জাপানি বাড়িওয়ালা

 নুরুন নাহার লিলিয়ান

জাপানে আমরা যে বাসাটায় থাকতাম সেটার নাম ছিল সানিসাইড হাউজ । সূর্যের পাশে থাকা বাড়ি । খুব ছিমছাম রাস্তার সাথে ।সাধারন তিন তলা বিল্ডিংয়ের দুতলায় আমরা থাকতাম । আমাদের বাসা থেকে আমার বরের ল্যাবে যেতে দশ পনের মিনিট লাগতো । ভোর তিনটায় যখন সূর্য আকাশে আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে । তখন যেন আমাদের বাড়িটির দিকে তাকিয়েই প্রথম হাসি দেয় । কারন এতো ভোরে কেবল আমরাই হয়তো জেগে থাকি ।বাড়িটা ছিল পূর্বমুখী । সূর্যের আলো পাহাড় বেয়ে আমাদের বাড়িতেই প্রথম আসে । শুধু তা নয় যেখান থেকে সব পথ সহজ ।

বাসার পাশেই আঠার নাম্বার সাবওয়ে ।আর ও এগিয়ে গেলে বাস স্টপ । সব যেন সাধারণের মাঝে অসাধারণভাবে সাজানো গুছানো ।বর একদিন বাসার সামনে দাড়িয়ে আমাকে শুধু দিক গুলো চিনিয়ে দিল । আর বলল,”এই শহরের মানচিত্র অন্ধরাও ভাল বুঝে ।আর তুমি না বুঝলে সেটা হবে খুব দুঃখজনক । ”
আমি উত্তর দিলাম,” অচেনা পথে সবাই অন্ধ ।আমি এই নতুন অন্ধ ও চিনে নিবো । চিন্তার কিছু নেই ।”
সে আর কিছু বলে না । আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে সাইকেল নিয়ে ল্যাবে চলে যায় ।

বাড়ি ওয়ালা পেশায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। জাপানি সোসাইটিতে তাদের অবস্থান অনুযায়ী যথেষ্ট স্বচ্ছল । যখন আমার সাথে দেখা হয় খুব গল্প করতে চায় ।বন্ধু প্রিয় বৃদ্ধ মানুষ ।বুঝা যায় পেটে অনেক গল্প জমে আছে ।শুরুর দিকে ঘটনা । তখন আমি জাপানিজ তেমন বুঝিনা । সে অনেকে অনেক গল্প বলে যায়। যখন তাঁর বাসার সামনে দিয়ে আমাদের বাসার যাওয়ার সিঁড়িতে পাড়া দেই অমনি সে বাইরে বের হয়ে আসে আর জাপানি ভাষায় বেশ আন্তরিক অভিব্যক্তি নিয়ে অনেক কথা বলে । আমি কিছুই বুঝি না দুই একটা শব্দ ছাড়া ।

তারপর ধীরে ধীরে আমি ও ভাষাটা কিছুটা বুঝতে শিখি ।তখন বুঝলাম তিনি আসলে আমার খোঁজ খবর আর আমি যে একা থাকি কোন সমস্যা হলে যেন তাকে জানাই । সেই সময় প্রথম অনুভব করেছিলাম বোবা আর বধিরদের কতোটা কষ্ট। একবার ভাষা শেখার স্কুলে যাচ্ছি । লক বন্ধ করে মাত্র বের হব । পেছন ঘুরতেই দেখি হাসি মুখ নিয়ে বাড়িওয়ালা দাড়িয়ে আছে । তাকে আমার প্রথম দিকে ভুতুরে মনে হতো । তার নিরব চাল চলনে প্রথমে ভয় পেলে ও পরে মজা লাগত । ছোট খাটো ধবধবে ফর্সা লোকটার নাম ছিল মিতসুহাসি সাইতো । ওকে পরে আসার সময়ে জানিয়ে ছিলাম ওকে আমার ভূত মনে হত । সে হেসে খুন । পরে জাপানে পুরনো দিনের ভূতের গল্প অনেক জনপ্রিয় জানিয়েছিল ।আমি ও বলেছিলাম আমাদের দেশে ও ভূত জনপ্রিয় চরিত্র । সেই থেকে সব সময় বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর কৌতূহলের শেষ নেই ।

আসলে উনি আমাকে জানাতে এসেছেন যে এই বিল্ডিং টা রঙ করাতে মিস্ত্রীরা পরের দিন আসবে । সে আমাকে এনিয়ে বিনিয়ে ইশারা ইঙ্গিতে কতো ভাবে বুঝায় ।আমি তো কিছুই বুঝিনা । সে আর ও জান প্রান দিয়ে অভিনয় করে বুঝায় ।তাও আমি বুঝি না । তখন অবশ্য দুই একটা বাক্য আর শব্দ আমার পরিচিত । আমি চিন্তা করলাম সে কি বলে । পরে মাথায় এল তাঁর কথা রেকর্ড করি আর নয়তো খাতায় লিখে নেই ।

বাইরে ঘন ঘন তুষারপাত । সব সময় নিজেকে পোশাকের ভেতর ঢুকিয়ে রাখতে হয় । শীতের কাপন থেকে বাঁচতে হাত মুজা ,পা মুজা তো আছেই । জ্যাকেটের ভেতর থেকে খাতা কলম বের করে সেখানে জাপানিতে লিখতে বললাম ,” কোকনি নিহংগতে কাইতে কুদাসাই ! মানে দয়া করে এখানে জাপানিতে লিখুন ।
উনি আমার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে তারপর দুই লাইন লিখে দিল । আমি তাকে ইশারা ইঙ্গিতে বুঝালাম ,অতাসিউয়া আনাতানো কতবা অকারিমাসেন দেসতা ।মানে আমি তোমার কথা বুঝি না ।
ভদ্র লোক হাল ছেড়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,” আনাতানো নিহংগ সেনসে আরিমাসুকা ?”
মানে তোমার জাপানি ভাষার শিক্ষক আছে ?
আমি বললাম হাই! আরিমাস ! ইমা নিহংগ সারুননি ইকিমাস ।মানে হ্যা ।আছে ।এখন জাপানি ভাষার স্কুলে যাই ।

তখন খাতা কলম দেখিয়ে বুঝাল খুব ভাল করে জাপানি শেখো । তুমি তো আমার কথা বুঝো না আমি তো তোমার কথা বুঝি না । এখানে জীবন তো তোমার অনেক কঠিন হবে ।ওর কথা গুলো আমার চোখ কান খুব ভাল করেই লক্ষ্য করতো । আমার ভাষাগত অক্ষমতা ওর আন্তরিকতা গুলো বুঝতে অন্তরায় ছিল ।

আমি তখন হিউয়া নামের একটা জাপানি ভাষা স্কুলে ভাষা শিখি । আমার শিক্ষকের নাম ইয়ামাস্থা । তিনি টোকিয়ো বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময়ে শিক্ষক ছিলেন । অবসরের পর মানবিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় কাজ করছেন । তাকে নিয়ে বাড়িওয়ালার লেখা দেখালাম । তিনি খুব সুন্দর করে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে বুঝিয়ে বললেন যে বাড়িওয়ালার পরিবার আমার শুভাকাঙ্ক্ষী ।আমি যেহেতু বিদেশি এবং বাসায় একা থাকি তাই কোন সমস্যা হলে যেন তাদের জানাই ।

এভাবেই কয়েকটা মাস গেল । সেদিন ঈদের দিন । আমার বরের মনেই নেই ।২০১৩ সালের ঈদটা আমার জীবনের সবচেয়ে সুখময় কষ্টের । অনেক কঠিন একটা সময় পার করেছি । আসলে কিছু পরিস্থিতি এমন যে প্রকাশ করা যায় না ।আমার বর ল্যাবে এতো বেশি সময় ব্যস্ত আর কঠিন সময় পার করে ক্লান্ত হয়ে ফিরতো যে তাকে কিছু বলারই সুযোগ পেতাম না । তাকে মন খুলে কোন কথা বলার সময়ই পেতাম না । আমি জাপানের প্রথম বছরটা অনেক অচেনা মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করি ।

চলার পথে ছোট ছোট আন্তরিকতা আর সামান্য উদারতায় অনেক মানুষের সাবলীল সহজ বন্ধুত্ব পেয়েছি । তাদের সাথে বেশি সময় থাকতাম । ওদের সাথেই মন খুলে দিতাম । মনের নানা রকম চিন্তা ভাবনা শেয়ার করতাম ।এখন ও পর্যন্ত সেই পথে কুড়িয়ে পাওয়া বন্ধুত্ব গুলো বেঁচে আছে নিজেদের দায়িত্বে আর ভালোবাসায় ।

আমার বাড়িওয়ালার ভাষা প্রথম দিকে না বুঝলে ও চলতে চলতে ওর ইশারা ইঙ্গিত ভাষাটাই রপ্ত করে নিয়েছিলাম । তার চার মেয়ে । মেয়েরা সবাই শিক্ষিত আর চাকুরীজীবী । এটা নিয়ে সে খুব গর্বিত ।সেই ঈদে ওকে এক বক্স ভুনা সেমাই রান্না করে দিয়েছিলাম ।

সেই থেকে আমার প্রতি বাড়িওয়ালা পরিবারের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই । যখনই বাইরে থেকে বাসায় ঢুকতাম । কোনদিন যদি দেখতাম সে তার বউ , মেয়েদের আর অন্য আত্মীয়দের নিয়ে বারবি কিউ করছে । আমাকে সে উঠে এসে তাদের সাথে বসতে বলতো । জাপানি নানা চেনা জানা ফেস্টিভ্যাল গুলোতে প্রায় আমার দরজায় সে চকোলেট অথবা কেক রেখে যেতো । আবার এটা ও জাপানিতে লিখে রাখতো এটা কোনটা আমার আর কোনটা আমার বরের ।

একবার পোলাও চালের খিচুড়ি রান্না করলাম । মসুর ডাল , মুগ ডাল , গাজর , সবুজ মটরশুঁটি ,আলু ,পেয়াজ, মুরগির মাংস সহ বিভিন্ন সবজি দিয়ে খিচুড়ি রান্না করে বাড়িওয়ালার বাসায় দিয়ে এলাম ।এবার মনে হয় বাড়িওয়ালার পরিবার এতো সবুজ লাল রঙের খাবার দেখে একটু বেশি খুশী হয়েছেন ।

তখন আমি বেশ কিছু জাপানিদের সাথে এই বিষয়টা বুঝতে পেরেছি যে জাপানিরা ও বাঙালিদের মতো খেতে ভালোবাসে । খাওয়া দিয়ে তাদের সাথে ভালই বন্ধুত্ব করা । আর তা যদি ফ্রি খাওয়া হয় তাহলে তো কথাই নেই । আমি নিঃসঙ্গতা ভুলতে রান্না করি । আর বাড়িওয়ালার বাসায় পাঠাই । আর ওরা পাঠায় নানা উপহার । প্রায় সকাল বেলা যখন দরজা খুলে দরজায় ঝুলানো উপহার পেতাম অনেক ভাল লাগতো ।

জাপানি ট্র্যাডিশনাল খাবার, কেক, চকোলেট, নানা রকমের ফল,অলিভ ওয়েল, সাবান শ্যাম্পু,পারফিউম আরও কতো কি ! বুড়ার বউয়ের একটা বিউটি পার্লার কাম স্পা সেন্টার ছিল নিচে । সেখানে ফেস, পা ,বডি মেসেজ করা হতো । মাঝে মাঝে আমি কৌতূহল নিয়ে ঢুকলেই সে দেখাত তারা অনেক ধরনের কসমেটিক নিয়ে কাজ করে । বিভিন্ন ধরনের এসেন্সিয়াল ওয়েল । যা বয়স ধরে রাখতে বা ইয়ং লুক রাখতে কাজ করে । আমি যদি বলতাম ,” করে ওয়া নান দেসুকা? মানে এটা কি ?
করে তাকাই দেস! মানে এটা অনেক দাম ।
আবার জিজ্ঞেস করত,” আনাতা সুকি দেস্কা? মানে তুমি পছন্দ করেছ?
আমি লাজুক লাজুক ভাব নিতাম ।
পরে দেখতাম বুড়ি প্যাকেট করে আমাকে দিয়ে দিয়েছে । জাপানিরা কৃপণ বা হিসেবি জাতি । বিনে পয়সায় কিছু পাওয়া মানে আকাশের চাঁদ পাওয়া ।

জাপানে যাওয়ার এক মাস পর আমার বর আমাকে একটা সাইকেল কিনে দিয়েছিল । আমি সাইকেলটা এতো ভালবাসতাম যে চালাইতেই ইচ্ছা করতো না ।আমি বেশির ভাগ সময়ে হেঁটে হেঁটে সব জায়গায় যেতাম । এমন কি আমার বাসার পেছনে মারুয়ামা পাহাড়েও দেড় ঘণ্টা হেটে উঠে যেতাম । কি এক পাগল মন মানুষের ভেতরে বসবাস করে ।বেশি প্রয়োজন হলে সাবওয়ে ব্যবহার করতাম । যাইহোক তুষার ঝড়ে আমার আর বরের সাইকেল দুইটা বরফের নিচে চলে গেল ।

ঝড় শেষে আমি তো হতবাক । আমি এদিকে তাকাই সেদিকে তাকাই কি করব কিছুই বুঝি না । আমি সাইকেল নিয়ে দূরে না গেলেও বাসার কাছে চালাতাম । অবসরে বাসার কাছে একা একা সাইকেল নিয়ে খেলতাম ।বাড়িওয়ালা বুঝেছিল হয়তো এইটা আমার প্রিয় জিনিস । বাড়িওয়ালা বাসা থেকে বের হয়ে এসে একটা মেশিন দিয়ে মুহূর্তে বরফ উড়িয়ে দিল । আমার সাইকেল পেলেও বরেরটা পাচ্ছিলাম না ।সে জিজ্ঞেস করে ,আনাতানো দান্না সান নো জিতেনসা দোকো ?”
মানে তোমার বরের সাইকেল কোথায় ?
সে সেদিকের বরফ ও উড়াল । মুহূর্তে আমার বরের সাইকেল ও বরফ থেকে বের হয়ে এল । আমার জাপানি বাড়িওয়ালার মানবিকতাবোধ, সেন্স, রসিকতা আর উদারতাগুলো ভুলে যাওয়ার মতো না ।

ফিরে আসার সময়ে সে তার পুরো পরিবারের সাথে একটা ছবি তুলে রাখল । হাতে একটা প্যাকেট দিল । খুলে দেখি রিয়েল অলিভ ওয়েল, একটা ব্লাক নেক মাফলার,লিপস্টিক, জাপানি ওমিয়াগি । মানুষ গুলো অতীত হয়ে যায় । কিছু মানুষের ভেতরের সৌন্দর্য গুলো হারায় না ।সত্যি সময় তাকে হারাতে দেয় না । সেদিন পুরনো জিনিস পত্র গুছাতে গিয়ে কাপর চোপড়ের ভেতর থেকে টপ করে কাল নেক মাফলারটা পড়ল ।
আর মুহূর্তে সেই পরিবারটার আদর যত্নের কথা মনের ক্যানভাসে উকি দিল । চোখের সামনে ভেসে উঠল । ভাসতেই থাকল ।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও স্বত্বাধিকারী, লিলিয়ান্স লিটেরেচার ক্যাফে

আরও পড়ুন