তিন পয়সার বিড়ম্বনা

মনসুর আলম

দেশে থাকতে দেখতাম বিয়ের কাবিনে কখনো রাউন্ড ফিগার লেখা হয় না। এক লক্ষ এক টাকা কিংবা পাঁচ লক্ষ এক টাকা এরকম লেখা হয়। মানু‌ষের মধ্যে একটি সংস্কার চালু আছে শেষে শূন্য ব্যবহার করা যাবে ৬না। শূন্য ব্যবহার করলে নাকি অমঙ্গল হয়। কে যে, কবে এই ধরনের কুসংস্কার চালু করেছে তার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য কিংবা তত্ত্ব কোনটিই আমার জানা নেই। একবার এক বড় ভাইয়ের বিয়েতে গিয়েছিলাম। কাবিননামা লেখার সময় কনের দাদা বারবার বলছেন, “কাজী সাহেব, পাঁচ লক্ষ এক টাকা লিখবেন।”

মজা করার জন্য দাদাকে জিজ্ঞেস করলাম কনের বয়স কত?

– ত্রিশ বছর।
– তাহলে তো সর্বনাশ! ত্রিশ বছর তো লেখা যাবে না, শেষে শূন্য আছে। আবার বয়স কমানোও যাচ্ছে না সার্টিফিকেটে জন্মদিন লেখা আছে। তাহলে কনের বয়স একত্রিশ লেখি?

পরের কাহিনী আর লেখা যাচ্ছে না। বন্ধুরা না থাকলে হাত পায়ের হাড্ডি দুই/চারটা ভেঙে হাসপাতালে পাঠানো হতো। এরপর থেকে বন্ধু বান্ধব ছাড়া আমি একা আর কোনো বিয়েতে যাই না।

পরদিন সন্ধ্যায় বিয়ে বাড়িতে গিয়ে বরের হাতে এক টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললাম, “এটি রাখেন, কাজে লাগবে।” উনি অদ্ভুত চাহনি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন মানে কী? এক টাকা দিয়ে আমি কী করবো?

– বাসর ঘরে যাচ্ছেন ভাবীকে মোহরানার টাকা দিবেন না? আপনি নিশ্চয়ই এক টাকা সাথে রাখেননি? মনে রাখবেন পাঁচ লক্ষ এক টাকা কিন্তু!

কেউ কেউ জমিজমা, সম্পত্তির দলিলেও টাকার পরিমাণের শেষে শূণ্য ব্যবহার করতে চান না। দশ লক্ষ এক টাকা লেখেন।

সাউথ আফ্রিকা আসার পর দেখি সেই কুসংস্কার পৃথিবীর সর্বদক্ষিণের এই দেশটিতেও পৌঁছে গেছে। যেখানেই যাই কেউ রাউন্ড ফিগারে পণ্যের দাম লেখে না। সুপার শপ, ফ্যাশন আউটলেট সবজায়গায় পণ্যের দামে সেই সুক্ষ্ম ট্রিকস আছেই। দশ টাকা না লিখে, নয় টাকা পঁচানব্বই পয়সা / একশো টাকা না লিখে নিরানব্বই টাকা পঁচানব্বই পয়সা (৯.৯৫/৯৯.৯৫) এভাবে লেখে। এমনকি মিলিয়ন টাকার গাড়ির দামও সরাসরি এক মিলিয়ন লেখে না। নয় লক্ষ, নিরানব্বই হাজার, নয়শত পঁচানব্বই টাকা (৯,৯৯,৯৯৫) এভাবে লেখে। আমি মুচকি হাসি আর মার্কেটিং স্ট্রাটেজির চৌদ্দগোষ্ঠি উদ্ধার করি। ওরা কী ভাবে? পাবলিক গাধা? পাবলিক কি বুঝে না? পাঁচ পয়সার জন্য একশো টাকা পূরণ হলো না এই ট্রিকস করে পাবলিককে ধোঁকা দেওয়া এত সহজ? তবে কেন এই ছলচাতুরী?

