ল্যাগেজ বিড়ম্বনা!

মাসুদুল হাসান রনি

দুই হাজার তিন থেকে দুই হাজার সতেরো সাল পর্যন্ত নানান কারণে আমাকে ঘন ঘন দেশের বাহিরে যেতে হয়েছে। এমনও দেখা গেছে মাত্রই একটা ট্যুর ইউরোপ থেকে দিয়ে এসেছি আবার একসাপ্তাহ পর ছুঁটতে হয়েছে ইউরোপে কিংবা আমেরিকায়। তাই আমার ল্যাগেজ ও হ্যান্ডব্যাগ থেকে কখনোই কাপড় চোপড় বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নামানো হতো না। যেন জানতামই আমাকে আরেকটা ট্যুরের জন্য রেডি হয়ে থাকতে হবে!
যাহোক ৩৫/৩৬টি দেশ ঘোরার পরও আমার ইমিগ্রেশন ভীতি আজো কাটেনি। এর কারণ আমার সবুজ পাসপোর্ট । এটা দেখলেই ইমিগ্রেশন অফিসার কেমন অদ্ভুত চোখে তাকায় এবং নানান প্রশ্ন করে নার্ভ ডাউন করে দেয়। এরকম বেশ কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা নানান এয়ারপোর্টে হয়েছে, সেই গল্প না হয় আরেকদিন বলা যাবে। আজ লিখছি ২০১৫ সালের জানুয়ারীর প্রথম সাপ্তাহে জার্মানীর বার্লিন এয়ারপোর্টে ল্যাগেজ হারিয়ে বিড়ম্বনার কথা।
ঢাকা থেকে ১৮/২০ ঘন্টা জার্নি’র পর বার্লিন শনিফিল্ড বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন চেকিং শেষ করে ল্যাগেজের জন্য বেল্টের সামনে দাঁড়াই। ৪০/৫০ মিনিট অপেক্ষা করার পর ল্যাগেজ আসে না। কি যে চরম বিরক্তিকর ও ভীতিজনক অবস্থা ।
এর আগেও ল্যাগেজের জন্য দেড় দুই ঘন্টাও অপেক্ষা করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। তখন ক্লান্তিজনিত কারণে মেজাজ কি রকম খারাপ হতে পারে , লং রুটে যারা রেগুলার ট্রাভেল করেন তারাই বিষয়টি ভাল অনুধাবন করতে পারবেন। আবার অনেক সময় হয়েছে ট্রানজিট বা কানেকটিং ফ্লাইটে হয়ত ল্যাগেজই আসেনি। একবার ভাবুন, ১২ ঘন্টা নির্ঘুম জার্নির পর তখন মেজাজ কি রকম হতে পারে?
সেই ল্যাগেজের জন্য আমাকে যদি একদিনের স্থানে ৩ দিন একটা শহরে গরম কাপড়ের অভাবে তীব্র শীতের কস্ট নিয়ে থাকতে হয়, কেমন লাগে?

বিভিন্ন দেশে বিমানবন্দরে ল্যাগেজের ওভারওয়েট, ল্যাগেজ মিসিং এবং মিসিং ল্যাগেজ ফিরে পেতে ৩/৪ দিন অপেক্ষা করা , কখনো ওভারওয়েটেড ল্যাগেজ এক টার্মিনাল থেকে আরেক টার্মিনালে টেনে নেয়া ভীষন হ্যাপা ও কস্টকর ছিল।
আমার বন্ধুদের অনেকেই যারা নিয়মিত ট্রাভেল করেন তারাও মাত্র ৮/৯ কেজির একটা হ্যান্ডল্যাগেজ ও ল্যাপটপ ছাড়া সাথে কিছুই নেন না। আসার সময় কোন ডিউটি ফ্রিশপ থেকে সর্বচ্চো ২/১ টা প্রয়োজনীয় জিনিষ কেনেন। তাই দীর্ঘ ট্রাভেলিংয়ের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, ব্যাচেলারদের টেনশনমুক্ত ট্রাভেলিং এর জন্য একটি ব্রিফকেস বা হ্যান্ডল্যাগেজ হচ্ছে সবচেয়ে ভাল।

সেবার আমি ইত্তেহাদ এয়ারলাইনে জার্মান যাবার টিকেট কেটেছিলাম। ঢাকা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় ফ্লাইট ছিল। ট্রানজিট ছিল আবুধাবী। সাড়ে পাঁচঘন্টা ফ্লাই করে আবুধাবী পৌছাই স্থানীয় সময় রাত দুইটায়। টাইম জোন চেঞ্জ হওয়ায় বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে বারোটা। আবুধাবী এয়ারপোর্টে জানতে পারি ইত্তেহাদ বার্লিন যাচ্ছে না। আমার কানেকটিং ফ্লাইট হচ্ছে রাইনার এয়ার। যা জার্মানীর কোন এক কোম্পানীর বেসরকারি এয়ারলাইন। ট্রানজিট শেষে যথাসময়ে রাইনার ঢাকা থেকে আগত পেসেঞ্জার নিয়ে বার্লিনের উদ্দ্যেশে ছেড়ে যায়।
পরের দিন জার্মানের স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় বার্লিন পৌঁছাই। ইমিগ্রেশন ও অন্যান্য ফর্মালিটিজ শেষে ২ নাম্বার বেল্টের সামনে দাঁড়াই। ত্রিশ মিনিট আগে বেল্ট চালু হওয়ায় ভাবছিলাম, দ্রুতই আমার ল্যাগেজ পেয়ে যাব। কিন্তু বিধিবাম। প্রায় একঘন্টা অপেক্ষা করেও আমার ল্যাগেজ পাই না। মহা টেনশানে পড়ে যাই। ল্যাগেজে আমার সব শীতের কাপড়। যদি সত্যি সত্যি ল্যাগেজ না পাই তাহলে আমাকে সাংঘাতিক বিপদে পড়তে হবে।

