কর্পোরেট সংস্কৃতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা

।। নূরুল ইসলাম খলিফা ।।

কর্পোরেট সংস্কৃতি বা কর্পোরেট কালচার কথাটি এখন বহুল পরিচিত ও প্রচলিত । আর্থিক , সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কর্পোরেট সংস্কৃতি বলতে প্রধানত বুঝায় যে , দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ তাদের পদমর্যাদা ও কর্তব্যের উপযোগী কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা স্বাধীনভাবে প্রয়োগের অধিকারী হবেন এবং এ বিষয়ে যথাযথভাবে জবাবদিহি করবেন । যেটাকে আমরা Delegation of power & accountability বুঝিয়ে থাকি । অর্থাৎ আমাকে একটি নীতিমালার আওতায় সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা স্বাধীনভাবে প্রয়োগের সুযোগ দিতে হবে ,আবার আমাকে সেটি ব্যবহার করার জন্য জবাবদিহি করতে হবে।

ইসলামী ব্যাংকে শুরু থেকেই এই বিষয়টির চমৎকার অনুশীলন ছিল ।ব্যাংকিং ব্যবসা পরিচালনা করার ক্ষেত্রে ব্যাংকের নির্বাহী ও কর্মকর্তাগণ পেশাদারীত্বের সাথে স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন ; আবার ভুল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তারা জবাবদিহি করতেন । পরিচালনা পরিষদের কথা ছিল , আমরা নীতিমালা দিয়েছি , এর আলোকে সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনারা ব্যাংক চালাবেন পেশাদারিত্বের সাথে । আমরা আপনাদের কাজে কোনো হস্তক্ষেপ করবো না ; কিন্তু আপনাদের কাছ থেকে আমরা হিসাব নেব । পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আপনাদেরকে প্রয়োজনীর লজিস্টিক সাপোর্ট দেব ; আপনারা দক্ষতা ও যোগ্যতার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করবেন ।
আমার ত্রিশ বছরের কার্যকালে আমার উর্ধতন কোনো নির্বাহী কিম্বা পরিচালনা পরিষদের কেউ কখনও একটা ফোন করেও বলেননি যে , অমুক প্রস্তাবটি পাঠাবেন , তমুককে বিনিয়োগ দিতে হবে। এর মধ্যে বেশ বড় তিনটি শাখায় আমি বারো বছরের মত ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি । কিন্তু আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে কেউ কখনও নির্দেশ দেন নি । গোটা পরিবেশটাই ছিল এমন যে , এভাবে কেউ কিছু ভাবতেই পারতো না ।

আমি তখন একটি জেলা সদরে অবস্থিত শাখার দায়িত্বে । একজন শিল্পপতি (একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানীর ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ) ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানের একটি ভিজিটিং কার্ড নিয়ে দেখা করলেন এবং তিনি এখন আর সুদ ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে থাকতে চান না , ইসলামী ব্যাংকে আসতে চান এমনটা বললেন । আমাদের বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান তার খুবই ঘনিষ্ট এমনটাও বললেন । আমি তাকে স্বাগত জানালাম এবং বললাম , আমি তো গ্রাহক খুঁজি । কাজেই এটি আমার জন্য আনন্দের সন্দেহ নেই । তবে আমাকে দেখতে হবে এবং সে আলোকে চিন্তা করবো ইন শা আল্লাহ ! যথারীতি আপ্যায়নের পরে তার অনুরোধ মাফিক শিল্প প্রতিষ্ঠানটি ভিজিট করার তারিখ দিলাম । নির্দিষ্ট দিনে গেলাম , দেখলাম এবং কর্মরত অফিসারদের কাছে কিছু তথ্য জানতে চাইলাম । তারা কোম্পানীর প্রডাক্ট , মান ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য দিলেন ।

