে ব্যাটা?”

বাবা আর তানিশাকে দেশে রেখে আমি আর নীলু রওনা হলাম ভারতে। দিল্লি। কেমোথেরাপি চলল কয়েকমাস ধরে। মাথার চুল পড়ে গেল। নতুন চুল গজানোর সাথে সাথে আমিও সুস্থ্য হতে লাগলাম! কে বলেছে মানুষ একবার মাত্র জন্মায়? এই যে আমি দ্বিতীয়বার জন্মালাম!

দেশে ফিরেই আবার নতুন জীবন শুরু করলাম। সব কিছুই ভাল লাগতে লাগলো। রাস্তার ট্র্যাফিক জ্যাম, বাসের ভিড়, শহরের শব্দ দূষণ, ফেরিওয়ালার ডাক…সব কতই না মধুর! সবচেয়ে মধুর বুক ভরে নিঃশ্বাস নেবার অনুভূতি!

বাবা আমাদের ফ্ল্যাটেই থেকে গেলেন। উনারতো কোথাও থাকার জায়গাও নেই! তবে খুব দ্রুতই আমাদের সংসারে ছন্দপতন হতে লাগলো। বাবা ফজরের নামাজ পড়তে উঠেন, অযুর সময় শব্দ হয়, নীলুর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে। আমাদের দুই রুমের ঘরে বাবা আর তানিশা এক ঘরে ঘুমায়। তানিশা বড় হচ্ছে। তাঁর আলাদা ঘর লাগবে। বাবা থাকায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না। তিন রুমের বাড়ি ভাড়া করবো, সেই সামর্থ্যও তো নেই! রাতের বেলা বাবা কাশেন, সেটাতেও ঘুমে সমস্যা হয়! আমার বেঁচে থাকার পিছনে যে বাবার সবচেয়ে বড় অবদান, সেটাই আমরা অতি দ্রুত ভুলে গেলাম!

বাবার দিকে খেয়াল রাখা হয় না। বাবা ধীরে ধীরে অসুস্থ্য হলেন, লক্ষ্য করিনি। একসময় দেখি উনারও প্রচন্ড জ্বর। প্যারাসিটামল খাইয়ে দিতাম। একদিন যখন দেখলাম উনার পা ফুলে ঢোল হয়ে গেছে, তখন টনক নড়লো। কিন্তু নিবো নিবো করেও ডাক্তারের কাছে নেয়া হয়না। একদিন গেলাম সরকারি হাসপাতালে। ডাক্তার বিভিন্ন টেস্ট করে বললেন, “উনার কিডনী সমস্যা। দুইটা কিডনীই প্রায় অকেজো হয়ে গেছে। দ্রুত ট্রান্সপ্ল্যান্ট না করালে বাবাকে বাঁচানো যাবেনা!”

বাবাকে জানালাম না ঘটনা। বুড়ো মানুষ, টেনশন বাড়িয়ে লাভ নেই। নীলুকে জানালাম। চিকিৎসার জন্য একটা উপায় বার করতেই হবে। কিডনী ট্রান্সপ্ল্যান্ট সহজ নয়। কিডনী ম্যাচ করাটাতো সবচেয়ে বড় সমস্যা! তার উপর আছে খরচাপাতির ব্যপার। কেউ তো বিনে পয়সায় তার কিডনী বেঁচতে চাইবেনা। সাথে চিকিৎসার খরচ তো আছেই!

ডাক্তার আরেক পরীক্ষা থেকে জানালেন আমার সাথে বাবার কিডনী ম্যাচ করে। আমি যদি আমার একটা কিডনী দিয়ে দেই, তাহলে বাবা বেঁচে উঠবেন! আমি কিছু বলার আগেই নীলু আমাকে বাঁধা দিল। ওর যুক্তিও ফালতু না। বাবার এমনিতেই বয়স হয়েছে, আর কতদিনই বা বাঁচবেন। আমি যদি আমার একটা কিডনী দিয়ে দেই, এবং ভবিষ্যতে আল্লাহ্ না করুন, কখনও আমার বাকি কিডনীটাও নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে ওদের কি হবে!

আমি ঝামেলা এড়াতে নীলুর বিপক্ষে গেলাম না। কিন্তু সমস্যা হল অন্য জায়গায়। ছোট বাসা বলে বাবা নীলুর কথাগুলো শুনে ফেলেছেন! তিনি আমাকে এক সময় উনার ঘরে ডেকে নিয়ে বললেন, তাঁকে নিয়ে চিন্তা না করতে। তিনি ঠিক আছেন। তিনি চান না তাঁর চিকিৎসা হোক। বরং তিনি তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের সাথে থাকার সুযোগটা চান। তাঁর এইটুকু অনুরোধ যেন আমি রাখি!

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম! বাবাকে কিছু বললাম না। অফিসে মন দিতে পারিনা। খেতে বিস্বাদ লাগে। কোন কিছুই ভাল লাগেনা। আমার জন্মদাতা, যিনি দুবার আমাকে জীবন দিয়েছেন, তাঁর এই মহাবিপদেও আমি স্বার্থপরের মত চুপ মেরে আছি! আত্মদংশন আমাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে! কিন্তু স্বার্থপর না হয়েও বা উপায় কি? আসলেইতো, বাবা আর বড়জোর দশ বছর বাঁচবেন। আমাকে তো একটা লম্বা জীবন যাপন করতে হবে। তানিশার বিয়ে দিতে হবে। আমার কিছু হয়ে গেলে নীলুতো একদমই একা হয়ে যাবে! আর কিডনী ট্রান্সপ্ল্যান্টেওতো অনেক খরচ। সঞ্চয়ের সব টাকা ওখানেই চলে যাবে। অতি দ্রুতই আবার শুন্যতে পৌছে যাবো। আমারওতো বয়স হচ্ছে। শুন্য থেকে শুরু করলে আর কতদূরই বা আগাতে পারবো?

এজন্যই কী লোকে বলে, এক বাপ দশ সন্তানকে পালতে পারেন। কিন্তু দশ সন্তান মিলেও এক বাপকে পালতে পারেনা?

অফিস ছুটি হবার আগেই বাড়িতে ফিরলাম। বাবার ঘরেই সরাসারি হাজির হলাম। বাবা বিছানায় শুয়ে ছিলেন। চোখ বোজা। ব্যথায় তাঁর মুখ বিকৃত হয়ে আছে!

আমি তাঁর কপালে হাত রাখলাম। গা বেশ গরম। তিনি চোখ মেলে তাকালেন। আমি বললাম, “কেমন আছো বাবা? ব্যথা কমেছে?”

বাবা হাসার চেষ্টা করে বললেন, “ভাল আছিরে ব্যটা! আগের চেয়ে অনেক ভাল। ব্যথা একদমই নেই। দ্যাখ্, ফুলাও অনেক কমেছে।”

তিনি তাঁর পা দেখালেন।

আমার বাবা এখনও ঠিক মত মিথ্যা বলতে শিখেননি। আমি না বুঝার ভান করে বললাম, “সুখবর আছে বাবা! তোমার কিডনী ডোনার পাওয়া গেছে!”

বাবা নড়েচড়ে উঠলেন। অবিশ্বাসী গলায় বললেন, “বলিস কি?”

আমি হাসি আরেকটু বিস্তৃত করে বললাম, “হাসপাতালে একটা বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া গেছে যা তোমার কিডনীর সাথে মিলে। তুমি আবার সুস্থ্য হয়ে উঠবে!”

ইচ্ছা করেই নিজের কথা বলিনি, বাবা আমার কিডনী নিতে রাজি হবেন না। বেওয়ারিশ লাশের কিডনি যে কেউ নিতে পারে কিনা জাতীয় টেকনিক্যাল ব্যাপার স্যাপার নিয়ে প্রশ্ন তোলার জ্ঞান আমার সহজ সরল পিতার নেই।

তিনি বললেন, “আর অপারেশনের খরচ?”

বললাম, “ওটারও ব্যবস্থা হয়েছে! আমার এক বন্ধু আমাকে দিচ্ছে। ধার নয়। এমনিতেই। ও অনেক বড়লোক। লাখ টাকা তার কাছে কিছুই না। মানুষকে সাহায্য করে বেড়ানোটাই তাঁর নেশা।”

বাবা আনন্দিত গলায় বললেন, “মাশাআল্লাহ্!”

তিনি আনন্দে বিছানায় উঠে বসলেন। বেচারা আমার মিথ্যা কথা ধরতে পারলেন না। আরও কিছুদিন বেঁচে থাকার আশায় তাঁর চোখ চকচক করছে।

আর আমার চোখ চক চক করছে অন্য আনন্দে। আজ আমি কিছুটা হলেও নিজের জন্ম ঋণ শোধ করতে পারছি! আমিতো প্রায় মারাই গিয়েছিলাম। বাবা যদি না আসতেন,কি হতো তখন নীলুর? তানিশার? আগের জীবনতো বাবার কাছে বন্ধক ছিলই, দ্বিতীয় জীবনটাও তাঁর দান হয়ে রইলো। পিতৃ ঋণতো শোধ সম্ভব নয়, একটা কিডনীর বিনিময়ে বাবাকে যদি দ্বিতীয় জন্মের দেনা শোধ করে দেই, তাহলে মৃত্যুর পরে গর্ব করে আল্লাহ্কে বলতে পারবো যে জীবনে কিছু করেছি। মানব জীবন বৃথা যেতে দেই নি।

লেখকঃ সাহিত্যিক, ইউএসএ প্রবাসী বাংলাদেশী  এবং ফেসবুক গ্রুপ ক্যানভাস এর অ্যাডমিন 

আরও পড়ুন