দেড় ঘন্টা কনভেয়ার বেল্ট চলার পর বন্ধ হয়ে যায়। কারণ জিঙ্গেস করতে একজন জানায়,’ সকল পেসেঞ্জার তাদের ল্যাগেজ পিকআপ করেছে। কারো ল্যাগেজ নেই। ‘
হায় হায় বলে কি লোকটা!
আমার তো ল্যাগেজ আসেনি। আমার এখন কি হবে!

এদিকে অন্য আরেকটি ফ্লাইটের এরাইভেল ঘোষণার সাথে শুনতে পেলাম ২ নং বেল্টে সদ্য আগত বিমানের ল্যাগেজ দেয়া হবে। তারমানে আমার ল্যাগেজ এ মুহুর্তে ফেরত পাচ্ছি না।
মন খারাপ করে টার্মিনাল টু দিয়ে বের হয়ে আসতে আমার ছোটভাই বাবুকে দেখতে পেলাম। সে এসেছে আমাকে রিসিভ করতে। বার্লিন এলে সবসময় জসিমভাই এয়ারপোর্টে আমাকে রিসিভ করেন। কিন্তু এবার আসার আগে জসিমভাইকে বলে রেখেছি, এয়ারপোর্টে না আসার জন্য। কারন আমার কাজিন বাবু আমাকে রিসিভ করে তার বাসায় নিয়ে যাবে।

বাবুকে পেয়ে বললাম, আমি ল্যাগেজটা কিভাবে পাবো, কথা বলে ব্যবস্থা করো।
বাবু সব শুনে অভয়বানী দেয় চব্বিশ ঘটার মধ্য ল্যাগেজ ফেরত পাবো। ও আমাকে নিয়ে যায় লস্ট এন্ড ফাউন্ড অফিসে। সেখানে একটা ফরম ফিলাপ করে অভিযোগ জানাই ল্যাগেজ মিসিংয়ের। তারাও আমাকে জানায় আগামী ৭২ ঘন্টার মধ্যে ল্যাগেজ পাওয়া যাবে এবং ল্যাগেজ আসা মাত্রই ফোন করে জানাবে।
আমি মন খারাপ নিয়ে টার্মিনালের বাহিরে আসতে প্রচন্ড ঠান্ডায় কুঁকড়ে যেতে থাকি। গায়ে নর্মাল একটা পলোশার্ট পড়া থাকায় ঠান্ডায় কষ্ট পাচ্ছিলাম। ভাবতেই পারছিলাম না আগামী ৭২ ঘন্টা কিভাবে ঠান্ডা মোকাবেলা করবো!
বাবুর বাসায় এসে কিছুতেই মন ভাল হচ্ছিল না। দুপুরে ফ্রেশ হয়ে বাবুর রান্না করা কাচ্চি বিরিয়ানী খেয়ে ঘুম দেই। আর বাবু চলে যায় তার ডিউটিতে। জেটলগ ও নিদ্রাহীন ১৫/১৬ ঘন্টা জার্নিতে আমার কাহিল অবস্থা। বিছানায় যাওয়া মাত্রই ঘুমিয়ে পড়ি।
কাজ শেষে বাবু বাসায় আসে রাত ১২টায়। তখনো আমি ঘুমে বিভোর। রাতের খাবার রেডি করে আমাকে ডেকে তুলে আনে টেবিলে। খেতে খেতে ল্যাগেজ ট্রেকিং করি। কিন্তু কোন সুসংবাদ আমার জন্য নেই।অনলাইনে দেখাচ্ছিল প্রসেস অন গোয়িং।
ছোটভাইয়ের টি শার্ট, জ্যাকেট পড়ে দুইদিন পাড় করে দেই। প্রায় ৫২ ঘন্টা পর অনলাইনে শো করে ব্যাগ এরাইভড। নিউজটা দেখামাত্র রাত ১১টায় দুইভাই এয়ারপোর্টের উদ্দ্যেশে রওয়ানা দেই ব্যাগ আনার জন্য।
বাবুর ভারী কাপড় পড়েই আমাকে বের হতে হয়।
লস্ট এন্ড ফাউন্ড অফিস খোলা ছিল। কিছু ফর্মালিটিজ শেষে ওরা আমাকে দেখায়, এই ব্যাগ আমার কিনা।
যাহোক প্রায় ৫২ ঘন্টা পর ল্যাগেজ হাতে আসা মাত্রই আনন্দে আমার মন ভরে যায়।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কানাডা প্রবাসী

আরও পড়ুন