নিষিদ্ধ নূপুরের ছন্দ (৩য় পর্ব)

হাসনাতুল জাহান

সকালের সূর্যের তেজ দেখে মনে হচ্ছে আজকে খুব পরম পড়বে ; জৈষ্ঠ্য মাস শুরু হতে না হতেই এত ভ্যাপসা গরম ; যার প্রভাব বেশি পড়ে ঢাকা শহরের রাস্তার উচ্ছিষ্টভোগী জীবন গুলোর উপরে; অন্তত পথের পাশের দুইতলা ছাদের কাকেদের জটলা ও তীব্র কা- কা -কা শব্দ শুনে তাই মনে হচ্ছে; কোথা থেকে যেন, মুরগীর পঁচা নাড়ী-ভুড়ি ও হাড্ডি নিয়ে এসে মারা-মারি শুরু করেছে , কে কার আগে সাবাড় করবে এবং এর সাথে ট্যাংকির উপচে পরা অবশিষ্ট পানি দিয়ে পিপাসা মিটাচ্ছে l

সেঁজুতি তাড়াতাড়ি নিজে কোন রকমে রেডি হয়ে টুটুনকে রেডি করে দিচ্ছে ; আগে বাবার কথা বারবার জানতে চাইত , বাবা কোথায় ? এখন আর বলে না, হয়তোবা এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে l

সেঁজুতি  ছেলেকে বলল

-স্কুলে কিন্তু ভাল ছেলে হয়ে থাকবে ; মনযোগ দিয়ে ক্লাস করবে l

-আচ্ছা আম্মু পড়াশুনা করে কী হবে ?

টুটুন বলল । সেঁজুতি আবার বলল

-পড়া শুনা না করলে তুমি বড় হবে কেমন করে ?

-বারে, হাবলুর মা যে আমাদের বাসায় কাজ করে , ও তো পড়তেই পারে না , সেও তো আমার থেকে অনেক বড় l

-তুমি বড় হলে বুঝবে , আমি কোন বড়র কথা বলেছি l

-এইটা আবার কোন বড় ?

-তোমাকে আর পাকনামো করতে হবে না , তাড়াতাড়ি জুতা পর l

-আম্মু আমার টিফীনে তুমি কী দিয়েছ ? আমি কিন্তুু ফ্রুটস্ খেতে পারবনা l

-বিফ্ চাউমিন আর ভেজি স্টিকস দিয়েছি ; সব খেয়ে ফেলবে কিন্তু ; আমি যেন বক্স ফাঁকা দেখি l

টুটুন মার সাথে দ্রুত গাড়িতে ওঠে পড়ে l টুটুন ধানমন্ডির নামকরা একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে
পড়ে l রাস্তার জ্যামের কারণে আধা ঘন্টার রাস্তালাগে দুই ঘন্টা l রাস্তার জ্যামের মধ্যে গাড়ি আটকে পড়তেই কতকগুলো ছোট ছোট মুখ এসে কাঁপা কাঁপা হাতে কেউ টাকা চায় , কেউ ফুল বা পেপার বিক্রি করে l
সেঁজুতি কাউকেই নিরাশ করে না ; যতদূর পারে সাহায্য করে ; সবার নাম ও চেহারা মোটামুটি তার চেনা হয়ে গেছে l

ময়না  নামের এক মেয়ে এগিয়ে এসে বলে

-আফা বকুল ফুলের মালা লন, এই সকালেই সংসদ ভবনের পাশের গাছ থেকে কুড়াইছি , মায়ে সুন্দর করে মালা বানাইছে , লন অনেক দিন ধরে গন্ধ থাকব l

সেঁজুতি সব গুলো মালা নিয়ে নেয় আর পাঁচশত টাকার নোট ধরে দেয় l

-আফা ভাংতি নাই তো ?

ময়না বলে উঠে

-কালকে আমাকে আরও ফুল দিয়ে দিও l

সেজুতি বলে । এইসব কথার ফাঁকে গাড়ি আবার সচল হতে থকে lটুটুন  মাকে বলে

-আচ্ছা আম্মু ওরা স্কুলে যায় না কেন ?

-ওদের টাকা নেই তাই l

-তুমি ওদের টাকা দিয়ে দাও l

-আমার অত টাকা নেই বাবা l

-আমি রবিনহুডের মত ডাকাত হব; তাহলে আমার অনেক টাকা হবে , তখন আমি ওদের সবাইকে দিয়ে দিব l
–  টুটুন সোনা ডাকাত না ভালো মানুষ হও তাহলে তুমি , অনেক ভাল কাজ করতে পারবে l

-তুমি তো অনেক ভালো তোমার টাকা নেই কেনো ?

-তোমাকে আর পন্ডিতী করতে হবে না ; স্কুল এসে গেছে , আমার সাথে নেমে পড়ো l

এই বলে, মা -ছেলে মিলে হাত ধরে স্কুলের গেট পর্যন্ত পৌঁছায় l

ছেলেকে বিদায় দিয়ে গাড়িতে ওঠে পড়ে l সাথে ড্রাইভারকে বলে নিউমার্কেটের দিকে গাড়ি ঘুরাতে , কিছু ব্যাক্তিগত কেনা -কাটা সারতে হবে তার l

বাসায় এসে দেখে, আতিক ঘরে টিভিতে ক্রিকেট খেলা দেখছে l
সেঁজুতি আতিকের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে

-আতিক তোমার সাথে আমি কথা বলতে
চাই l

-কেন তোমার আবার কি হলো ?

-আমার না তোমার হয়েছে ; কলকে রাত্রে তুমি কোথায় ছিলে?

-অফিসে মিটিংয়ে ছিলাম l

-না তুমি ভুল বলছ, তোমার কন্ঠ শুনে মনে হচ্ছে তুমি মাতাল ছিলে ; আর তোমার পাশে নূপুরের আওয়াজ শুনা যাচ্ছিল , মনে হচ্ছিল কেউ নাচছেl

-না তুমি ভুল শুনেছ, ফোনে অনেক সময় এই রকম শব্দ শোনা যায় l তুমি তোমার রুমে যাও ,
আমাকে একা থাকতে দাও l

সেঁজুতি আর কোন কথা না বাড়িয়ে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয় l বকুল ফুলের মালাগুলোকে নিজের বেডের সাথে লাগোয়া আয়নার সামনে রেখে , আবিষ্ট মনে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কী যেনো দেখতে থাকে; আর মনে মনে ভাবে এই ফুলগুলো মালা না হলে কারো পায়ের তলায় পড়ে নিষ্পেষিত হয়ে তার জৌলুস ও গন্ধ সব ঐ জুতার তলার সাথে মিশে যেত l সে কি মালা না নিষ্পেষিত হওয়া কোন বকুল ফুল ?

সেঁজুতি খুব চাপা স্বভাবের মেয়ে , সে তার ব্যাক্তিগত বিষয় বাবা – মা কারো সাথেই শেয়ার করে না । তারা কানাডাতে স্যাটেল, থাকে ছেলের সাথে l শাশুড়ি সালেহা কিন্তু তাকে খুব ভালবাসে ; অনেক সময় তাদের ভাব দেখে বুঝাই যায় না বয়সের পার্থক্য l

আতিক সালেহার রুমে প্রবেশ করে , সালেহা চশমা পরে কোরআন পড়তেছিল ; সেও সেঁজুতির মত সাধারণ l আতিক মার দিকে তাকিয়ে বলে

-মা এই বাড়ীটা অনেক পুরাতুন দাদার আমলের , আমি এইটাকে ভেঙ্গে ফেলতে চাই l এই বাড়িটাই শুধুমাত্র সালেহার নামে রয়েছে l

-আমি মরার পর ভেবো এই কথা l বিয়ে হয়ে আসার পর, এই সাধারন বাড়িটাই ছিল তোমার বাবার একমাত্র সম্বল ; আজকে তুমি যে ব্যাবসা দেখছ, এইটা তোমার বাবা অনেক কষ্ট করে এই পর্যায়ে দাঁড় করিয়েছে l

দৃপ্ত কণ্ঠে উত্তর দেয় সালেহা

-মা তুমি বড্ড সেকেলেই রয়ে গেলে l তোমারা বড্ড সেন্টিমেন্টাল ; এখন যুগ পাল্টাচ্ছে l

আতিক আবার বলে । এরই মধ্যে টুটুন স্কুল ছুটির পর বাসায় ফিরে ; স্কুল থেকে এসেই সে দাদীর রুমে দরজায় পা বাড়াতেইদেখে বাবা আর দাদী মধ্যে কী নিয়ে যেন তর্ক -বিতর্ক চলছে l
সেঁজুতি তখন ছেলের উদ্দেশ্যে বলে

-বড়দের কথা শুনতে নেই বাবা, এইদিকে এসো l

-আচ্ছা আম্মু বিড়ালের বাচ্চাদের মতো আমিও কী তোমার পেটে ছিলাম ?

টুটুন  টেবিলে মায়ের হাতে খেতে খেতে বলে  ।
-হুম , সবাই ছোটবেলায় মায়ের পেটে থাকে l

 

-তুমি, আমি,’ বাবা, দ্বিদুন সবাই কী এক সময় পেটে ছিল ?

-হুম , তোমাকে কে বলেছে বিড়ালের বাচ্চা পেটে থাকে?

-বারে ,তুমি জাননা আমাদের ছাদের সিঁড়ির ঘরে কলকে বিড়াল বাচ্চা দিয়েছে , হাবলু আর আমি দেখেছি; ও আমাকে বলেছে l

-ও তাই ; আমি জানিনা তো l

-আমি কী ওদেরকে মিল্ক খাওয়াতে পারব ?

-হ্যা পারবে ; তবে আগে হোমওয়ার্ক করতে হবে তার পরে l

-তুমি কী আমাদের সাথে ছাদে ক্রিকেট খেলবে ?

-হ্যাঁ খেলবো l

সেঁজুতি খেয়াল করে টুটুন কেমন যেন, দিন দিন বেশি বেশি মা ন্যাঁওটা হয়ে যাচ্ছে ; আর সব সময় প্রশ্ন করে l
(চলবে)

লেখকঃ প্রবাসী বাংলাদেশী, অস্ট্রেলিয়া

আরও পড়ুন