উচ্চশিক্ষা বিষয়ক দুটি কথা

রউফুল আলম

আমি যখন চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটিতে পড়ি, আমাকে কেউ কখনো উচ্চশিক্ষা বিষয়ক দুটি কথা বলেনি। আমি জানতাম না কখন প্রস্তুতি নিতে হয়। কী করে নিতে হয়। কিভাবে নেয়া উচিত—এমন বহু বিষয়। শুধু এই বোধ থেকে, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার বিভিন্ন দিক নিয়ে লিখি। অল্প অল্প করে বিভিন্ন তথ‍্য তুলে ধরি। পৃথিবীর সেরা সেরা বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলোর চিত্র ব‍্যাখ‍্যা করি। দেশের স্বপ্নবাজ তরুণরা এতে করে কিছুটা হলেও উপকৃত হবে—এটাই লক্ষ‍্য। তারা সচেতন হবে। তাদের লক্ষ‍্য পূরণে এই সচেতনতা সাহায‍্য করবে।

উচ্চশিক্ষার জন‍্য একজন তরুণ-তরুণীর প্রস্তুতি নিতে হবে বিশ্ববিদ‍্যালয় ভর্তির প্রথম বর্ষ থেকেই। গবেষক হওয়ার জন‍্য ভালো রেজাল্টের চেয়ে গভীর জ্ঞান রাখা গুরুত্বপূর্ণ। যা পড়ছি, তা ধারণ করছি কি-না, সেটা লক্ষ‍্য রাখতে হবে। তোমরা যখন বিদেশে আসবে, দেখবে তোমার চেয়ে কম নম্বর পাওয়া একজন শিক্ষার্থী তোমার চেয়ে অনেক স্মার্ট। তার উপস্থানা খুব ভালো এবং দৃঢ়। তার আত্মবিশ্বাস বেশি। সে প্রশ্ন করতে পারে প্রচুর। তার চিন্তাশক্তি খুবই প্রখর। নতুন নতুন আইডিয়া বের করতে জানে সে। —এই বিষয়গুলো হলো উন্নত সমাজের একজন মেধাবীর সংজ্ঞা। উন্নত সমাজে পরীক্ষার ফলাফল মুখ‍্য নয়। ফলাফল ভালো করা অবশ‍্যই একটা গুণ এবং ভালো দিক। তবে এটাই শেষ কথা নয়।

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার স্বপ্ন যাদের আছে, তাদেরকে অনেক আগ থেকেই তথ‍্য সংগ্রহ করতে হবে অল্প অল্প করে। এর জন‍্য ইন্টারনেট এখন খুবই সহজ একটি মাধ‍্যম। বিদেশের বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলোর ওয়েবসাইটে যাও। সেসব প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের ওয়েবসাইটে যাও। কী নিয়ে গবেষণা করছে, সেগুলো একটু একটু করে পড়ো। না বুঝলেও পড়ো। না পড়লে তো কোনদিনই বুঝবে না। কোন দেশে গবেষণা করবে সেটার চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হলো কার অধীন গবেষণা করবে। গবেষকদের গুণগত মানকে গুরুত্ব দাও। একজন বড়ো গবেষক চেনার উপায় হলো, তার পাবলিকেশন সংখ‍্যা দেখা। যতো বেশি ও মানসম্পন্ন পাবলিকেশন, ততোই নামকরা অধ‍্যাপক। কতো ভালো জার্নালে পাবলিশ করছে, সেগুলো দেখো। একজন প্রফেসরের গ্রুপের স্টুডেন্টদের সংখ‍্যা দেখো। যার গ্রুপে স্টুডেন্ট বেশি, তার নামও বেশি। কারণ তার ফান্ডিং বেশি।

একজন বড়ো গবেষকের গ্রুপে কাজ করার প্রধাণত শর্ত হলো গবেষণার অভিজ্ঞতা থাকা। সেটা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। অনার্স করেই সারা দুনিয়ায় (মূলত চার বছর স্নাতক বা তিন বছর স্নাতক ও এক-দুই বছর মাস্টার্স) পিএইচডি শুরু করা যায়। তাই সেদিকে লক্ষ‍্য রাখা উচিত। বাংলাদেশের সমাজে তুমি বড়ো না হয়ে পৃথিবীর স্কেলে বড়ো হওয়ার চিন্তা মাথায় রাখতে হবে। দুনিয়াটা এখন একটা মঞ্চ। এখানে বিশ্বমানের হওয়ার চেষ্টা থাকতে হবে। বিশেষ করে, গবেষণার দুনিয়ায় সেটা আরো সত‍্য। তুমি যেখানেই বসে গবেষণা করো না কেন, সারা দুনিয়ার মানুষ সেটা জানতে পারবে, পড়তে পারবে।

বন্ধুরা মিলে গ্রুপ করে তথ‍্য সংগ্রহ করতে পারো। এটা খুবই কার্যকর। তথ‍্য সংগ্রহ করে সেইভ করে রাখো, সময় সেইভ করো। নেটে ঘাঁটাঘাঁটি করে বারবার একই তথ‍্য দেখা খুবই সময় সাপেক্ষ! পরীক্ষায় ফলাফল যাই হোক, তারচেয়ে বড়ো কথা পড়াশুনাটা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছো কি-না, বুঝতে পারছো কি-না সেটা খেয়াল করতে হবে। অনলাইনে উন্নত বিশ্বের স্কুলগুলোর অনেক ভিডিও পাওয়া যায়। এক্সপেরিমেন্ট সম্পর্কে জানা যায়। শিক্ষকদের লেকচার পাওয়া যায়। প্রেজেন্টেশন স্লাইড পাওয়া যায়। —এগুলো সংগ্রহ করে দেখা যেতে পারে। আবারো বলছি, ইউনিভার্সিটির প্রথম বর্ষ থেকে এগুলোর পেছনে অল্প অল্প সময় দিতে পারাটা ভালো।

জিআরই/টোফেল/আইএলটিএস এগুলোর জন‍্য প্রস্তুতি নেয়া উচিত কমপক্ষে তৃতীয় বর্ষ থেকেই। এগুলো আবেদনের জন‍্য দরকার। এসব স্কোরই ভর্তির জন‍্য অনেক সময় যথেস্ট না। তাই ভলিন্টিয়ার ওর্য়াক, প্রজেক্ট ওয়ার্ক, গবেষণার অভিজ্ঞতা—ইত‍্যাদি থাকাটা খুবই সহায়ক। আজাইরা কাজে সময় নষ্ট না করার চেষ্টা করতে হবে। প্রতিটি মুহূর্তই প্রোডাক্টিভ কি-না, সেটা বুঝতে হবে। বড়ো হওয়ার স্বপ্ন দেখাটাই সহজ, সে লক্ষ‍্যে কাজ করাটাই সবচেয়ে কঠিন। বড়ো যদি হতে চাও, তাহলে এই কঠিনেরেই ভালোবাসতে হয়!

লেখকঃ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক ও গবেষক, নিউজার্সি, যুক্তরাষ্ট্র

আরও পড়ুন