তেত্তোরি বালিয়াড়ি ও জাপানের পার্বত্য গ্রামের রূপ

সাইফুল ইসলাম খান

এক.

মহিলাদের মাথায় চুলের অরণ্যে ক্ষুদ্র একটি উকুন যেমন, গভীর পার্বত্যাঞ্চলে অনেক উঁচু আঁকাবাঁকা পথে গাড়িটিকে ঠিক তেমন মনে হচ্ছে! পথে যেতে যেতে মনে হবে পাহাড়ের ঐ পাড়ে কোন বসতি নেই, কোন জনমানব নেই, পথহীন এক ভুবন।

অথচ পাহাড়টা পেরুলেই দেখা যাবে ঝকমকে অসংখ্য বসতি, পাহাড়ের গা বেয়ে বয়ে চলেছে অসংখ্য পথ। পথে যেতে যেতে উঁচু পাহাড়ে ঝুলে থাকা ঘরগুলোকে মন হয় বুনো পক্ষীর পরিপাটি কোন বাসা। কতো স্বল্প পরিসরে মিতব্যয়িতার সাথে জায়গার সর্বোত্তম ব্যবহার করে বসবাস করা যায়, জাপান থেকে শিক্ষা নিতে পারি।

দুই.

যে পথেই যাওয়া যায়, যত দূর যাওয়া যায় দু’পাশ থেকে পাহাড় ঘিরে রেখেছে এক মোহনীয়তায়। তাদের এ নিস্তব্ধ, ভাবগম্ভীর, অসম্ভব রকমের নীরবতার সাম্রাজ্যে আত্মা কখন মনের অজান্তেই মিশে যায় এসবের সাথে। পৃথিবীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে, আসমানের ওপারে কোন অসীম,অজানা রাস্তায় আনাগোনা করে মন! এই দূর দেশে শূন্য দুপুরে খুব করে মনে পড়ে পরম প্রিয় মায়ের মুখ, ভাইবোনের মুখ। প্রিয়জনদের মুখ ।

তিন.

এখন শীতের মাঝামাঝি। বিকেলের মায়াবী আলো উঁচু পাহাড়ের মাথা ছুঁয়ে পাতাঝরা গাছের ফাঁক দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বোবা নীরব দিগন্তে। আমি এখন ফিরছি tottori sand dune নামক পর্যটন স্পট থেকে। এটি প্রত্যন্ত একটি অঞ্চল। গ্রামের ভিতর দিয়ে চলছে গাড়ি। চলন্ত গাড়ি থেকে ছবির মতন গ্রামগুলো দেখি।

অলস বিকেলের হলদে আলোয় গাঁয়ের বঙ্গনারীগণ পিঁড়িতে বসে যেমন চুলে বিলি কাটে, সুখ- দুখের গল্প করে, দীর্ঘ পথে এমনটি চোখে পড়েনি। কোন পড়শিও এ বাড়ি ও বাড়ি যায় না।

সভ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো মানে হচ্ছে, মানুষের সুন্দর, নরম প্রাকৃতিক মনগুলোকে ব্যস্ততার ফাঁসিতে হত্যা করে কৃত্রিমতার কাফনে চিরতরে দাফন করে ফেলা।

এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেখেই ফেললাম জাপানে। কোথাও টু শব্দটি নেই। হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা বুঝি সবাইকে নিয়ে চলে গেছে খুব দূরে কোথাও! মানুষশূন্য গ্রামটি পড়ে আছে খুব একলা। তাহলে তো বলতেই পারি – ‘বাঙ্গালী পড়শি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পড়শি’। ঝগড়াঝাটি থাকলেও দিন শেষে আছে দুঃখ ভাগাভাগি, ভালবাসাবাসি। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া।

চার.

সন্ধ্যা নামছে ধীরে ধীরে। দূর আসমানে সন্ধ্যাতারা দেখা যায়। এই প্রিয় তারাটিকে ছোটবেলা থেকে অসংখ্যবার দেখেছি সুপারিগাছের ফাঁক দিয়ে, বাঁশঝাড়ের উপর দিয়ে, কিন্তু আজ এই মুহূর্তে আমার পরবাসী মনে কেন যেন খুব ভিন্ন রুপে উদিত হলো তারাটি। কী জানি এই অচিন গাঁয়ে গোল মুখের জাপানী কোন গ্রাম্য সুন্দরী তরুণীও জানালায় চুল ছড়িয়ে এই নিঃসঙ্গ তারাটিকে দেখছে কিনা আমার এই নিঃসঙ্গ বেলার মতোই। আপাতত ভাল লাগার এ ভাবনাটি বেঁচে থাকুক গাঁয়ের এই সন্ধ্যার ঘোরে কিংবা অচেনা তরুণীর অচেনা জানালায়….

লেখকঃ কলাম লেখক ও পিএইচডি গবেষক,জাপান

আরও পড়ুন