ফেরার পথে আমি বাজারে নেমে কয়েকটি দোকানে এই কোম্পানীর প্রস্তুতকৃত মালামাল কিনতে চাইলাম । একটা দোকানেও পেলাম না । দোকানীদের কথা হলো ,’এগুলো চলে না এখানে ।’ কোম্পানীর একজন উর্ধতন দায়িত্বশীলকে জিজ্ঞেস করলাম কিন্তু তিনি অনেকটা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে জবাব দিলেন যে, তাদের প্রোডাক্ট দেশের উত্তরাঞ্চলে বিক্রি হয় বেশি । আমার যা বুঝার বুঝে নিলাম ।এ ছাড়া মালিকদের বিষয়েও স্থানীয় বাজারে তেমন সুধারনা পেলাম না । বেশ ক’জন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ আমাকে জানালেন যে , ওনাদের বাবার প্রতিষ্ঠিত এ শিল্প প্রতিষ্ঠানটি ওনারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন ; কিন্তু একটা শিল্প প্রতিষ্ঠান ধরে রাখতে যে শ্রম ও নিষ্ঠা দরকার তা ওনারা কখনও দিতে চেষ্টা করেন নি ।এমনিতে ওনারা লোক হিসেবে ভাল । আমার পর্যবেক্ষনও ছিল এমনি যে , তারা মানুষ হিসেবে ভাল ; কিন্তু উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী হিসেবে দক্ষ নয় বরং কিছুটা আরামপ্রিয় ও বিলাসী । দেখলাম বর্তমান ব্যাংকেও তাদের শ্রেণিকৃত দায় আছে অর্থাৎ খেলাপী হয়ে গেছে ।

আমার বিবেচনা অনুযায়ী তাদের প্রস্তাব প্রধান কার্যালয়ে পাঠাতে রাজী হলাম না । মাস দুয়েক পরে কোনো এক উপলক্ষ্যে ব্যাংকের বোর্ড অব ডাইরেক্টরস এর ভাইস চেয়ারম্যান ও এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান আমার শাখায় এলেন ।প্রসঙ্গক্রমে ভাইস চেয়ারম্যান সাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন , ‘ আমি যে অমুক কোম্পানীর এমডি সাহেবকে কার্ড দিয়ে পাঠিয়েছিলাম , সেই প্রস্তাবটির কি হলো ? ‘ বললাম , ‘ সেটি বিবেচনা করার মত ছিল না । ‘ তিনি মনে হলো খানিকটা বিরক্তির সাথেই বললেন , ‘ লোকটি তো খারাপ ছিল না ; আমি তাকে বহুদিন থেকেই চিনি । তো আপনি এক বাক্যেই কী ভাবে বলে দিচ্ছেন সেটি বিবেচনা করার মত ছিল না ? ‘ আমি বললাম , ‘ জ্বি স্যার , লোকটি ভাল আমিও মনে করি । কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক সুবিধা দিলে সেটি একটি ভুল সিদ্ধান্ত হবে এবং অন্য ব্যাংকের খেলাপী ঋন কিনে আনা হবে ।এ জন্যই আমি এটি বিবেচনা করতে রাজী নই।’ ভাইস চেয়ারম্যান সাহেব খুশী হলেন বলে মনে হলো না । ইসি চেয়ারম্যান সাহেব এগিয়ে এলেন ।বললেন , ‘ম্যানেজার সাহেব যা ভাল মনে করেছেন সেটাই থাকুক । বিনিয়োগ দিবেন ওনারা , আদায় করবেন ওনারা , কাজেই সিদ্ধান্তও ওনারাই নিবেন । আমরা কেন এ বিষয়ে ওনাকে ইনসিস্ট করবো ? ‘ ভাইস চেয়ারম্যান সাহেব আর কিছু বললেন না । তবে পরবর্তীতে আমার এই সিদ্ধান্তের অনেক প্রশংসা করেছেন ।

আসলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সুস্থ ও গতিশীল রাখতে হলে , ব্যাংক ম্যানেজমেন্টকে পাওয়ার ডেলিগেট করতে হবে এবং স্বাধীনভাবে তা প্রয়োগ করতে দিতে হবে । অন্যথায় বিপর্যয় আসবেই । আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি । ক্ষমতা প্রয়োগের স্বাধীনতা ছিল বলে তা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও আমরা সতর্ক ও দায়িত্বশীল ছিলাম , বেপরোয়া ছিলাম না । ফলে পুরো ক্যারিয়ারে ভুল সিদ্ধান্ত ছিল তবে বেশি ছিল না ।

লেখকঃ সাবেক ব্যাংকার 

লেখকের আরও লেখা পড়ুন- এ বঞ্চনার অবসান কবে হবে ?

আরও পড়ুন