এখানে পাঁচ পয়সার কয়েন এখনও আছে তবে বিলুপ্তির পথে। সুপারশপগুলোতে কার্ড পাঞ্চ করলে এক্সাক্টলি এমাউন্ট চার্জ করবে। আপনি যদি বাজার করেন পঞ্চাশ টাকা বিরানব্বই পয়সা তাহলে ওরা ৫০.৯২ ই চার্জ করবে। কিন্তু, আপনি যদি ক্যাশ পেমেন্ট দেন তাহলে কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাউন্ড অফ করে আপনার কাছ থেকে ৫০.৯০ নিবে। বাংলাদেশের মতো দশ পয়সার বদলে আপনাকে ক্যান্ডি ধরিয়ে দিবে না। আপনাকে দশ পয়সার কয়েনই দিবে।

আমার ব্যবসাতে বেশ কয়েকটি সাপ্লায়ারের কাছে একাউন্ট আছে। ওরা এক সপ্তাহের ক্রেডিটে মাল দেয়। একটি কোম্পানি আছে যারা আমার দোকানে নিউজ পেপার সাপ্লাই দেয়। প্রতি বুধবারে আগের সপ্তাহের একাউন্ট ক্লিয়ার করতে হয়, তাহলেই নতুন স্টক আসে। আমি সবসময়ই অনলাইনে ব্যাংক টু ব্যাংক পেমেন্ট দেই। সবকিছু নিরবচ্ছিন্ন চলছে, কখনও কোনও সমস্যা হয়নি। একদিন ছোট ভাই ফোন দিয়ে বললো আজ নিউজ পেপারের স্টক আসেনি। খোঁজ নিয়ে দেখো কী সমস্যা?

হেড অফিসে কল দিলাম, “আমার স্টক পাঠাওনি কেন?”

– হোল্ড করো, চেক্ করে দেখতে হবে।

কয়েক মিনিট অপেক্ষমান রেখে একাউন্ট সেকশনের ইনচার্জ আসলো লাইনে।
– স্যরি মিঃ আলম, তোমার একাউন্ট আপ টু ডেট নয়। আউটস্ট্যান্ডিং এমাউন্ট আছে তাই স্টক যায়নি।

আমি আকাশ থেকে পরলাম! কী বলো? আমি তো সময়মতো পেমেন্ট করেছি।

– হ্যাঁ, তা করেছো। তোমার কাছে আমরা তিন পয়সা পাবো। তোমার ইনভয়েস ছিলো ৯৯০.৯৩ কিন্তু, তুমি পেমেন্ট করেছো ৯৯০.৯০। তিন পয়সা কম।

– এতদিনের বিজনেস রিলেশন, মাত্র তিন পয়সার জন্য আমার স্টক আটকে দিলে!

– স্যরি মিঃ আলম। কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে একাউন্ট আপডেট করে অর্ডার ইস্যু করে। তিন পয়সার জন্য কম্পিউটার তোমার একাউন্ট ব্লক করে রেখেছে তাই অর্ডার ইস্যু হয়নি। আমরা খুবই দুঃখিত। তুমি তিন পয়সা পেমেন্ট করো, আগামীকাল তোমার স্টক পৌঁছে যাবে।

আমি তিন পয়সা পেমেন্ট করলাম এবং সেই পেমেন্টের প্রুফ তৎক্ষণাৎ পাঠানোর জন্য ব্যাংক আমাকে দুই টাকা আশি পয়সা চার্জ করলো।

মনেমনে ভাবি পাঁচ পয়সার চালাকি নিয়ে হাসাহাসি করার ফলশ্রুতিতে তিন পয়সায় আমার একাউন্ট আটকে গেলো? বিয়ের কাবিনে এক টাকা না লিখলে কত কিছু যে আটকে থাকতে পারে!!!

লেখকঃ সাউথ আফ্রিকা প্রবাসী সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন