গবেষণার মৌলিক ধাপসমূহ কি কি?

রউফুল আলম 

যে কোন বিষয়ে গবেষণার করার প্রথম ধাপ—কী নিয়ে কাজ করবেন, সেটা ঠিক করা। যেমন, কেউ চিন্তা করতে পারে, আমি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের খাবার সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করবো। কেউ চিন্তা করতে পারে, মুক্তিযুদ্ধের অস্বীকৃত কিশোর যোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করবো। কেউ চিন্তা করতে পারে, দেশের পূর্বাঞ্চলের লোক সাহিত‍্য ও সঙ্গীত নিয়ে কাজ করবো। এভাবে যে যার ফিল্ড অনুযায়ী কাজের লক্ষ‍্য বা গোল (Goal) ঠিক করবে।

গবেষণার লক্ষ‍্য বা গোল ঠিক করতে গেলে ফিজিবিলিটি (Feasibility) ও নভেলটি (Novelty) বিষয়টা বুঝতে হয়। বিবেচনা করতে হয়। ফিজিবিলিটি হলো, আমি যেটা করতে চাচ্ছি সেটা আদতে বাস্তিবক কিনা। সম্ভব কিনা। যেমন, আমি যদি পরিকল্পনা করি এমন ড্রাগ তৈরি করবো, যা দিয়ে সকল প্রকার রোগ নিরামায় সম্ভব তাহলে সেটা হবে অবাস্তব ও অসম্ভব। সেটা ফিজিবল না। ফিজিবিলিটির সাথে সময়, সামর্থ‍্য, কলেবর ইত‍্যাদি বেশ কিছু বিষয় সম্পৃক্ত।

নভেলটি হলো আমি যে বিষয়টা নিয়ে কাজ করার কথা ভাবছি, সেটা কতোটুকু ইউনিক। কতটুকু নোভেল! কারণ, আমি যা করার জন‍্য ভাবছি, সেটা হয়তো অন‍্য কেউ আগেই করে বসে আছে। তাহলে আমার কাজের যে নভেলটি, সেটা কমে যাবে। এখন এই নভেলটি বিষয়টা বুঝতে হলে, প্রচুর পড়তে হয়। যে যেই এরিয়াতে গবেষণা করবে, তাকে সেই এরিয়ার প্রচুর গবেষণা প্রবন্ধ (Research Article) পড়তে হয়। গবেষণা প্রবন্ধ পড়ার বেশ কিছু উদ্দেশ‍্য আছে। অন‍্যদের কাজ সম্পর্কে জানলে আপডেটেড থাকা যায়। অন‍্যদের কাজ সম্পর্কে পড়ে আমরা নতুন নতুন আইডিয়া পাই। যে গবেষক তার নিজের গবেষণা জগতের খবর খুব ভালোভাবে রাখে, সে ততই জাঁদরেল গবেষক!

কাজের লক্ষ‍্য, নভেলটি ইত‍্যাদি বুঝার পর হলো ডিজাইন (Design)। যে কোন কাজের একটা ছক থাকে। প্ল‍্যান থাকে। ডিজাইন থাকে। গবেষণারও তাই—সেটা বিজ্ঞানের হোক আর অন‍্য যে কোন শাখারই হোক। কাজটা কিভাবে করবো? কিভাবে করলে সবচেয়ে বেশি প্রোডাক্টিভ হবে? কী করে করলে সবচেয়ে বেশি অজানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে? কাজটা কীভাবে করলে কাজের গুরুত্ব বাড়বে, গ্রহনযোগ‍্য হবে? —এই প্রশ্নগুলো মাথায় রেখে একটা প্রজেক্ট ডিজাইন করা হয়।

এবারের ধাপ হলো, এক্সিকিউশন (Execution)! —আমি যে ছক বা প্ল‍্যান করলাম, এবার সে মতো করার পালা। গবেষণায় সবসময় ডিজাইন বা ছক মতো কাজ করা যায় না। কাজ শুরু করলে পরে সেটা বিভিন্ন দিকে মোড় নেয়। একজন ভালো গবেষককে এই মোড়ের বিষয়গুলো কি করে ব‍্যালন্স করতে হবে সেটা বুঝতে হয়। কাজ করতে গিয়ে আমরা অনেকসময় অপ্রত‍্যাশিত ফলাফল পাই। সেটা ভালোও হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে। এমনসব অনেক বিষয় আসে এক্সিকিউশন করতে গেলে। এক্সিকিউশন করতে গেলে সেরেন্ডিপিটি বা অপ্রত‍্যাশিত আবিষ্কার হতে পারে। কিন্তু এই অপ্রত‍্যাশিত আবিষ্কারের মূহুর্তকে ধরতে গেলে একজন ভালো অবজার্ভার হতে হয়। একজন ভালো গবেষক হওয়ার অন‍্যতম শর্ত হলো ভালো অবজার্ভার হওয়া।

একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে কাজ করার পর বা এক্সিকিউশনের পর আমরা ফলাফল গুছাই। কারণ কাজের ফলাফল প্রকাশ করতে চাই। তাই এই ধাপ হলো, পাবলিকেশন (Publication)। পাবলিকেশনের বেশ কিছু ধরণ থাকে। আর্টিকেল হিসেবে জার্নালে প্রকাশ করা যায়। প‍্যাটেন্ট করা যায়। আবার বিজ্ঞজনদের সভায় প্রেজেন্ট করা যায়। একটা আর্টিকেল লেখা কিংবা গবেষণা প্রেজেন্ট করা, এই বিষয়গুলোও শেখার বিষয়।

সুতরাং, যে কোন গবেষণা কর্মের ধাপসমূহ হলো, ফিজিবিলিটি ও নভেলটির উপর ভিত্তি করে লক্ষ‍্য বা গোল ঠিক করা। ডিজাইন। এক্সিকিউশন। ডেটা কালেকশন এন্ড এনালাইসিস। পাবলিকেশন। আপনি যা নিয়েই কাজ করতে চান না কেন, এই মৌলিক ধাপসমূহ থাকবেই।

লেখকঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক ও গবেষক , নিউজার্সি, যুক্তরাষ্ট্র

আরও পড়ুন