‘পুরুষ’ এখন পক্ষ

 নাসীমুল বারী 

পুরুষ— যেখানে পুরুষ থাকবে, সেখানে নারী বা মহিলাও থাকতে হবে। কিন্তু চরম এক আশ্চর্য যে আমাদের চেতনায়, বিশেষ করে বাংলাভাষীর চেতনায় শুধু পুরুষই ছিল, পুরুষই আছে। মহিলার কোনো অস্তিত্ব নেই। নারীকে বাদ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আমরা এমনই চর্চা করে আসছি। আজ আমরা সম-অধিকার নিয়ে, নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কথা বলছি— কিন্তু আমাদের ভাষার চর্চায় সে নারী সম্পূর্ণ বাদ। এ ব্যপারটা কি কেউ লক্ষ্য করেছেন?
কথাটা বলছিলাম বাংলা ব্যাকরণের ‘পুরুষ’ নামক পাঠ নিয়ে। ‘পুরুষ’ নামে স্বতন্ত্র একটি পাঠ আছে, ‘নারী’ নামে নেই কেন? ‘পুরুষ’ নামক পাঠটি ভাষায় ‘কর্তা’র উপস্থিতি চিহ্নিত করে। ভাষার ব্যাকরণে এটি একটি আবশ্যক। সে আবশ্যকটা ‘পুরুষ’ হবে কেন? আর কি কোনো শব্দ নেই— যে শব্দ চয়নে এ অধ্যায়ের পাঠ আমরা গ্রহণ করতে পারি। বাংলা ব্যাকরণের ইতিহাস কয়েকশ বছরের। এর মধ্যে ‘পুরুষ’ শব্দ দিয়ে কর্তার উপস্থিতি নির্ধারণ করা— তা বদলানোর কি চেষ্টা হতে পারে না? এখন প্রশ্ন আসবে ‘পুরুষ’ শব্দ থাকলে সমস্যা কী? বদলাতে হবে কেন? প্রাণিসত্তার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ‘পুরুষ’। সেই ‘পুরুষ’কে নিয়ে ব্যাকরণের একটি পাঠ— একটু বেমানানই। ইংরেজিতে এ অধ্যায়টা ‘ম্যান’ দিয়ে কিন্তু নয়। বাংলা ভাষায় আমি ‘পুরুষ’ বললে মানুষ পুরুষ বুঝব (এক্ষেত্রে নারী নয়)। বাংলা ব্যাকরণের বেলায় ‘সে’, ‘তুমি’, ‘জাবির’ ইত্যাদি এমনসব অর্থ বুঝব। আবার ব্যাকরণের ‘পুরুষ’ শ্রেণিবিন্যাসে ‘উত্তম পুরুষ’ আছে। উত্তম পুরুষ ছাড়া অন্য পুরুষগুলো কি অধম? এতে কি মানবসত্তাকে খাটো করা হয় না? হয়ত একারণেই ব্যাকরণবিদরা একটু ঘুরিয়ে বলেছেন— মধ্যম পুরুষ, নাম বা তৃতীয় পুরুষ। সেই একই ভাবার্থ— অধম পুরুষ। বাংলা ভাষায় শুধু ‘পুরুষ’কে নিয়ে এত টানাটানি কেন? একটু গোলমেলে লাগে না?
আমি অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম ‘পুরুষ’ শব্দটির পরিবর্তনে গ্রহণযোগ, যুৎসই ও পরিশীলিত শব্দ ব্যবহারের প্রস্তাবনা করা যায় কিনা। এরই মধ্যে ২০১২ সালে ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড’ ৬ষ্ঠ শ্রেণির ব্যাকরণ বই রচনার জন্য যে পাঠক্রম (Syllabus) প্রণয়ন করেছে, তাতে ‘পুরুষ’কে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। নতুন নাম দিয়েছে ‘পক্ষ’। চমৎকার যুগোপযোগী একটি পরিবর্তন। ‘পুরুষ’-এর মতোই পক্ষেরও বিভাজন করা হয়েছে ৩টি— বক্তাপক্ষ, শ্রোতাপক্ষ ও অন্যপক্ষ। এটুকু করেই সিলেবাসের কাজ শেষ। আর কোনো বিবরণ, বর্ণনা বা সূত্র দেয় নি ওই সিলেবাসে।
যেহেতু আমার চেতনায় এ অধ্যায়টির নাম পরিবর্তনের একটা প্রত্যাশা ছিল— তাই ব্যাকরণের ধারায় এ অধ্যায়ের একটি পূর্ণ পাঠ আমি রচনা করি। আমার ‘বাংলা ভাষা শিক্ষা বই’তে তা সন্নিবেশন করেছি। এখানে ‘পক্ষ’-এর সেই পূর্ণ পাঠের কিছু অংশ নিয়ে তুলে ধরছি।
‘আমি পড়ছি।’, ‘তুমি পড়ছ।’, ‘সে পড়ছে।’ এ উদাহরণে ‘আমি’, ‘তুমি’, ‘সে’— এ সর্বনামগুলোর উপস্থিতিকেই আমরা ‘পুরুষ’ হিসেবে এতদিন শিখে আসছি। পুরুষের শ্রেণিবিভাজনে ‘আমি’- উত্তমপুরুষ, ‘তুমি’- মধ্যমপুরুষ আর ‘সে’ বা যে কোনো নামই তৃতীয় পুরুষ বা নামপুরুষ। পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নতুন প্রস্তাবনায় পুরুষ>পক্ষ। উত্তমপুরুষ> বক্তাপক্ষ, মধ্যমপুরুষ> শ্রোতাপক্ষ, নামপুরুষ> অন্যপক্ষ।
“আমি পড়ছি। তুমি পড়তে বসো। জাবির কোথায়? সে এখনো পড়তে বসেনি?”
এ অনুচ্ছেদে ‘আমি’ বক্তা নিজে উপস্থিত। ‘তুমি’ শ্রোতা। আমি ও তুমি কথার মাঝে অন্য আরেকজন আছে। সে হলো ‘জাবির’। এখানে বক্তা নিজের সম্পর্কে বলেছে ‘আমি’। উপস্থিত শ্রোতাকে বলেছে ‘তুমি’। আর অন্যজন ‘জাবির’কে সম্বোধন করেছে ‘সে’ হিসেবে। এই সবগুলো সর্বনাম পদই ক্রিয়াপদ ‘পড়া’ দ্বারা নিজেদের পক্ষগত অবস্থান চিহ্নিত করেছে।
অতএব আমরা সংজ্ঞা হিসেবে পাই- “বাক্যে ক্রিয়াপদ দ্বারা সম্পন্ন হওয়া সর্বনাম পদের অবস্থান নিরূপণ করাকেই পক্ষ বলে।”
ক. বক্তাপক্ষ : কর্তা নিজেকে বুঝাতে যে সর্বনাম পদ ব্যবহার করে, তাকে বক্তাপক্ষ বলে।
খ. শ্রোতাপক্ষ : কাউকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলতে যে সর্বনাম পদ ব্যবহার করা হয়, তাকে শ্রোতাপক্ষ বলে।
গ. অন্যপক্ষ : কর্তা অনুপস্থিত কারো উদ্দেশ্যে কোনো কিছু বলে, তা বুঝাতে যে সর্বনাম পদ ব্যবহার করা হয়, তাকে অন্যপক্ষ বলে।
‘আমি’ ও ‘তুমি’ ছাড়া আর সব সর্বনাম পদই অন্যপক্ষ।
গল্প, উপন্যাসে কথক নিজে হলে- সে লেখাকে আমরা বলতাম ‘উত্তমপুরুষে লেখা’। আর ৩য় পুরুষে হলে বলতাম ‘নামপুরুষে লেখা’। এখন কিন্তু তা বললে ভুল হবে। এখন বলতে হবে ‘বক্তাপক্ষে লেখা’ অথবা ‘অন্যপক্ষে লেখা’। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত উপন্যাস ‘বক্তাপক্ষে লেখা’ উপন্যাস। রবীন্দ্রনাথে ‘হৈমন্তী’ গল্প ‘বক্তাপক্ষে লেখা’। সেলিনা হোসেনের ‘কাকতাড়ুয়া’ উপন্যাস ‘অন্যপক্ষে লেখা’। আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘কলিমদ্দি দফাদার’ গল্প এবং রবীন্দ্রনাথে ‘সুভা’ গল্প ‘অন্যপক্ষে লেখা’।
আমরা যারা লেখালেখি করি- সাহিত্যে ব্যাকরণিক এ শুদ্ধতা আমাদেরকেই রক্ষা করে চলতে হবে।

লেখকঃ বাংলা ব্যাকরণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন